বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানি শাসনামলে যখন ডিসি, এসপিসহ (অধিকাংশই অবাঙালি ও তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত) আমলা, অভিজাত শ্রেণির ব্যক্তিদের স্ত্রীরা লেডিস ক্লাব বা অন্যান্য রিক্রিয়েশন ক্লাব গঠন করে নিজেদের আনন্দ-বিনোদনের আলাদা ক্ষেত্র গড়ে নিয়েছিলেন, তখন একজন নামী চিকিত্সকের স্ত্রী হয়েও মুশতারী শফী সেই সম্ভ্রান্ত সমাজের অংশ মনে করেননি নিজেকে। বরং গড়ে তোলেন বান্ধবী সংঘ নামে একটি সংগঠন, যেখানে ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে নারীরা সংস্কৃতিচর্চা করতে পারেন অনায়াসে। বান্ধবী সংঘের পক্ষ থেকে মেয়েদের স্বনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে সেলাই ও অন্যান্য হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। দর্শনীর বিনিময়ে নাটক মঞ্চায়নের আয়োজনও করেছিল বান্ধবী সংঘ সেই ষাটের দশকেই।

১৯৬৪ সালে মেয়েদের প্রেস থেকে প্রকাশিত হলো বান্ধবী নামের একটি মাসিক পত্রিকা। উমরতুল ফজল, সালেহা জহুর, আইনুন নাহারসহ জনাকয়েক লেখিকা-সাংবাদিককে নিয়ে একটি মানসম্মত পত্রিকা প্রকাশের কঠিন পরীক্ষায় নেমেছিলেন এর সম্পাদক মুশতারী শফী। এ পরীক্ষায় যে তিনি সফল হয়েছিলেন, ১১ বছর ধরে এই পত্রিকার অব্যাহত প্রকাশই তা প্রমাণ করে। বান্ধবী চট্টগ্রাম ও ঢাকা তো বটেই, কলকাতাতেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। শুরুর দিকে এর প্রকাশসংখ্যা শ পাঁচেক হলেও, পরে তা আরও বাড়ে বলে এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছিলেন মুশতারী শফী।

মেয়েদের প্রেস ও বান্ধবীর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো চট্টগ্রামের এনায়েতবাজার এলাকার বাটালি রোডের মুশতারী লজের নিচের তলায়। বাড়িটি তখন চট্টগ্রামের শিল্পী-সাহিত্যিক-লেখক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কারণ, মুশতারী শফীর স্বামী ডা. মোহাম্মদ শফী তাঁর চিকিত্সা পেশার বাইরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৭১ সালে কালুরঘাটে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছিল এই বাড়িতে। শব্দসৈনিক বেলাল মোহম্মদের সঙ্গে এই বেতার কেন্দ্রের বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিলেন মোহাম্মদ শফী ও মুশতারী শফী। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগে ও পরে শফী দম্পতি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, অর্থ সাহায্য ইত্যাদি কাজে যুক্ত ছিলেন। ২৭ মার্চ মুশতারী লজে রাখা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রাকভর্তি অস্ত্র। ৭ এপ্রিল এই বাড়ি থেকে মুশতারী শফীর স্বামী ও ভাই এহসানুল হক আনসারীকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়। এর পর থেকে তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি কোনো দিন।

মাত্র ৩৩ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়ে শিশুসন্তানদের নিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে পড়লেও, সাহস ও উদ্যম হারাননি শহীদজায়া। বহু কষ্টে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কলকাতায় গিয়ে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন। এই কেন্দ্রে উম্মে কুলসুম ছদ্মনামে কথিকাপাঠ ও শ্রুতিনাটকে অভিনয় করেছেন। ওই সময়ে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে ‘জানেন ওদের মতলব কী?’ শীর্ষক তাঁর কথিকা প্রচারিত হতো নিয়মিত।

default-image

স্বাধীনতার পর জীবিকা হিসেবে মুশতারী শফী বেতারে চাকরি নিয়েছিলেন। তবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন সব সময়। তাঁর লেখা বেশ কিছু গ্রন্থের মধ্যে ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’ বই দুটি পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনে নিজের সম্পৃক্ততা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর লেখা ‘চিঠি, জাহানারা ইমামকে’ মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল পাঠকমহলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশগঠনের পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন মুশতারী শফী। তিনি হয়ে উঠেছিলেন চট্টগ্রাম, তথা সারা দেশের প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষের প্রিয়জন। ঘাতক দালাল নির্মূল থেকে শুরু করে গণজাগরণ আন্দোলন ও যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে উচ্চ কণ্ঠ ছিলেন তিনি।

মুশতারী শফী ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ ও ২০২০ সালে রাষ্ট্রীয় পদক পান। কিন্তু দীর্ঘ সৃজনশীল ও সংগ্রামমুখর জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর একুশে পদকে ভূষিত না হওয়াটা হতাশাজনক মনে করেন অনেকেই। অবশ্য তাঁকে এ নিয়ে কখনো ক্ষোভ-দুঃখ প্রকাশ করতে দেখিনি আমরা। বরং ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভা-সমাবেশে উপস্থিত থাকতেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতেন, নতুন প্রজন্মকে মুক্তচিন্তায় অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করতেন।

মুশতারী শফীর মৃত্যুতে একটি অধ্যায়ের অবসান হলো। সেই তরুণ বয়স থেকে নারীমুক্তির কথা বলে এসেছেন তিনি, মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছেন, স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। সেই মেয়েরা তাদের ‘বান্ধবী’কে হারাল। জাতি হারাল গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক সোচ্চার কণ্ঠ।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন