ফিলিস্তিনি রাজনীতিক নাবিল সাথ বুশের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারের পর জানিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট বুশ বলেছেন, তিনি ঈশ্বর প্রদত্ত এক মিশন বাস্তবায়নে নিয়োজিত, ‘ঈশ্বর বললেন, “জর্জ, যাও, আফগানিস্তানে গিয়ে সব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে লড়াই করো।” আমি তা–ই করেছি। তারপর ঈশ্বর আমাকে বললেন, “যাও, ইরাকে গিয়ে সেখানকার স্বৈরাচার শেষ করো।” আমি ঠিক তা–ই করেছি।’

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে তত্ত্ব ও প্রয়োগের এই প্রভেদ নতুন নয়। বিশ শতকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তিন প্রধান স্তম্ভ—আন্তর্জাতিক আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রসারকে নৈতিকতার যুক্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে, অথচ তার বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও অস্ত্রের জোরে দীর্ঘমেয়াদি অধিগ্রহণে কখনো পিছপা হয়নি।

কিনানের সমসাময়িক আরেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ নাই মনে করিয়ে দিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থ ও নৈতিক অবস্থান অবধারিতভাবে একে অপরের বিপরীতমুখী নয়। যা জাতীয় স্বার্থের অনুকূল, তা নৈতিক হতে কোনো বাধা নেই। বরং, যখন কোনো সরকার জাতীয় স্বার্থের নামে নীতি ও আদর্শকে বাদ দেয়, তখন বিশ্বের চোখে মার্কিন মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, যা জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অধ্যাপক নাই একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ দিয়ে নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করেছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের পর নৈতিক পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় উঠে এসেছে। যেমন ২০১৮ সালে সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী জামাল খাসোগিকে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যার পর স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সে দেশের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে এই হত্যার সমালোচনা থেকে বিরত ছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমস সে সিদ্ধান্তকে ‘অনুশোচনাবিহীন ব্যবসায়িক আদান-প্রদানমাত্র’ বলে সমালোচনা করেছিল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মন্তব্য করেছিল, ‘নিক্সন বা জনসনের মতো নিষ্ঠুর বাস্তববাদীরাও মার্কিন মূল্যবোধ ও নীতিবিরোধী (এই হত্যার পক্ষে) এমন অবস্থান নিতে পারতেন না।’ (টেক্সাস ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিভিউ, নভেম্বর ২০১৯)।

বস্তুত, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আমাদের বিবেচ্য অন্য দুই বৃহৎ শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন বরাবরই নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি ও নিজ সীমানার বাইরের কার্যকলাপকে শুধু জাতীয় স্বার্থের আলোকে না দেখে নৈতিক এবং সেই হেতু শ্রেষ্ঠতর প্রমাণে ব্যস্ত থেকেছে। (পাঠক স্মরণ করতে
পারেন যে ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্সসহ সব ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের সামরিক অভিযান ও দীর্ঘ নিষ্পেষণকে এই আলোকেই ‘সিভিলাইজশনাল’ বা অসভ্য জাতিগুলোকে সভ্য বানানোর মিশন হিসেবে ব্যাখ্যায় বিস্তর কথা ও কালি ব্যয় করেছে।)

পরাশক্তি হিসেবে তুলনামূলকভাবে নবীন ও কম শক্তিধর চীনের কথা ধরা যাক। ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে চীনের সাফল্য সীমিত হলেও এই প্রাচীন সভ্যতা নিজেকে বরাবরই ‘ঐশ্বরিক’ বা ‘ঈশ্বর কর্তৃক নির্বাচিত’ বিবেচনা করে এসেছে। মধ্যযুগে চীন মুখ্যত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিজেকে এই অঞ্চলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক সাম্রাজ্য, যাকে আমরা আধুনিক ভাষায় ‘এম্পায়ার’ বলতে পারি—প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। পরবর্তী সময়ে চীনা পণ্ডিতেরা এই সাম্রাজ্য বিস্তারকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে স্থাপন করে দাবি করেছেন, এই বিজয়ের মূলে রয়েছে চীনা সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব (দেখুন—টংগং বাই, চায়না: দ্য পলিটিক্যাল ফিলোসফি অব দি মিডল কিংডম, প্রিন্সটন, ২০১২)। আধুনিক সময়ে, কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা দখলের পর এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক বিভেদ স্পষ্ট হওয়ার পর থেকে চীন নিজেকে গুণগতভাবে এক ভিন্ন ধরনের কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রমাণে ব্যস্ত থেকেছে। সে নিজের আগ্রাসী মনোভাব কখনোই গোপন রাখেনি, যদিও তা আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ব ও তৃতীয় বিশ্বের সঙ্গে সংহতির মোড়কে হাজির করেছে।

এই সরকারি অবস্থান ব্যাখ্যা করে দুই আধুনিক চীনা তাত্ত্বিক, চি-উহ শি এবং চিহ-উহ শি একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন যার ইংরেজি নাম চায়নাস জাস্ট ওয়ার্ল্ড: দ্য মর‍্যালিটি অব চায়নাস ফরেন পলিসি (লিন রাইনার পাবলিশার্স, কলোরাডো, ১৯৯৩), যার কেন্দ্রীয় থিসিস হলো, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সংশোধনবাদের খপ্পর থেকে তৃতীয় বিশ্বের পরিত্রাণের একমাত্র পথ চীনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সংহতি। আধুনিক চীনের রূপকার হিসেবে পরিচিত দেং শিয়াও পিং সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী চীনা নেতাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘নিজের ক্ষমতা গোপন রাখো, সে ক্ষমতা দেখানোর জন্য প্রকৃষ্ট সময়ের অপেক্ষায় থাকো।’ প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের নেতৃত্বে চীনের চলতি নেতারা যে তাঁদের সময় এসে গেছে বিশ্বাস করেন, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় তাঁদের বর্তমান অবস্থান থেকে তা স্পষ্ট।

চীনা তাত্ত্বিকেরা নিজেরাই কমিউনিস্ট চীনের পররাষ্ট্রনীতিকে দুই পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন। উভয় পর্যায়েই ‘জাতীয় স্বার্থ’ ও ‘নৈতিক দায়িত্ববোধ’ সমান গুরুত্ব লাভ করে। যেমন অধ্যাপক চেন জিমিন মনে করেন, প্রতিষ্ঠার প্রথম তিন দশক চীনা পররাষ্ট্রনীতি ‘আদর্শগত’ তাগিদ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এই পর্যায়ে সে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় বিপ্লবী চেতনা বিস্তারে বিস্তর অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে। দেংয়ের নেতৃত্বে সংস্কার ও ‘খোলা দরজা’ নীতির বাস্তবায়ন শুরু হলে সে তৃতীয় বিশ্বে আর্থিক সহায়তা কমিয়ে আনে এবং নিজের প্রতিবেশী ও অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোনিবেশ করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি এই পরিবর্তিত অবস্থান সত্ত্বেও চীন এসব দেশের প্রতি আগের মতোই সমান সহানুভূতিশীল ছিল। যদিও এই পরিবর্তিত নীতির লক্ষ্য ছিল তার নিজের অভ্যন্তরীণ কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও এক নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নির্মাণ। অধ্যাপক চেন জেমিনের ভাষায়, এই উভয় নীতিই ‘দায়িত্বসম্পন্ন চেতনা’ দ্বারা পরিচালিত (দেখুন: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ, জাপান, জয়েন্ট রিসার্চ সিরিজ নং ৩)।

