নতুন বেতনকাঠামোতে নিম্ন আদালতের বিচারকদের সুবিধা কমে গেছে। জেলা জজ ছাড়া অন্যদের পদোন্নতি অনুযায়ী বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে আগের সমস্যাটি নতুন কাঠামোতেও রয়ে গেছে।

নতুন বেতনকাঠামোর আদেশ বিশ্লেষণ এবং নিম্ন আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারকদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৬ নামে গত ১৩ এপ্রিল একটি আদেশ জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। আদেশটি ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর।

অবশ্য আদেশ জারির আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানাকে চেয়ারম্যান করে গঠিত বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এ বিষয়ে সমাধানের সুপারিশ করলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। আর নতুন করে তিনটি বিষয় বিচারকদের হতাশ করেছে। এগুলো হলো মূল বেতনের সঙ্গে সংগতি রেখে জুডিশিয়াল ভাতা ও কার্যভার ভাতা না পাওয়া এবং ডোমেস্টিক এইড ভাতা বাতিল হয়ে যাওয়া।

এ বিষয়ে অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ ১৭ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করেই আদেশ জারি করা হয়েছে। কমিশনের সুপারিশও আমলে নেওয়া হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ঢাকা জেলার জজ এস এম কুদ্দুস জামান প্রথম আলোকে বলেন, সমস্যা সমাধানে শিগগিরই তাঁরা বৈঠক ডাকবেন এবং সরকারের কাছে দাবি তুলে ধরবেন।

বিধিমালার সঙ্গে আদেশের অসংগতি: ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পথ ধরে ২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয় বিচার বিভাগ। ওই বছরই করা হয় বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলাবিধান এবং চাকরির অন্যান্য শর্ত) বিধিমালা। এতে বলা হয়, অতিরিক্ত জেলা জজ থেকে জেলা জজ হতে ১৫ বছর, যুগ্ম জেলা জজ থেকে অতিরিক্ত জেলা জজ হতে ১০ বছর, সিনিয়র সহকারী জজ থেকে যুগ্ম জেলা জজ হতে ৭ বছর এবং সহকারী জজ থেকে সিনিয়র সহকারী জজ হতে ৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

কিন্তু নতুন আদেশে জেলা জজদের পূর্ণ বেতন পাওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে ১৫ বছরের বদলে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা জজদের ১০ বছরের বদলে ১২ বছর, যুগ্ম জেলা জজদের ৭ বছরের বদলে ১০ বছর এবং সিনিয়র সহকারী জজদের ৪ বছরের বদলে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে।

পদোন্নতি অনুযায়ী বেতন নেই: ২০১৫ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পূর্ণ বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে আদেশে (২০০৯) যে শর্ত রয়েছে, তা বিধিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ অবস্থা বিচার বিভাগে একধরনের হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি করছে।’

আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, ২০০৯ সালের বেতনকাঠামো অনুযায়ী অতিরিক্ত ও যুগ্ম জেলা জজরা পদোন্নতি পেয়েও পূর্ণ বেতন পাচ্ছিলেন না। নতুন আদেশেও একই সমস্যা রয়ে গেছে।

পদোন্নতি পেয়েও নিচের ধাপে বেতন পাচ্ছেন অতিরিক্ত জেলা জজ এবং যুগ্ম জেলা জজরা। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৭০ জন অতিরিক্ত জেলা জজ এক ধাপ নিচের পদে বেতন পাচ্ছেন। এ ছাড়া ৩২১ জন যুগ্ম জেলা জজ বেতন পাচ্ছেন সিনিয়র সহকারী জজের ধাপে।

বর্তমানে নিম্ন আদালতে ১ হাজার ৫৭০ জন বিচারক রয়েছেন। এর মধ্যে ৭০ জন সিনিয়র জেলা জজসহ জেলা জজ রয়েছেন ২৩০ জন, অতিরিক্ত জেলা জজ ২২৬ জন, যুগ্ম জেলা জজ ৩২০ জন, সিনিয়র সহকারী জজ ৩৪৫ জন এবং সহকারী জজ রয়েছেন ৪৪৯ জন।

আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক ১৭ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, সমস্যা থাকলে আদেশ যেকোনো সময়ই সংশোধন হতে পারে।

সুবিধা কমে গেল: মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচারকদের জন্য মূল বেতনের ৩০ শতাংশ ‘জুডিশিয়াল ভাতা’ চালু করা হয়, যা বিচারকেরা পেয়েও আসছিলেন। নতুন আদেশে বলা হয়, ‘২০১৫ সালের ৩০ জুন তাঁরা যে পরিমাণ জুডিশিয়াল ভাতা পেতেন, এখনো তাই পাবেন।’ অর্থাৎ এই ভাতার পরিমাণ এখন নির্দিষ্ট হয়ে গেল। তার মানে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ হারে বিচারকেরা আর জুডিশিয়াল ভাতা পাচ্ছেন না।

সিনিয়র জেলা জজদের ডোমেস্টিক এইড ভাতা নতুন আদেশে একেবারেই বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ জাতীয় বেতনকাঠামোতে সচিবদের এই ভাতার পরিমাণ তিন হাজার টাকা ঠিকই রাখা হয়েছে।

চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য আগের আদেশে বলা ছিল, বিচারকেরা মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে ‘কার্যভার ভাতা’ পাবেন। আবার এ-ও বলা ছিল, এর পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি হবে না। কিন্তু নতুন আদেশে বেতন বাড়লেও এই ভাতার পরিমাণ আগের মতোই রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে আদেশটি বৈষম্যপূর্ণ এবং এটি সংশোধনের দাবিদার।’

কার কত বেতন

নতুন আদেশে সিনিয়র জেলা জজদের বেতন ধরা হয়েছে নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা। চাকরির মেয়াদ ১৪ বছর পূর্ণ হয়েছে এমন বিচারকদের কাঠামো হবে আগের ৩৬০০০-৩৯৬০০ টাকার পরিবর্তে ৭০৯২৫-৭৬৩৫০ টাকা।

এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা জজদের বেতন ৩২০০০-৩৭০০০ টাকার পরিবর্তে ৬২৩৫০-৭৫৮৮০, যুগ্ম জেলা জজদের ২৮০০০-৩৭০০০ টাকার পরিবর্তে ৫৪৩৭০-৭৪৬৬০, সিনিয়র সহকারী জজদের ২৩০০০-৩৪২০০ টাকার পরিবর্তে ৪৪৪৫০-৭২২১০, চার বছর পূর্ণ হওয়া সিনিয়র সহকারী জজদের ১৮০০০-২৯২০০ টাকার পরিবর্তে ৩৪৫৪০-৬৫২১০ এবং প্রবেশ পদ, অর্থাৎ সহকারী জজদের বেতন ১৬০০০-২৫৬০০ টাকার পরিবর্তে ৩০৯৩৫-৬৪৪৩০ টাকা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন