default-image

দেশব্যাপী আবহাওয়ার বিচিত্র আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে চলছে বৃষ্টিপাত, অন্যদিকে ঊর্ধ্বমুখী রাতের তাপমাত্রা। একই সময়ে দেশের এক স্থানে বৃষ্টিপাত, অন্য স্থানে প্রচণ্ড গরম দেখা যায় না। সাধারণত এক জায়গায় বৃষ্টিপাত হলে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও তাপমাত্রা সমান অনুপাতে কমে যায়। কিন্তু চলতি বছর তাপমাত্রার একটি বিচিত্র আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে।

দেশের এক জায়গার আবহাওয়া আরেক জায়গার আবহাওয়ার মধ্যে অনেক তারতম্য দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, তেঁতুলিয়া ও রাজধানীর মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য বিদ্যমান। এই দুই এলাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মধ্যে অনেক তারতম্য দেখা যাচ্ছে। যেমন দুদিন আগে রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং তেঁতুলিয়ার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাধারণত এই ঋতুতে আবহাওয়ার তারতম্য তেমন থাকে না দেশের কোনো জায়গায়। এ ক্ষেত্রে পার্থক্য ছিল ব্যাপক। এ কারণে আবহাওয়াবিদেরা এটাকে বলেছেন বিচিত্র আচরণ।

এদিকে আবহাওয়ার বিরূপ আচরণের প্রভাব শুধু যে পরিবেশে লক্ষিত হচ্ছে তা নয়, এর প্রভাবে মানুষের নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যাও সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন নতুন রোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে মানুষকে। এ ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু ও ২০২০ সালে করোনা–বিপর্যয়ের জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে দায়ী করেছেন কোনো কোনো বিজ্ঞানী। আবহাওয়ার এ রকম পরিবর্তনের ফলে, দেশের সব পেশার মানুষ এই নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদ মো. রশীদ বলছেন, এবার আবহাওয়ার তারতম্য অনেক বেশি। হঠাৎ করে তাপমাত্রা পড়ে যাচ্ছে, আবার আবার কোথাও কোথাও অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা যদিও খুব বেশি নিচে নামেনি, তথাপি কোথাও কোথাও বৃষ্টির কারণে ঠান্ডার অনুভূতি বেশি ছিল। এ বছরের আবহাওয়া অন্য বছরের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম তবে অস্বাভাবিক নয়। গত বছর তুলনামূলক উষ্ণ ছিল এবারের চেয়ে। মো. রশীদ বলেন, এটা ঠিক যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে, জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। এর একটা প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। তবে এটা এক বছরের আবহাওয়ার প্রকৃতি থেকে নিরূপণ করা সম্ভব নয়।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ুতে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তার আলামত খুবই স্পষ্ট। এবার অস্ট্রেলিয়ার দাবানল থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছিলেন নাসার বিজ্ঞানীরা।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, আবহাওয়া অথবা জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। আগে বাংলাদেশে নভেম্বরেই শীত পড়ে যেত, বেশ কয়েক বছর যাবৎ ডিসেম্বরে শীত পড়ছে। শীতের ব্যাপ্তি কমে যাওয়া এবং পরিবেশে তাপমাত্রা বেশি থাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাসজনিত রোগ বাড়ছে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা এডিস ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বংশবিস্তার করতে পারে। খুব ভালোভাবে বংশবিস্তার করে ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকলে। এবার বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি ডেঙ্গু বিস্তারের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ছিল। ফলে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি তো বটেই, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ডেঙ্গু–আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। বিশ্ব জলবায়ু ও আবহাওয়া যে রকম তারতম্য বিদ্যমান রয়েছে, তার প্রভাব আমাদের দেশে প্রতিফলিত হচ্ছে।

ড. আলমগীর বলেন, চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু এডিস মশা দিয়েই ছড়ায়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়া ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে এ রোগ খুব বেশি দেখা যায়নি। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছিল। এটা অবশ্য হয়েছে একটু ভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্যের কারণে। ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস ইজিপ্টাই দিয়ে আর চিকুনগুনিয়া ছড়ায় এডিস অ্যালবুপিক্টাস প্রজাতির মাধ্যমে। অ্যালবুপিক্টাস প্রজাতিকে একবার ধাওয়া দিয়ে লোকালয়ের বাইরে পাঠিয়ে দিলে সে আর মানুষের কাছে আসে না। এ প্রজাতি তখন পশু ও পাখির রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু ডেঙ্গু জীবাণু বহনকারী এডিস ইজিপ্টাইকে মানুষের রক্তই খেতে হয়। এটাকে ধাওয়া দিলেও বারবার সে মানুষের কাছে ফিরে আসে। সে কারণে ডেঙ্গু–আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হয়। আর এ প্রজাতির মশাগুলোর বংশবৃদ্ধি হয়ে থাকে তাপমাত্রা বেশি থাকলে। ড. আলমগীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা বাড়লে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ও কালাজ্বরের প্রকোপও বাড়তে থাকে। তবে বাংলাদেশে এই তিনটি রোগ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শস্যের গুণাগুণ ও উৎপাদনের পরিমাণে পরিবর্তন আসে; পানির স্বল্পতা ঘটবে, হ্রাস পাবে মাটির উর্বরতা। একই সঙ্গে নতুন নতুন বালাই দেখা দিতে পারে। ফলে কৃষিতে কীটনাশক ও সারের প্রয়োগ বাড়াতে হবে। সেচের ব্যাপকতা, ভূমিক্ষয়, মৎস্যবৈচিত্র্য কমে যাওয়া, রাসায়নিকের ব্যবহার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ফলে দারিদ্র্য বাড়বে এবং সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়বে। ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ধান ও গমের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ইতিমধ্যেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রের উপরিতলের উচ্চতা এক মিটার (১ গজ ৩ ইঞ্চি) উঁচু হতে পারে। এতে বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ এলাকা নিমজ্জিত হতে পারে। এমন হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

ইবির কৃষিবিজ্ঞানী ড. তৌফিক জানিয়েছেন, বন্যার কারণে আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষক সেচনির্ভর বোরো ধানের দিকে ঝুঁকেছেন। অন্যদিকে, ধানের দিকে কৃষক বেশি ঝুঁকে পড়ায় ডাল চাষের জমি হ্রাস পেয়েছে। ফলে আবাদও হ্রাস পেয়েছে। তা ছাড়া পাট, গম ও আখের চাষ ও উৎপাদন উভয়ই লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের ১০ ফসল উৎপাদনে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, এটা নিয়ে চার বছর গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের মিনোসোটা ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অন দ্য এনভায়রনমেন্টের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেছেন, বিশ্বের ৮৩ শতাংশ খাবার আসে এই ১০টি ফসল থেকে। ফলাফলে তাঁরা দেখিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সব ফসলের ক্ষতি হয় না। কোনো কোনো ফসলের উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বের প্রধান দুটি ফসল ধান ও গম উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বে ধান উৎপাদন কমিয়েছে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ এবং গম উৎপাদন কমিয়েছে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। তবে খরা-সহনীয় ধান উৎপাদন বেড়েছে সাব-সাহারান এলাকায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংস্থা (ইউএনসিসি) বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন হলে নতুন নতুন রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে বছরে দুই কোটি ২৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকে।

*লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন