বিজ্ঞাপন

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মধ্যে বাংলাদেশেই এখন চালের দাম সর্বোচ্চ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এএফও) সর্বশেষ প্রতিবেদন এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সব দেশে চালের দাম কমেছে। ফলে বাংলাদেশ মোটা চাল আমদানি করলে প্রতি কেজি দাম পড়বে ৩৩ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে, যা বাংলাদেশের বর্তমান বাজারদরের চেয়ে অনেক কম।

শুধু মোটা চাল নয়, মাঝারি ও সরু চালের দামও কমেনি। ঢাকার খুচরা দোকানে মাঝারি বিআর-২৮ ও সমজাতীয় চাল মানভেদে ৫২ থেকে ৫৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের চেয়ে ১০ শতাংশের মতো বেশি। আর সরু মিনিকেট চাল ৬০ থেকে ৬২ টাকা ও নাজিরশাইল চাল ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয় বাজারে। এ ক্ষেত্রে দাম গত বছরের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি।

এখানে মনে রাখা দরকার, দেশে গত বছর চালের দাম বেশ চড়া ছিল। এখন তার চেয়েও

বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে মানুষকে। করোনা নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধে অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের আয় কমেছে। এর মধ্যে চাল, চিনি, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও স্বস্তি না থাকায় সীমিত আয়ের মানুষ সংকটে পড়েছে।

সাবেক কৃষিসচিব ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ এম এম শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে এমনিতেই দেশের দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। চলমান বিধিনিষেধে নতুন করে বহু মানুষের আয় কমেছে। অনেকের আয়ের পথও বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে চালের চড়া দাম তাদের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত দ্রুত খোলাবাজারে চাল বিক্রি কার্যক্রমের পরিসর বিস্তৃত করা। পাশাপাশি সরবরাহ বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে।

উৎপাদন বেশি, গুদাম ভরা

দেশে বোরো, আমন ও আউশ মৌসুমে বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়। গত বছর বোরোতে উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ টন চাল। এ বছর বোরোতে উৎপাদন ২ কোটি টনের বেশি হয়েছে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ। এদিকে সর্বশেষ হিসাবে খাদ্য অধিদপ্তরের গুদামে চালের মজুত দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৬৬ হাজার টনে, যা দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

তারপরও চালের দাম বাড়ছে কেন জানতে চাইলে দেশের বড় চালকলগুলোর একটি মজুমদার অটো রাইস মিলের মালিক চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ধান উৎপাদন করতে যা ব্যয় হয়েছে, তাতে চালের দাম এতটা বেশি হওয়ার কথা নয়। বাজারে অনেক নতুন ফড়িয়া ব৵বসায়ী যুক্ত হয়ে ধান মজুত করছেন। তাঁরা ধান ও চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সরকারের উচিত দ্রুত বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া।

করোনা পরিস্থিতিতে এমনিতেই দেশের দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। চলমান বিধিনিষেধে নতুন করে বহু মানুষের আয় কমেছে। অনেকের আয়ের পথও বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে চালের চড়া দাম তাদের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে।
এ এম এম শওকত আলী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

আমদানির উদ্যোগ

দেশে আবার চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খাদ্যসচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সরকারি ও বেসরকারিভাবে চাল আমদানি করে দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছি। বেসরকারি খাতে আমদানি করতে শুল্ক কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে সচিব বলেন, কৃষকেরা মোটা চাল আগের চেয়ে কম উৎপাদন করছেন। ফলে মোটা চালের জোগান কিছুটা কম। এতে হয়তো দাম বাড়ছে।

দেশে চাল যে আমদানি করতে হবে, তা উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএর বিশ্বের কৃষিপণ্যের উৎপাদন পরিস্থিতি প্রতিবেদনে। গতকাল প্রকাশ করা এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে চলতি বছর ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন চাল উৎপাদিত হবে। তবে দেশে চাহিদা দাঁড়াবে ৩ কোটি ৬১ লাখ টন। বাকি চাল বাংলাদেশকে আমদানি করতে হবে।

দেশে চাল আমদানিতে করভার মোট ৬২ শতাংশ। চলতি বছরের শুরুর দিকে বেসরকারি খাতে চাল আমদানির সুযোগ দিতে অনুমোদন সাপেক্ষে কর কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কর ছাড়ের মেয়াদ গত ৩০ এপ্রিল শেষ হয়ে গেছে। এত বেশি কর দিয়ে চাল আমদানি করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকার এখন এমন একটি শুল্কহার নির্ধারণের চিন্তা করছে, যাতে চালের দাম কমে। তবে কৃষকের জন্য ক্ষতিকর না হয়।

সাধারণ মানুষ চায় কম দামে চাল কিনতে। গতকাল রাজধানীর দক্ষিণ বিশিলে ওএমএসের দোকানে চাল কিনতে যাওয়া ভাড়ায় মোটরসাইকেলের চালক সাদেক হোসেন বলেন, ‘কঠোর বিধিনিষেধে দুই দিন মোটরসাইকেল চালাতে বেরিয়ে পুলিশের হাতে জরিমানা দিতে হয়েছে। এখন হাতে টাকাপয়সা নেই। তাই বাধ্য হয়ে সরকারি চালের দোকানে এসেছি।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন