বারবার মৃত্যু, তবু অবহেলা

রেলের অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় নিয়মিত মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ব্যস্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতে কে ব্যয় করবে, তা নিয়ে। রেললাইনের ওপর দিয়ে সরকারি সংস্থার তৈরি রাস্তার কারণে ক্রসিং তৈরি হয়। সেগুলোতে রেলের অনুমোদন নেওয়া হয় না। রেলও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় না।

এমনই একটি অনুমোদনহীন রেলক্রসিং যশোরের অভয়নগরের ভাঙা গেট। কয়েক বছর আগে সেখানে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তৈরি রাস্তার কারণে ওই রেলক্রসিং তৈরি হয়। গত ১৬ অক্টোবর সেটি পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে একটি প্রাইভেট কার। এতে একই পরিবারের চারজনসহ মোট পাঁচজন মারা যান।

বিজ্ঞাপন
রেলক্রসিংয়ে প্রাণহানি বন্ধ করা কঠিন। যেভাবে সারা দেশে রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, এর সব কটি নিরাপদ করতে প্রচুর বিনিয়োগ দরকার। সময়ও লাগবে। তিনি বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ যতটা সম্ভব ক্রসিংয়ে পাহারাদার নিয়োগের চেষ্টা করছে। নতুন রেললাইন নির্মাণের যেসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোতে ক্রসিং এড়ানোর পরিকল্পনা আছে।
নূরুল ইসলাম, রেলপথমন্ত্রী

দুর্ঘটনার পর রেলের কর্মকর্তারা গিয়ে ক্রসিংটি বন্ধ করে দেন। এতে ভৈরব নদের দুই পাশে অভয়নগর উপজেলার আটটি গ্রামের মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়। বাণিজ্যও বিঘ্নিত হয়। তখন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দায়িত্ব নিয়ে বাঁশ দিয়ে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে ক্রসিংটি চালু করেন। রেলওয়ে এখন এলজিইডির কাছ থেকে টাকা নিয়ে সেখানে একটি অনুমোদিত ক্রসিং তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। রেলের পশ্চিমাঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী ওয়ালিউল হক গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

একটি বড় দুর্ঘটনার পরে অভয়নগরের অনুমোদনহীন রেলক্রসিংটির একটা গতি হচ্ছে। কিন্তু দেশের ৪৫ শতাংশ রেলক্রসিংই অনুমোদনহীন। রেলওয়ে জানিয়েছে, দেশে মোট ক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬১। এগুলোর মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ১৪৯টির। এসব ক্রসিংয়ের বেশির ভাগ তৈরি হয়েছে এলজিইডি, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তার কারণে।

রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রেলক্রসিংয়ে ৩১০টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালে ১৩টি দুর্ঘটনায় মারা যান ১৮ জন।

এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, রেলক্রসিংয়ে প্রাণহানি বন্ধ করা কঠিন। যেভাবে সারা দেশে রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, এর সব কটি নিরাপদ করতে প্রচুর বিনিয়োগ দরকার। সময়ও লাগবে। তিনি বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ যতটা সম্ভব ক্রসিংয়ে পাহারাদার নিয়োগের চেষ্টা করছে। নতুন রেললাইন নির্মাণের যেসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোতে ক্রসিং এড়ানোর পরিকল্পনা আছে।

সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রেলক্রসিং নিরাপদ করার বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, এখন থেকে রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হলে অনুমতি নেওয়া হবে। নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হবে। এখনকার অরক্ষিত ক্রসিংগুলো সুরক্ষিত করা হবে
হেলালুদ্দীন আহমদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব

বহুদিন ধরে চিঠি চালাচালি

২০১৩ সালে রেলের তখনকার মহাপরিচালক মো. আবু তাহের এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে অনুমোদনহীন ক্রসিং ও দুর্ঘটনার ফিরিস্তি দিয়ে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি বলেন, নতুন রেললাইন তৈরি করে প্রথম ট্রেন চালানোর ১০ বছর পর থেকে ক্রসিং তৈরি ও গেটম্যান নিয়োগের ব্যয় বহন করতে হয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এলজিইডির প্রকৌশলীদের বারবার চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানোর পরও অদ্যাবধি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চিঠিতে রেলওয়ের মহাপরিচালক আরও বলেন, বিষয়টির গুরুত্ব ও ভয়াবহতা সম্পর্কে উপলব্ধি করতে জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

‘জরুরি পদক্ষেপ’ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে চিঠি দেওয়ার ছয় বছর পর রেলওয়ে ২০১৯ সালের আগস্টে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে আরেকটি চিঠি দেয়। এতে আবারও দুর্ঘটনার ফিরিস্তি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন রেলের মহাপরিচালক। সর্বশেষ গত ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে রেলের পক্ষ থেকে বিষয়টি সুরাহার অনুরোধ জানানো হয়।

এই চিঠি চালাচালির বিষয়ে রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিচালন) মো. মিয়াজাহান প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার পর রেলের পক্ষ থেকে এলজিইডির স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছিল। তবে তাতে ফল পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ৩৯ কিলোমিটার রেললাইনে ৮৫টি ক্রসিং রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি ক্রসিংয়ে আন্ডারপাস অথবা ওভারপাস নির্মাণের জন্য বিভিন্ন সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা কিছুই করেনি।

রেলওয়ে গত এক দশকে রেললাইন তৈরি ও কেনাকাটায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে বরাদ্দ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতে উদ্যোগ খুব সামান্য।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রেলক্রসিং নিরাপদ করার বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, এখন থেকে রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হলে অনুমতি নেওয়া হবে। নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হবে। এখনকার অরক্ষিত ক্রসিংগুলো সুরক্ষিত করা হবে।

তবে রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে অবকাঠামো ও পাহারাদার নিয়োগ করতে হলে হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হবে। স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগ দেওয়াও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ কাজে বিদেশি অর্থায়ন সম্ভব নয়। করোনার পরিস্থিতিতে রাজস্ব খাত থেকে এত বিপুল খরচ করারও সুযোগ নেই। কারণ, সরকার অতিপ্রয়োজনীয় কিছু প্রকল্প বাদে বাকিগুলোর অর্থায়ন করছে না। ফলে শিগগিরই রেলক্রসিংয়ে প্রাণহানি কমানোর মতো সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন।

বিজ্ঞাপন

৮২% অরক্ষিত

রেলওয়ে রেললাইন নির্মাণ, ইঞ্জিন-কোচ সংগ্রহ এবং অবকাঠামো নির্মাণে কর্তৃপক্ষ যতটা গুরুত্ব দেয়, রেলক্রসিং নিরাপদ করার বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না।

রেলের নথি থেকে জানা যায়, দেশের ৮২ শতাংশ রেলক্রসিংই অরক্ষিত। এসব ক্রসিংয়ে ট্রেন চলাচলের সময় যানবাহন আটকে দিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে কোনো প্রতিবন্ধক বসানো হয়নি। পাহারাদারদের বেশির ভাগের চাকরি স্থায়ী নয়। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে অথবা প্রকল্পের আওতায় তাঁরা কাজ করেন। অল্প কিছু পুরোনো পাহারাদার ছাড়া বাকিদের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতারও ঘাটতি আছে। ফলে তাঁদের দায়িত্বে অবহেলায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

ঢাকার একটি ক্রসিংয়ের দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাহারাদার বলেন, কয়েক বছর আগে ঝুঁকি নিয়ে একজন ব্যক্তিকে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচানোর পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রশংসা করে। তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ডেকে নিয়ে কিছু অর্থসাহায্যও দেন। চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাস দেন, কিন্তু তা আর স্থায়ী হয়নি।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৭ নভেম্বর ও ফেনীতে ১১ অক্টোবর দুটি রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় পাঁচজন মারা যান। আহত হন আরও ১৫ জন। দুটি ক্রসিংয়েই পাহারাদার ছিলেন। তাঁদের দুজনই অস্থায়ী চাকুরে। দুটি দুর্ঘটনাই ঘটেছে ভোরে। স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, পাহারাদার তখন ঘুমাচ্ছিলেন।

রেলওয়ে অধ্যাদেশ ১৮৯০ অনুসারে, রেললাইনের ওপর দিয়ে অনুমতি না নিয়ে চলাচল করলে দায়ী ব্যক্তিদের দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। যানবাহনের চালককে রেলপথ পার হওয়ার সময় দেখে-শুনে পার হওয়ার কথা। যেখানে পাহারাদার বা যানবাহন আটকানোর প্রতিবন্ধক নেই, সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে যে সংস্থার সড়ক, সেই সংস্থাকে দায়ী করা হয়। সঙ্গে যানবাহনের চালকের অসতর্কতাকে দায়ী করা হয়।

রেলওয়ে অরক্ষিত ক্রসিংগুলোতে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দায় সারছে। সাইনবোর্ডের বার্তা অনেকটা এমন, ‘এই গেটে কোনো গেটম্যান নাই, পথচারী ও সকল প্রকার যানবাহনের চালক নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন এবং যেকোনো দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকিবেন।’

কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রেলওয়ে গতানুগতিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে। একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় সব প্রতিবেদনেরই ভাষা, সুপারিশ ও দায়ী করার পদ্ধতি একই।

গেট হয়েছে, জনবলের কী হবে

২০১৫ সালে রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ৬৭২টি রেলক্রসিং উন্নয়ন ও সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করতে দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রথমে ব্যয় ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা, পরে তা বাড়িয়ে ১৯৭ কোটি টাকায় নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে যানবাহন আটকানোর পাহারাদারের সংকট কাটছে না।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুটি প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৮৮৮ জন পাহারাদার নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। বর্তমানে ১ হাজার ৫৯০ জন কর্মরত। তবে তাঁদের চাকরি অস্থায়ী। আগামী বছর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এরপর এসব ক্রসিং কে পাহারা দেবে, সেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১৯৮৪ সালের পর রেলে কোনো স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগ হয়নি। মাঝেমধ্যে কিছু পাহারাদারকে অস্থায়ী থেকে স্থায়ী করা হয়। রেলের নিয়োগবিধি জটিলতার কারণে দুই বছর ধরে সব ধরনের নিয়োগই বন্ধ আছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সারা বিশ্বেই রেল নিরাপদ ও দ্রুতগতির বাহন। উন্নত বিশ্ব বাদ দিয়ে আশপাশের দেশের সঙ্গে তুলনা করলেও বাংলাদেশের রেল অনেক পিছিয়ে। তিনি বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে রেললাইন নির্মাণ ও ইঞ্জিন–কোচ কেনা হচ্ছে। কিন্তু গতি বাড়ছে না, দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে। এর পেছনে ঘন ঘন অরক্ষিত রেলক্রসিং দায়ী।

সামছুল হক আরও বলেন, ক্রসিংয়ে ওভারপাস-আন্ডারপাস নির্মাণ ব্যয়সাপেক্ষ। তবে এটিই সবচেয়ে ভালো সমাধান। এর আগে পাহারার ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।

মন্তব্য পড়ুন 0