default-image

ভারতে বেড়াতে গিয়ে খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত বাংলাদেশি যুবক বাদল ফরাজির সাজা মওকুফের ব্যবস্থা নিতে ভারতকে অনুরোধ জানাবে সরকার। বাদলের যাবজ্জীবন সাজার পরিমাণ ও দণ্ড মওকুফ করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়ে আজ সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে গত মাসে বাদল ফরাজির সাজা মওকুফের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছিল। মন্ত্রণালয় মানবিক বিবেচনায় তাঁর সাজা মওকুফের মত দিয়েছে। তবে ভারতীয় আইনে এ মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে বলে আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।


বাদল ফরাজি এখন কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বয়স ৩২ বছর। ১৮ বছর বয়সে তিনি ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি খুনের মামলায় তাঁর সাজা হয়। যদিও খুনের ঘটনাটি ঘটেছিল তিনি ভারতে যাওয়ার আগে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকের নথিতে তাঁকে নির্দোষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন


ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আজকের বৈঠকে বাদল ফরাজির সাজার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। কারাগার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাদল ফরাজি ভারতে হাজতবাস, রেয়াত ও দণ্ড মিলিয়ে রোববার পর্যন্ত মোট সাজা খেটেছেন ১৩ বছর ৯ মাস ১১ দিন। ভারতের কারাগারে সাজা খাটার পরিমাণ ১০ বছর ৭ মাস।। অন্যদিকে বাংলাদেশে রেয়াত যোগ করে তাঁর সাজা খাটা হয়েছে ৩ বছর ২ মাস ১১ দিন। দুই দেশ মিলিয়ে বাদল ফরাজি সাজা খেটেছেন ১৩ বছর ৯ মাস ১১ দিন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ভারতের পেনাল কোড অনুযায়ী যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ ১৪ বছর। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ ৩০ বছর। বাদলের মুক্তির বিষয়টি নির্ভর করছে কোন আইনে তাঁর সাজা কার্যকর হবে, তা নির্ধারণ করার ওপর। ভারতের আইনে সাজার পরিমাণ ১৪ বছর ধরা হলে বাদল ফরাজির আড়াই মাসের মধ্যে এমনিতেই মুক্তি পাওয়ার কথা। অবশ্য এর আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক একাধিকবার প্রথম আলোকে বলেছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে ভারত সরকার।


স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কারা অনুবিভাগ) সৈয়দ বেলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেহেতু আমরা জানতে পেরেছি তিনি প্রকৃত দোষী নন, সেহেতু আমরা চাই তাঁর সাজা মওকুফ করা হোক। কিন্তু এই ক্ষমতা ভারত সরকারের হাতে। কারণ, ভারতের আদালত তাঁকে সাজা দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ জন্যই পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠক ডেকেছে। আমরা চাই তিনি মুক্তি পান।’


বাদল ফরাজি শখের বশে তাজমহল দেখতে পর্যটক ভিসায় ভারতে গিয়েছিলেন ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই। এর প্রায় দুই মাস আগে (৬ মে) দিল্লির অমর কলোনিতে এক বৃদ্ধা খুন হন। বিভিন্ন সময় ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বলছে, বেনাপোল সীমান্ত পার হতেই বাদল ফরাজিকে বাদল সিং ভেবে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট বাদল ফরাজিকে দিল্লির সাকেত আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায়ের বিরুদ্ধে দিল্লির হাইকোর্টে আপিল করা হয়। সেখানেও নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকে। গ্রেপ্তারের সময় তিনি ইংরেজি বা হিন্দি বলতে না পারায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে সঠিকভাবে বিষয়টি বোঝাতে পারেননি। কারাগারেই তিনি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। একপর্যায়ে কারাগারে ইংরেজির শিক্ষকতা শুরু করেন। স্নাতকের পর আটটি ডিপ্লোমা কোর্সও করেন।

একপর্যায়ে বন্দীদের কাউন্সেলিং করতে যাওয়া ভারতের মানবাধিকারকর্মী রাহুল কাপুরের সঙ্গে কথা হয় বাদল ফরাজির। শুরু হয় ‘জাস্টিস ফর বাদল’ শীর্ষক একটি স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি। রাহুল ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করেন। সরকারের চেষ্টার পর ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ভারত তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ মাহবুবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাদল কারাগারে এখন সহবন্দীদের পড়ান, ইংরেজি শেখান।
বাদলের মা শেফালি বেগম থাকেন বাগেরহাটে। তিনি এই প্রতিবেদককে প্রায়ই ফোন করেন ছেলের খবর জানতে। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবাই আশা দেয়, কেউ কিছু করে না। এত দিন পর যখন বৈঠক হচ্ছে, হয়তো কিছু হবে। ভালো খবরের আশায় থাকলাম।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন