বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.

গতকাল আগস্টের ৮ তারিখ সকালেই খবর পেলাম, তিনি ইহলোক ছেড়ে গিয়েছেন। আমার জীবনসঙ্গী মতিউর রহমান খবরটি জানালেন ম্লান-দুঃখিত গলায়। আমরা কয়েক দিন ধরেই শুনছিলাম উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ থেকে তাঁর জীবনসংশয়ের কথা।

কত স্মৃতি, কত আনন্দ, কত প্রাপ্তি তাঁকে ঘিরে আমার জীবনের ৫১টি বছরের অর্থবহ মুহূর্ত, দিন, মাস, বছর স্মৃতিময় হয়ে আছে, তা এই স্বল্প পরিসরে কীভাবে লিখব, কীভাবে প্রকাশ করব?

তিনি আমার ব্যক্তিজীবনে কর্মজগতের অর্থবহ পরিবর্তন ঘটিয়েছেন ২০০০ সালে। ‘কমিউনিজম’-এর আদর্শে যাপিত জীবন যখন নারী আন্দোলনের পথপ্রদর্শক কবি সুফিয়া কামালের প্রেরণায় সারা দেশে নারী আন্দোলনের সংগঠন-সভা করছিলাম, চাকরি করছিলাম নানা রকমের, অধ্যাপক নাজমা চৌধুরী তখন আমাকে গভীর মমতায়, স্নেহময় নির্দেশে যুক্ত করলেন (২০০০ সালে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উইমেন্স স্টাডিজ’-এর ‘অধ্যাপনা’র কর্মজগতে।

আমার কল্পনায়ও এমন সৌভাগ্য এবং কর্মজগতের উত্তরণের স্বপ্ন ছিল না। তাঁর একান্ত যত্ন এবং একান্ত পরিচর্যায় ১১টি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম। সেই বিভাগটির নাম এখন পরিবর্তিত হয়েছে ‘উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ’ নামে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সংস্পর্শে, নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে, নারী আন্দোলনের বহু মতাদর্শের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। গবেষণার কাজের ক্ষেত্রে নাজমা চৌধুরী আপার অব্যাহত প্রেরণায় আমরা সবাই কর্মক্ষেত্রে এগিয়েছি।

বলে শেষ করা যাবে না তাঁর অবদান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা সম্বল করে ‘সেন্টাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি’তে যোগ দিতে পেরেছি ২০১১ সালে ‘স্যোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ’ বিভাগের প্রধান হিসেবে।

আমার ব্যক্তিজীবনের এসব সাফল্য বড় বিষয় নয়—প্রধান বিষয় হচ্ছে তাঁর অদম্য ভালোবাসা, প্রেরণা, পথপ্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বহু ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, সংগঠক, গবেষক কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তিনি একজন বটবৃক্ষস্বরূপ ছিলেন। শিক্ষায়, গবেষণায়, কর্মক্ষেত্রে সবাইকে এগিয়ে দিয়েছেন। তাঁর নিজের জীবনের সব কৃতিত্ব অর্জনের জন্য পাশে পেয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় বাবা, মা, ভাইদের এবং সর্বোপরি জীবনসঙ্গী সুপ্রিম কোর্টের প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরীকে। মেয়েদের, নাতি-নাতনিদের বড় করেছেন স্নেহ-ভালোবাসায়। শিক্ষার প্রদীপ থেকে উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত করেছেন সবার মধ্যে। তাঁর জীবন অবসান হয়েছে বলতে চাই না। তাঁর আদর্শে যাঁরা পথ চলেছেন, সেই সব ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক-গবেষকের তিনি পথপ্রদর্শক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

default-image

৩.

যতবার ভাবছি তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা বা বারবার পেছন ফিরে তাকাব না—ততবার মহাশূন্যের মতো হতাশা গ্রাস করছে আর তীব্র দহনে আত্মার ভেতরে হাহাকার ধ্বনি গুমড়ে মরছে—পেছনে তাকাব না, তা হলে তাঁকে খুঁজে পাব কীভাবে? পাব নিশ্চয়ই, পাব তাঁকে আগামী দিনেও; তাঁর সব কাজের নিদর্শনের মধ্যে।

সেই পুরোনো দিনগুলো ১৯৭০ থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে আসছে অথবা বলা যায় ২০২১ সালের ৮ আগস্ট থেকে পেছন ফিরে চলতে চলতে পৌঁছে যাচ্ছে সত্তর-আশির দশকের সেই সব সভা, সম্মেলন, সেমিনারের স্মৃতিময় দিনগুলোতে। ‘উইমেন ফর উইমেন’ সংগঠনের অফিসে ‘লালমাটিয়ায়’ পরে ‘গ্রিন রোডে’ ছুটে ছুটে যেতাম সভায়-সেমিনারে। তিনি এবং আরও স্বনামখ্যাত গবেষক ও শিক্ষাবিদ মাহমুদা ইসলাম, রওশন জাহান, রওনক জাহান, জাহানারা ইসলাম, সালমা খান, লতিফা আখন্দ, রাশেদা কে চৌধূরী প্রমুখ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নারীশিক্ষা এবং নারী উন্নয়ন বিষয়ে আন্দোলন ও গবেষণাচর্চার পথপ্রদর্শক ছিলেন।

সেসব সভায়, সেমিনারে প্রবল আগ্রহে যোগ দিতাম। সবার উচ্চ গলার মতামত শুনতে শুনতে হঠাৎ ‘শান্ত-মসৃণ-মিষ্ট’ গলার স্বর শুনে থমকে যেতাম বিস্ময়ে। পুরো সভা শান্ত হয়ে যেত—যাঁর কথায় বা বলা যায় ‘বাণী’তে, তিনিই হচ্ছেন অধ্যাপক-গবেষক-বহু গুণের নাজমা চৌধুরী।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কার্যক্রম বিষয়ে অধ্যাপক নাজমা চৌধুরী আগ্রহী ছিলেন, সেটা জানতে পারলাম যখন জানলাম তিনি ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান’ বিভাগে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থাকার সময় একজন ছাত্রীকে ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ সংগঠনের বিষয়ে গবেষণা করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। নাজমা আপার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আকর্ষণ অনুভব করতে করতে তাঁকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের একটি জাতীয় সম্মলনের উদ্বোধন করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে কৃতজ্ঞভাজন হয়েছিলাম। তিনি আমাদের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কর্মকাণ্ড ও অধ্যাপনার প্রতি শ্রদ্ধা ও আগ্রহ বাড়তে থাকল। নারী আন্দোলনের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ জানতে পারলাম।

১৯৯৫ সালের ৩০ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর চীনের হুয়ায়রো ও বেইজিং শহরে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য ‘বাংলাদেশের এনজিও ফোরাম–৯৫’-এর জাতীয় প্রস্তুতি কমিটির (১৯৯৪-৯৫) কর্মকাণ্ডে নাজমা চৌধুরীর নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই স্মৃতি আজও আমার সমগ্র কাজ-গবেষণা ও অধ্যাপনার ক্ষেত্রে কাজে লাগছে। নাজমা আপার নেতৃত্বের স্মৃতি আমার পরম সম্পদ হয়ে আছে।

নাজমা আপার পার্থিব সব খ্যাতি, সম্মান, অধ্যাপনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রোকেয়া চেয়ার ও উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম নারী উপদেষ্টা, একুশে পদক অর্জন—সব ছাপিয়ে তাঁর বিনয়ী হাসিমুখের ছবিটাই অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল।

শ্রদ্ধা জানাই তাঁর অমর আত্মার স্মরণে।

ড. মালেকা বেগম: লেখক, গবেষক। চেয়ারপারসন, স্যোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন