বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিলুপ্ত বিধানে ১৫ জন কারাগারে
বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিলুপ্ত হওয়া ধারায় পুলিশ ১৫ জন শ্রমিকনেতার বিরুদ্ধে মামলা করে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। গত ডিসেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের একটি অংশ ১৫ হাজার টাকার ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন করায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। সে ঘটনায় এসব শ্রমিকনেতার বিরুদ্ধে বিলুপ্ত হওয়া আইনের ধারা প্রয়োগ করা হয়।
বিজিএমইএ ৫৫টি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেয় ২০ ডিসেম্বর। ১৯ ডিসেম্বর শ্রমিকনেতারা ‘ষড়যন্ত্র’ বা অপরাধ সংঘটনের চক্রান্ত করেছেন—এই অভিযোগ আনে পুলিশ। আশুলিয়ার পুলিশ বাদী হয়ে ১৫ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করে, তাতে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিলুপ্ত হওয়া ১৬(২) ধারা প্রয়োগ করা হয়। তাঁরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যে আশুলিয়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনি আক্তার কাশিমপুরে এবং বাকি ১৪ জন কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। ১৫ জনের ৮ জনকে আলোচনার জন্য ২১ ডিসেম্বর পুলিশ ডেকে নেয়, অন্যদের পরে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানা গেছে।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের দপ্তর সম্পাদক খালেকুজ্জামান লিপন তাঁদের অঙ্গসংগঠনের গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্ট সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল থানার সাধারণ সম্পাদক আহমেদ জীবনকে গ্রেপ্তারের বৈধতা চালেঞ্জ করে রিট আবেদন করার পর বিষয়টি নজরে আসে। আহমেদ জীবন গ্রেপ্তার হওয়া ১৫ জনের অন্যতম। ওই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. সেলিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ১৭ জানুয়ারি কেন তাঁর গ্রেপ্তারের আদেশকে আইনি এখতিয়ারবিহীন বলে ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সরকারকে এক সপ্তাহের সময় দিয়ে রুল জারি করেছেন।
১৯৭৪ সালের বিশেষÿক্ষমতা আইনের ১৬(২) ও ২৫(ঘ)-এর অধীনে ওই শ্রমিকদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একটি অধ্যাদেশ দিয়ে চুয়াত্তরের আইনের ১৬, ১৭ ও ১৮ ধারা বাতিল করেন। বিএনপি তা ১৯৯১ সালের সংসদে পাস করেছিল। এরপর ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে ‘ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক’ (প্রধানত সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী) কাজ থেকে বিরত রাখতে ১৬ ধারাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর এই অধ্যাদেশসহ ১২২টি অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে পেশ করা হয়, কিন্তু তা পাস হয়নি। ফলে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৬, ১৭ ও ১৮ ধারা বাতিল অবস্থায় থেকে যায়।
আইনজীবী সারা হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিলুপ্ত হওয়া আইনের অধীনে যেহেতু কারও আটকাদেশ অবৈধ, তাই তাঁরা হাইকোর্ট বেঞ্চে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের আরজি পেশ করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষÿযুক্তি দিয়েছে যে ওই অধ্যাদেশ পরে সংসদে পাস হয়ে থাকতে পারে। ওই বেঞ্চে মঙ্গলবার শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার। জানতে চাওয়া হলে গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৬(২) দফাটি সংসদে পাস হয়েছে কি হয়নি, সে বিষয়ে তিনি আদালতে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আমি বলেছি, এটা যাচাই করে দেখতে সময় লাগবে। এরপর আদালত এক সপ্তাহের সময় দিয়েছেন।’ তবে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের একটি সূত্র প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছে যে ২০০৭ সালের অধ্যাদেশটি পাস হয়নি। এমনকি সংসদ সচিবালয়ের গ্রন্থাগারে রক্ষিত রেকর্ডেও দেখা যায়, অধ্যাদেশটি পাস হয়নি।
জানা গেছে, শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় একাধিক মামলায় মোট ২৭ জন জেলে আছেন । এর মধ্যে চুয়াত্তরের আইনের বিলুপ্ত বিধানের আওতায় কারাগারে আছেন ১৫ জন। আহমেদ জীবন ও মিনি আক্তার ছাড়া অন্যরা হলেন সৌমিত্র কুমার দাস, রফিকুল ইসলাম সুজন, আল কামরান, সাকিল আহমেদ মোবারক, মিজানুর রহমান মিজান, মো. শামীম খান, মো. ইব্রাহীম, জাহাঙ্গীর আলম, এ আর মিন্টু, মো. তোফাজ্জল, আমিনুল ইসলাম, ইসরাফিল হোসেন ও দুলাল মীর।