default-image

চীনের নাগরিক যাঁরা বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের সবারই একটা করে বাংলা নাম আছে। ইয়ু কুয়াং ইউয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা শিখতে আসেন, তখন শিক্ষকেরা সোনালি, রুপালি বিভিন্ন নামে ডাকতেন। তবে তা স্থায়ী হয়নি। পরে এক সফরে দুজন বাঙালি তাঁর বাংলা নাম দেন আনন্দী।

চীনে ইয়ু কুয়াং ইউয়ে মানেও হলো হ্যাপিনেস বা আনন্দ। তাই নামের অর্থের সঙ্গে মিলিয়ে বাংলা নামটি তাঁর পছন্দ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে আনন্দী নামেই পরিচিত।

আনন্দী আনন্দের সঙ্গেই প্রায় ২৬ বছর ধরে বাংলা ভাষা নিয়ে আছেন। তিনি চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) বেইজিংয়ে বেতারের বাংলা বিভাগের পরিচালক এবং সিএমজি বাংলাদেশ ব্যুরোর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অন্যদিকে সিএমজি বাংলাদেশ ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শান্তা মারিয়া। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন প্রায় ২৪ বছর। তিনি হলেন বাংলা ভাষার উৎপত্তি এবং চর্যাপদ নিয়ে মূল গবেষক, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাতনি এবং ভাষাসৈনিক মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহর মেয়ে। এর বাইরে শান্তা মারিয়ার আরেকটি পরিচয় হচ্ছে, তিনি চীনের ইউন নান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। এর আগে তিনি চীনে চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনালে বাংলা বিভাগে সাংবাদিকতা করেছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

আনন্দী ও শান্তা মারিয়া—একজন চীনের নাগরিক, আরেকজন বাংলাদেশি। দেশ দুটি হলেও তাঁরা দুজনই কাজ করছেন বাংলা নিয়ে। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গুলশানে সিএমজির বাংলাদেশ ব্যুরোর অফিসে কথা হয় তাঁদের সঙ্গে। চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে ১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। আর বর্তমানে রাজধানীর গুলশানে সিএমজির বাংলাদেশ ব্যুরোর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে।

১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চীন আন্তর্জাতিক বেতার বা চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল (সিআরআই) নামে অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়। ২০১৮ সাল থেকে চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন, চায়না ন্যাশনাল রেডিও, চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল এবং চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)। বাংলাসহ বিশ্বের ৪৮টি ভাষায় গণমাধ্যমটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। চীনের বেইজিং শহরে সিএমজির প্রধান কার্যালয় অবস্থিত।

বাংলায় সংবাদ ও স্ক্রিপ্ট আনন্দী নিজেই লিখেন। নিজের মুঠোফোনের পর্দায় প্রথম আলোসহ বিভিন্ন বাংলা দৈনিক পত্রিকা ডাউনলোড করে রেখেছেন। গড়গড়িয়ে বাংলা পড়তে পারেন।

আনন্দীর মতে, বাংলা ভাষা, বিশেষ করে ব্যাকরণটা বেশ কঠিন। মৌখিক এবং সাহিত্যের ভাষাতেও ব্যাপক ফাঁরাক। এরপরও বাংলা ভাষাকে মধুর লাগে তাঁর। বাংলা ভাষার বিশাল ভান্ডারকে তাঁর কাছে সাগরের মতো মনে হয়। এ ভান্ডার থেকে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য যেটুকু প্রয়োজন, তা শিখতে পেরেছেন। কেউ যখন বাংলা বানান ভুল লিখেন, তখন আনন্দীর মন খারাপ হয়।

আনন্দীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কাঁঠালের মুচি, সরিষাখেতসহ বাংলার বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি ও বাংলায় লেখা দেখে তিনি বাঙালি নন তা বুঝতেই বেশ খানিকটা সময় চলে যায়।

আনন্দী বললেন, চীনে এখনো বাংলা ভাষা জানা মানুষের সংখ্যা কম। তবে দেশটিতে এ ভাষার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আগে মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ ছিল, বর্তমানে চার-পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ চালু হয়েছে। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভালো। দুই দেশেই বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা জানা মানুষের কদর বাড়ছে। সিএমজি বাংলা বিভাগে কাজের পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবেও অনেকে কাজ করছেন।

বিজ্ঞাপন

আনন্দীকে বাংলাদেশের পথ দেখিয়েছিলেন তাঁর বাবা। বাবা বাংলাদেশের বড় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভালো, অতিথিপরায়ণ। ১৯৯১ সালে আনন্দী বাংলাদেশে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে তিন বছর বাংলা ভাষার কোর্স করেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে যান। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি চীনে বেতারের বাংলা বিভাগটিতে কাজ শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে তিনি ঢাকা অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন।
আনন্দী বললেন, ‘২৬ বছর ধরে বাংলা ভাষা নিয়েই কাজ করছি। মনে হয় এ ভাষা শেখার এখনো অনেক বাকি আছে।’ হেসে বললেন, ‘অনেকেই আমার প্রশংসা করেন। তবে আমি বুঝতে পারি অনেক শব্দের উচ্চারণ ঠিক হয় না।’

বাংলা ভাষা নিয়ে আনন্দী তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও জানালেন। বললেন, দ্বিতীয়বার বাংলাদেশে এসে দেশটির প্রতি আবেগ আগের তুলনায় বেড়েছে। অনুবাদ, বই লেখাসহ বিভিন্নভাবে চীনের নাগরিকদের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চান তিনি।

আনন্দী বললেন, ‘বিভিন্ন উন্নত দেশ ভ্রমণের পর আমার ছেলে আমার কাছে জানতে চেয়েছে, উন্নত কোনো দেশের ভাষা শিখলে আমি সেসব দেশে গিয়ে কাজ করতে পারতাম। তাই বাংলা শিখেছি বলে আফসোস হয় কি না। আমি আমার ছেলেকে বলেছি, এ নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।’

মনে হয় দাদা ও বাবা আমার কাজ দেখে হাসছেন

২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে?’ শ্রোতা জরিপে ২০ জন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে স্বীকৃতি পান। এই দাদার নাতনি শান্তা মারিয়া চীন থেকে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। এরপর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আটকে যান। পরে সিএমজির বাংলাদেশ ব্যুরো অফিসে যোগ দেন।

শান্তা মারিয়া জানালেন, চীনে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ছে। এতে দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বাড়ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ বিখ্যাত বাঙালি কবি ও লেখকদের লেখা চীনা ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে। শান্তা মারিয়া যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, সেখানকার শিক্ষার্থীরা পয়লা বৈশাখসহ বাঙালির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালন করছেন।

শান্তা মারিয়া বলেন, ‘আরেকটি দেশের নাগরিকদের আমি বাংলা ভাষা শেখাচ্ছি। শ্রেণিকক্ষে আমি যখন ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলি, তখন খুব গর্ব হয়। শ্রেণিকক্ষে আমি দাদা, বাবা, বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি টের পাই। বাংলা নিয়ে কাজ করছি। মনে হয়, বাংলা বর্ষপঞ্জির অন্যতম সংস্কারক দাদা ও বাবা আমার কাজ দেখে হাসছেন। তাঁরা ভাবছেন, তাঁদের মতো আমিও বাংলা নিয়েই কাজ করছি।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন