বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হিন্দু কবি মুকুন্দরাম ষোড়শ শতকের শেষ দিকে (১৫৯০ সালের দিকে) তাঁর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে এই অঞ্চলে আসা নতুন মুসলমানদের শক্তিমত্তার দিকটি বর্ণনা করেছেন। মুকুন্দরাম বলেছেন,

‘পশ্চিমের বেরুণিয়া আইল দফর মিয়া

সঙ্গে জন বাইস হাজার।

ছোলেমানী মালা করে জপে পীর পেগম্বরে

বন কাটা পাতায়ে বাজার।।’

সে সময় ঢাকার বিখ্যাত মসলিনের মতো উচ্চমাত্রার বিশেষায়িত দক্ষতাসম্পন্ন বস্ত্র খাতসহ শিল্প উদ্যোগ দ্রুত বিকশিত হয়েছিল। এমনকি পশ্চিমের তুলনায় পূর্ববঙ্গে কৃষির উন্নয়ন পরে ঘটলেও দ্রুতই পূর্বাঞ্চল প্রতিযোগিতার অবস্থানে চলে আসে। উৎপাদনশীলতায় প্রায়ই পশ্চিমবঙ্গকে ছাড়িয়ে যায় তারা। সে সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে হিন্দু-মুসলমানদের সম্মিলন ভালোভাবেই ঘটেছিল। তবে এর মধ্যেই ভূমির মালিকানায় বৈষম্য শুরু হয়, যা ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকেই নাটকীয়ভাবে তীব্র আকার নেয়। বিশেষ করে লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে।

default-image

ভাষার প্রভাব

কিসের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন? অভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসই কি তাঁদের এক করেছিল? এটা বড় ভূমিকা রেখেছিল।

তবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাঙালির এক ভাষা এবং এর সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষের গর্ব। বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক সীমানার উভয় পাশের বাসিন্দাদের বাঙালি পরিচিতির ক্ষেত্রে এই ভাষার একটি আশ্চর্য প্রভাব ছিল। যেমনটি আমি আগে উল্লেখ করেছি, পূর্ব পাকিস্তানে আলাদা হওয়ার রাজনৈতিক আন্দোলন, যা থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ হয় এবং পরিণতিতে একটি নতুন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হয়, তার সূচনা হয়েছিল বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমাবেশের মধ্য দিয়ে ভাষার প্রশ্নে বাঙালির জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ওই সমাবেশ ভন্ডুল করতে চেয়েছিল, যাতে শহীদ হন অনেকে। ভাষা আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারীদের স্মরণে বাংলাদেশে এই দিনকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়েও দিনটিকে ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

বাঙালির জাতীয় চেতনার বিকাশে যাঁরা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের অন্যতম কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি তিনি। সাহিত্যিক অবদানের পাশাপাশি বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মেলবন্ধনে অগ্রণী ভূমিকার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বরের অন্যতম হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষয়ে নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (তরুণ বয়সে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তির জন্য খ্যাতি ছিল নজরুলের) চেয়ে খুব আলাদা কিছু ছিল না। তবে তিনি লিখেছেন আরও দৃঢ়তার সঙ্গে। নজরুল ইসলাম লেখায় তাঁর মানবতাবাদী বাঙালি চিন্তাধারার সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতার প্রতি বামধারার প্রতিশ্রুতির সম্মিলন ঘটিয়েছেন। তিনি ছিলেন মুজাফ্ফর আহমেদের বন্ধু, প্রখ্যাত এই বাম রাজনীতিকের ব্যাপক প্রভাব ছিল কবির ওপর। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন মুজাফ্ফর আহমেদ। ব্রিটিশ ভারতের কারাগারে থাকাকালে তাঁর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনের দিকে ঝুঁকেছিলেন আমার কাকা জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত। মুজাফ্ফর আহমেদও কাজী নজরুল ইসলামের একটি চমৎকার আত্মজীবনী লিখেছিলেন। সেখানে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ মানবতা ও সামাজিক ন্যায্যতার প্রতি কবির অঙ্গীকারগুলো তুলে ধরেন।

সবার উপরে মানুষ সত্য

লাঙল নামে একটি সাহিত্য সাময়িকী ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই সাময়িকীতে কার্ল মার্ক্সের একটি আত্মজীবনীর ওপর

পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়। ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তা ছাড়া কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকার প্রথম পাতায় মানুষের মহত্ত্ব প্রচারের উদ্দেশে ১৫ শতকের বাঙালি কবি চণ্ডীদাসের একটি উক্তি মুদ্রিত হতো:

‘শুনহ মানুষ ভাই,

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই’

বাঙালির চিন্তায় নজরুলের প্রভাব ছিল বিপুল। বিদ্রোহী কবিখ্যাতি তাঁর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করেছিল। অনেক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের গভীর অনুরাগীরাও প্রিয় কবির সুগন্ধি দার্জিলিং টি-এর বদলে নজরুলের কড়া স্বাদের আসাম টি-এর দিকে ঝুঁকতেন। আমার সময়ে হাতে গোনা কিছু বাঙালি ছিলেন, যাঁরা হৃদয় দিয়ে নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি আবৃত্তি করতেন না। এখানে কবি লিখেছেন,

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’—ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন

কাণ্ডারী, বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র

আমার নানা ক্ষিতি মোহন সেন বাঙালি সংস্কৃতিতে হিন্দু-মুসলমানের গভীর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি লিখতেন তিনি। তাই নানার লেখাগুলো পড়া ছাড়াও এ বিষয়ে আমার নিয়মিত বাড়ির কাজ থাকত। সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার সংকীর্ণতা নিয়েও বিপুলসংখ্যক গল্প তাঁর সংগ্রহে ছিল। একটি আমি খুব পছন্দ করতাম। কারণ, সেখানে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি ধর্মপ্রচারকদের বিষয়ে বাঙালির সাধারণ সংশয়ী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছিল। এক সন্ধ্যায় বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে এল।

ক্ষিতি মোহনের বড় ভাই অবনী মোহন তাঁর বাড়িতে মাহাফিজুদ্দিন নামের এক মুসলিম ধর্মপ্রচারক বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন। এক কল্কে থেকে ধূমপান করছিলেন দুজন। চক্রবর্তী নামে এক হিন্দু পুরোহিতকে পাশ দিয়ে যেতে দেখলেন তাঁরা। মাহাফিজুদ্দিন খুব আন্তরিকভাবে তাঁকে আড্ডায় ডাকলেন। চক্রবর্তী তাতে আপত্তি করলেন। দুজনের মধ্যে ব্যবধান কোথায়, সে বিষয়ে চক্রবর্তী বললেন, তিনি একজন সাচ্চা ব্রাহ্মণ আর মাহাফিজুদ্দিন একজন মুসলিম মৌলভি। তাঁরা দুজন ‘অনেক আলাদা’ দাবি করে চক্রবর্তী বললেন, তাঁদের একসঙ্গে ধূমপান করাটা ঠিক হবে না।

জবাবে মৌলভি বললেন, ‘শোনো বন্ধু, আসলে আমাদের মধ্যে কোনো তফাত নেই। তুমি বোকা হিন্দুদের শোষণ করে বেঁচে থাকো, আর আমি বেঁচে থাকি বোকা মুসলমানদের শোষণ করে। আমরা আসলে একই কাজ করি।’

বহুসংস্কৃতির মিলন

ছাত্র থাকাকালে আমি বিশেষভাবে অভিভূত হয়েছিলাম বাংলায় বহুসংস্কৃতির মিলনে। এই ইতিহাস এখন বিস্মৃতপ্রায়। তবে প্রকৃতপক্ষে ‘সন’ নামে বাংলা বর্ষপঞ্জির ইতিহাস স্মরণ করার মতো। এটাই ভারতীয় উপমহাদেশে একমাত্র টিকে থাকা পঞ্জিকা। সম্রাট আকবর একটি সর্বভারতীয় এবং কোনো একক ধর্মের নয়, এমন একটি পঞ্জিকা ‘তারিখ-ই-এলাহী’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলা বর্ষপঞ্জি কাটাছেঁড়া করেন। ১৬ শতকের শেষভাগে যখন চন্দ্রনির্ভর মুসলিম হিজরি পঞ্জিকায় প্রথম সহস্রাব্দ শেষের দিকে এগিয়ে আসছিল, সে সময় আকবর ভারতের জন্য হিন্দু, জৈন বা পারস্য পঞ্জিকার মতো একটি সৌরবর্ষনির্ভর বহুসংস্কৃতির পঞ্জিকা প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। তবে তাতে মুসলিম হিজরি পঞ্জিকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সমন্বয়ের লক্ষ্য ছিল তাঁর। আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ১৫৫৬ সালে তাঁর ওই বর্ষপঞ্জি গণনা শুরু হয়। হিন্দু শক পঞ্জিকার ১৪৭৮ এবং হিজরির ৯৬৩ সাল ছিল এটা।

আকবরের উচ্চাশা সত্ত্বেও তাঁর তারিখ-ই-এলাহী পঞ্জিকা কখনো দিল্লি ও আগ্রায় মানুষ গ্রহণ করেনি। যদিও আকবরের আদালতকক্ষে এটা ব্যবহার করা হতো।

তবে তা ভালোভাবে গৃহীত হয়েছিল আকবরের সাম্রাজ্যে পরে যোগ হওয়া বাংলায়। আকবরের তারিখ-ই-এলাহীর প্রভাবে সংস্কার হওয়া ওই পুরোনো বাংলা বর্ষপঞ্জি আজও বহুল প্রচলিত। অনেক হিন্দু উৎসবের ক্ষেত্রে তা এখনো গুরুত্বের সঙ্গে অনুসৃত হয়।

যখন আমি এই লাইনগুলো লিখছি, তখন বাংলা ১৪২৭ সন। মুসলিম ঐতিহ্য সমন্বয় করে এই বর্ষপঞ্জি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এখানে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনা স্মরণ করা যায়, এমন ইঙ্গিত রয়েছে। এই পঞ্জিকায় চান্দ্র ও সৌরবর্ষের সম্মিলনে গণনার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু কোনো ধর্মীয় উৎসবে এই পঞ্জিকা অনুসরণের ক্ষেত্রে হয়তো তাঁর সঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরত সম্পর্কে একেবারেই অবগত না-ও থাকতে পারেন।

তাই ধর্মীয় বিভাজন ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নকরণ নয়, বাংলার ইতিহাস হলো মিলনের ইতিহাস। এটাই সেই দর্শন ও বোঝাপড়া, যা একটি ঐক্যবদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ধারণাকে বাস্তব করেছে। এ কারণেই বাংলাদেশ তার নিজের মতো করে বিশ্বের সামনে দাঁড়াতে পারছে।
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন