বরখাস্ত শ্রমিকদের পুনর্বহাল ও মামলা নিষ্পত্তির আশ্বাস

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অবশেষে ঢাকা অ্যাপারেল সামিটের দুই দিন আগে মেনে নেওয়া হলো শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবিদাওয়া। ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনের সময়ে বিভিন্ন কারখানা থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত শ্রমিকেরা এখন আইন অনুযায়ী পাওনা বুঝে পাবেন। শ্রমিকেরা চাইলে চাকরিও ফিরিয়ে দেবেন মালিকেরা। এ ছাড়া ওই ঘটনায় যাঁরা এখনো কারাগারে আছেন, তাঁদের জামিনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঢাকার সচিবালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের যৌথ বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে তিনটি বিষয়ে সমঝোতা হয়। পরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক। তিনি বলেন, আশুলিয়ার অস্থিতিশীল ঘটনায় মালিকেরা কিছু মামলা করেছিলেন। এতে কিছু শ্রমিক গ্রেপ্তার হন। তবে ইতিমধ্যে প্রায় সবাই জামিন পেয়েছেন। অন্যরাও যাতে শিগগির মুক্তি পেতে পারেন, সে জন্য জামিনের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলাগুলোও আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া আশুলিয়া এলাকায় অনিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়ন ও এনজিওর কার্যালয় থাকতে পারবে না। তবে নিবন্ধিতরা থাকতে পারবে।
শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, আশুলিয়ার শ্রম অসন্তোষের পর প্রায় দেড় হাজার শ্রমিককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের শ্রম আইন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ করা না হয়ে থাকলে তা করা হবে এবং চাকরিতে পুনর্বহাল করা হবে।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী যাঁরা চাকরিতে পুনর্বহাল হতে চান, তাঁদের করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আমিরুল হক, শ্রমিকনেতা শুক্কুর মাহমুদ প্রমুখ।
মজুরি বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু দাবি আদায়ে গত ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আশুলিয়ার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ধর্মঘট শুরু করেন। একপর্যায়ে আন্দোলন আশপাশের অন্যান্য কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন থামাতে ৫৯টি কারখানা চার দিন বন্ধ রাখে বিজিএমইএ। একই সঙ্গে নয়টি মামলা করেন কারখানার মালিকেরা ও পুলিশ প্রশাসন। এসব মামলায় শ্রমিকনেতাসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ছাড়া দেড় হাজারের বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করে কয়েকটি কারখানা।
গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিকনেতাদের মুক্তি ও মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবিতে ডিসেম্বর থেকেই আন্দোলন শুরু করে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক সংঘের আন্তর্জাতিক জোট ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন, ইন্ডাস্ট্রিঅল, ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভসহ কয়েকটি সংগঠন সংস্থা। দাবি আদায়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের চাপে মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমিকনেতাদের মুক্তি ও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে তাগিদ দিয়ে গত মাসে প্রধানমন্ত্রীকে একদফা চিঠি দেয় এইচঅ্যান্ডএম, সিঅ্যান্ডএ, নেক্সট, প্রাইমার্ক, টেসকো, গ্যাপ, এল কর্টি ইংলেস, লি অ্যান্ড ফাং, লবলো, এস ওলিভার, পিভিএইচ, ভিএফ করপোরেশনসহ ২১টির ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রীকে একই ধরনের চিঠি দেয় ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ।
এদিকে কাল শনিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ঢাকা অ্যাপারেল সামিট আয়োজন করছে বিজিএমইএ। দিনব্যাপী এই আয়োজনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক জোটের আন্দোলনে একাত্মতা জানিয়ে এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স (জারা), সিঅ্যান্ডএ, নেক্সট ও চিবো—এই পাঁচটি বড় ব্র্যান্ড ঢাকা অ্যাপারেল সামিট বর্জন করার ঘোষণা দেয়। বিষয়টি নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।
গতকালের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর বিজিএমইএ নেতৃত্ব আশা করছে, যে পাঁচ ব্র্যান্ড অ্যাপারেল সামিট বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসবে। জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের নেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা সামিটে আসবেন। সে জন্য আমরা আশা করছি, ব্র্যান্ডগুলো তাদের প্রতিনিধি পাঠাবে।
জানতে চাইলে ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দাবি-দাওয়া মানা হয়েছে। তাই আমরা প্রত্যাশা করব, আমাদের আন্দোলনে একাত্মতা জানিয়ে যেসব ব্র্যান্ড সামিট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল, তারাও এখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।’