আমাদের বিবেচ্য তৃতীয় পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন তার জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই নিজেকে পশ্চিমা, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ‘আদর্শগত’ রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে। সোভিয়েত রাষ্ট্রের জনক লেনিন বিশ্বাস করতেন, সফল রুশ বিপ্লবের আদলে পশ্চিম ইউরোপে, বিশেষত জার্মানি ও ইংল্যান্ডে, প্রলেতারীয় বিপ্লব জয়ী হবে। তার প্রস্তুতি হিসেবে ১৯১৯ সালে তাঁরই নির্দেশে তৃতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল (কমিন্টার্ন) গঠিত হয়। এর দায়িত্বে ছিলেন লিওন ট্রটস্কি, বিশ্বের সর্বহারার আন্তর্জাতিক সংহতির নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও এই সংস্থাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিল না। লেনিন ও ট্রটস্কির নেতৃত্বে এই পররাষ্ট্রনীতির একটা প্রকাশ ছিল নিকট প্রাচ্য তথা মধ্য এশিয়ায় সোভিয়েত রাষ্ট্রের আগ্রাসন ও অধিগ্রহণ। পরবর্তীকালে, সোভিয়েত স্বার্থের অনুকূল এই বিবেচনায় স্তালিন সংশোধনবাদী হিসেবে নিন্দিত এমন রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধনেও আবদ্ধ হতে পিছপা হননি। একই যুক্তিতে পশ্চিম ইউরোপে ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সঙ্গেও সোভিয়েত কমিউনিস্টদের আঁতাত গড়ে তোলা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মস্কো কমিউনিস্ট সংহতির নামে পূর্ব ইউরোপের এক বড় অংশের ওপর নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্ব অর্জন করে। সত্তরের দশকে এই ‘সম্প্রসারণবাদ’ মস্কোকে আফগানিস্তানে নিয়ে যায়। প্রায় একই সময়ে সে দক্ষিণ এশিয়া, ইন্দো–চীনসহ আফ্রিকার এক ব্যাপক অঞ্চলে সোভিয়েত–সমর্থিত সরকার গঠনে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পদ নিয়োগ করে (ইথিওপিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, সোমালিয়া)। অনেকে, যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশেষজ্ঞ মারি মেন্ড্রাস, এই সময়কে সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির ‘উজ্জ্বল সময়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন (দেখুন: প্রসিডিংস অব দ্য একাডেমি অব পলিটিক্যাল সায়েন্স, ৩৬ খণ্ড, সংখ্যা ৪)। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির এই ‘উজ্জ্বল সময়ের’ অন্তর্গত।

সোভিয়েত ইউনিয়ন তার ইতিহাসের প্রথম পর্যায়ে বিশ্বের সব দেশকে সোভিয়েতপন্থী ও সোভিয়েতবিরোধী—এই দুই ভাবে বিভক্ত করায় আগ্রহী ছিল। তাদের দাবি ছিল, সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য এবং এই লড়াইয়ে সোভিয়েত ব্যবস্থার বিজয় অবশ্যম্ভাবী। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে পার্টির প্রধান নিকিতা খ্রুশ্চেভ জানালেন, না, এই লড়াই অনিবার্য নয়। সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্র—অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে সক্ষম। সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য কোনো দেশকে সোভিয়েত মডেলও অনুসরণ করতে হবে না। এমনকি সরাসরি সমাজতান্ত্রিক পথ অনুসরণের বদলে এসব দেশ ‘অধনতান্ত্রিক পথ’ অনুসরণ করে অগ্রসর হয়ে একসময় তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম। সোভিয়েত ধাঁচে সমাজতান্ত্রিক মডেলে তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভারত যুক্তরাষ্ট্রের অভিভাবকত্বে গঠিত নিরাপত্তা আঁতাতের প্রতি সন্দেহমূলক ও কখনো কখনো সরাসরি বৈরী অবস্থান গ্রহণ করে। সে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজের রাজনৈতিক ও কৌশলগত মিত্র হিসেবে ভারতকে স্বাগত জানায়। পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান লিওনিদ ব্রেজনেভের নেতৃত্বকালীন সময়ে এই আদর্শগত মৈত্রী আরও বেগবান হয়। ব্রেজনেভ যুক্তি দেখান, সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে সহাবস্থান আসলে একরকমের শ্রেণিসংগ্রাম। অধনতান্ত্রিক পথে আগুয়ান মার্কিনবিরোধী তৃতীয় বিশ্বের এসব দেশ অব্যাহত সেই শ্রেণিসংগ্রামের অন্তর্গত। বিশ ও একুশতম পার্টি কংগ্রেসে জানানো হয়, এক দিকে ধনতন্ত্রের সংকট গভীরতর হচ্ছে, অন্য দিকে ধনতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলো দ্রুত সংহত হচ্ছে, যার পরিণতিতে সমাজতন্ত্রের নিশ্চিত বিজয়। ভারতের মতো বিকাশমান দেশ এই লড়াইয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশীদার।

১৯৭১ সালে এই ভূরাজনৈতিক পরিকাঠামোর ভেতরই বাংলাদেশের প্রতি তিন প্রধান শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের পররাষ্ট্রনীতি ও অবস্থান গঠিত হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন