default-image

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা পড়ানো হয় বিষয় হিসেবে। সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়, সিলেবাস অনুসারে ক্লাস নেওয়া হয়, ক্লাস শেষে পরীক্ষাও হয়। সেই পরীক্ষায় প্রায় সব শিক্ষার্থী উত্তীর্ণও হয়ে যায়। তবু কর্মক্ষেত্রে গিয়ে বাংলায় পাস করা শিক্ষার্থীকে ‘খোঁটা’ শুনতে হয়। বাংলায় পড়েও আমাদের শিক্ষার্থীরা স্বাধীন লেখার যোগ্যতা অর্জন করে না। নিশ্চয় বাংলা পাসের সার্টিফিকেট পেয়ে একজন শিক্ষার্থী কবিতা, উপন্যাস, গল্প বা নাটক লেখা শুরু করে না।

তবে এটা আশা করা যায়, একজন বাংলার শিক্ষার্থী বিষয়ঘনিষ্ঠ বই পড়ে মত প্রকাশ করতে পারবে, নাটক-সিনেমা দেখে এর ভালো-মন্দ লিখতে পারবে, কিংবা বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে এর সারসংক্ষেপ করতে পারবে। অবাক ব্যাপার হলো, বাংলার অধিকাংশ শিক্ষার্থী লেখার যোগ্যতা অর্জন করে না। এমনকি, পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তরে তারা যা লেখে, এর প্রায় পুরোটাই মুখস্থ করা অন্যের বক্তব্য। ভাষাগত দক্ষতাও বাংলার শিক্ষার্থীরা অর্জন করতে পারে না। তবে এসবের জন্য শিক্ষার্থীকে দায়ী করা ঠিক হবে না।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার সিলেবাস রয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব শিক্ষার্থীর জন্য ১০০ নম্বরের একটি বাংলা কোর্স আবশ্যিক করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ‘উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার লালন ও বাঙালি জাতীয় মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে সরকারের প্রয়াসের অংশ’ হিসেবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শীর্ষক কোর্স চালু করার বিষয়ে ‘কারিকুলামের রূপরেখা’ প্রণয়ন করেছে। কিন্তু কারিকুলাম নাম দিয়ে বাংলার একটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রণয়ন করেছে ইউজিসি। সিলেবাসে বাংলা ভাষা অংশে মূলত ধ্বনি, ধ্বনির উচ্চারণ, বানান রয়েছে। আর সাহিত্য অংশে রয়েছে কয়েকটি কবিতা, প্রবন্ধ আর ছোটগল্প। এ ছাড়া ভাষার অংশ হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলা ভাষা, বিশ্বায়ন—এ রকম কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর রচনা রাখা হয়েছে। এ থেকে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী কী শিখবে কিংবা কোন যোগ্যতা অর্জন করবে, বলা হয়নি।

কারিকুলাম কী, সেখানে কীভাবে পাঠ-অন্তর্ভুক্ত বিষয়কে রাখা হয়, এগুলোর কিছুই বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষকেরা বুঝে উঠতে পারেন না। কারণ, ছাত্র অবস্থায় তাঁরাও কারিকুলামের মধ্যে থাকেন না। আমাদের বাংলা পঠনপাঠন মানে শুধু সাহিত্যের অধ্যয়ন ও অধ্যাপন।

আসলে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিলেবাস প্রণয়নের মধ্যে সংকট রয়ে গেছে। কোনো রকম কারিকুলাম ছাড়া অধিকাংশ বিভাগের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে, পাস করে যায়। কোর্স-শিক্ষকের অজানা থেকে যায়, কী শেখাতে যাচ্ছেন। আর শিক্ষার্থীর কোনোকালে জানাও হয় না, এই কোর্সের মধ্য দিয়ে সে কী শিখল। বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের যত সমালোচনাই করা হোক না কেন, তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর কারিকুলামে পরিবর্তন আনে। এ কাজের জন্য দীর্ঘদিনের কর্মশালা হয়, পরিকল্পনায় অন্য দেশের সিলেবাস ও কারিকুলামকে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং অসংখ্য বিশেষজ্ঞ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অংশগ্রহণে সেই কারিকুলামকে পূর্ণাঙ্গ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখান থেকেও কিছু শিক্ষা নিতে পারে।

কারিকুলাম কী, সেখানে কীভাবে পাঠ-অন্তর্ভুক্ত বিষয়কে রাখা হয়, এগুলোর কিছুই বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষকেরা বুঝে উঠতে পারেন না। কারণ, ছাত্র অবস্থায় তাঁরাও কারিকুলামের মধ্যে থাকেন না। আমাদের বাংলা পঠনপাঠন মানে শুধু সাহিত্যের অধ্যয়ন ও অধ্যাপন। ভাষাবিষয়ক কোর্সগুলো কোণঠাসা হয়ে গেছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার কোর্স পড়ানোর মতো উপযুক্ত শিক্ষকও পাওয়া যায় না।

ভাষাবিষয়ক পঠনপাঠন ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন কেউ কেউ। অথচ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ নেই। যেখানে আছে, সেখানে ভাষার পঠনপাঠন বাংলা সাহিত্যসংশ্লিষ্ট নয়।

বাংলা সাহিত্যের সিলেবাস প্রণয়নেও অসংলগ্নতার শেষ নেই। এখানে সংগীত পড়ানো হয় শুধু টেক্সট হিসেবে। নজরুলের গানের সুর-বৈচিত্র্যের কিছুই শিক্ষার্থীরা তাই উপলব্ধি করতে পারে না। নাটক পড়ানো হয় গ্রন্থ হিসেবে। নাটকের চূড়ান্ত সাফল্য যে মঞ্চে, শিক্ষার্থীরা তা বুঝতে পারে না। চার বছরের অনার্স কোর্সে শিক্ষার্থীকে বাংলা বিষয়ের সঙ্গে আরও পড়তে হয় দর্শন, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়। এসব বিষয়ের সিলেবাসে একটুও নেই বাংলা সাহিত্যসংশ্লিষ্ট চিন্তার ছাপ। অথচ যথাযথ কারিকুলাম থাকলে সিলেবাসে এই অসংলগ্নতা থাকত না। বাংলা বিষয়ের সঙ্গে অনায়াসে যুক্ত করা যেত এই বিষয়গুলো।

default-image

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবশ্যিক বাংলা কোর্সকেও উদ্দেশ্যমূলক কারিকুলামের আওতায় আনা উচিত। সবার আগে দরকার শিক্ষার্থীকে বাংলা ভাষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করানো। এরপর দরকার বাংলা ভাষার গঠন ও বিন্যাসের রীতি সম্পর্কে ধারণ দেওয়া ও অনুশীলন করানো, যাতে ঠিকমতো বাংলায় লিখতে পারে। ভাবকে সংক্ষিপ্ত করার এবং ভাবকে সম্প্রসারিত করার কৌশল থাকতে হবে সিলেবাসে। এগুলো অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনপ্রক্রিয়ার অংশ করতে হবে। এ ছাড়া বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ইতিহাসের ধারা সম্পর্কে তারা জানবে; সাহিত্যে বিভিন্ন দর্শন ও মতবাদের প্রয়োগ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে; সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক ও আঙ্গিক-বৈচিত্র্য সম্পর্কেও ধারণা লাভ করবে।

বিজ্ঞাপন

প্রায় এক বছরে করোনা পরিস্থিতি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। অনলাইনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করানোর বিকল্প সুযোগ তৈরি হয়েছে। একে সামনের দিনগুলোতে কাজে লাগানো উচিত। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। ক্লাসরুমে সার্চ ইঞ্জিনে অনুসন্ধানের সুযোগ থাকতে হবে, যেকোনো সময় অডিও-ভিজুয়াল উপকরণ উপস্থাপনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অ্যাসাইনমেন্টগুলো কেবল পাঠনির্ভর হবে না। শিক্ষার্থী ফিল্ডওয়ার্ক করবে, দলভিত্তিক কাজ করবে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে করতে লাইব্রেরিমুখী হতে বাধ্য হবে। জ্ঞানার্জনকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক না করে সহযোগিতামূলক করতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন না আনলে শিক্ষার্থীরা ফটোকপি আর নোট মুখস্থের সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারবে না।

তবে সবকিছুকে সফল ও কার্যকর করার জন্য সবার আগে প্রণয়ন করতে হবে সময়োপযোগী কারিকুলাম। শিক্ষার্থীকে কোন যোগ্যতা অর্জন করাতে চাই, সেই যোগ্যতা কোন বিষয় ও কৌশলের মধ্য দিয়ে অর্জিত হবে, শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের ক্ষেত্র ও প্রক্রিয়া কী হবে, এগুলোর স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে কারিকুলামে। এই অনুযায়ী সিলেবাস প্রণয়ন করা হলে সেই শিক্ষা শিক্ষার্থীর জীবনঘনিষ্ঠ হবে। তখন বাংলার শিক্ষার্থীকে আর ‘খোঁটা’ শুনতে হবে না। আর সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা শিখন-শেখানোর লক্ষ্য পূরণ হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন