default-image

শহিদুল্লাহর বয়স ৫৮ বছর। রাজধানীর লালবাগ এলাকার মুদি দোকানি। বেশ কিছুদিন শরীরটা তাঁর ভালো যাচ্ছে না। পাড়ার চিকিৎসকের সন্দেহ, ডায়াবেটিস হয়েছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য রক্ত পরীক্ষা করাতে বলেছেন। পরীক্ষায় রক্তে শর্করার পরিমাণ জানা যাবে।

শাহবাগ মোড়ে বারডেম হাসপাতালের বহির্বিভাগে সকালে পা রাখার জায়গা থাকে না। মানুষ আর মানুষ। ছুটি আর হরতালের দিন ছাড়া প্রতিদিন রোগীর ভিড়ের একই দৃশ্য। রোগীর চাপ সামলাতে বারডেম কর্তৃপক্ষ ভবনের বাইরে রোগী বসার ব্যবস্থা করেছে। সেখানে অপেক্ষমাণ শহিদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘রক্ত দিছি। দুই ঘণ্টা বইতে কইছে। এক ঘণ্টা হইছে, এক ঘণ্টা বাকি।’

এখানেই আরেক রোগী মাবিয়া বেগম ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছেন মেয়ে আর নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে। দেড় মাস অন্তর নিয়মিত আসতে হয় তাঁকে। বসে ছিলেন বহির্বিভাগের ভেতরে, ভিড়ের মধ্যে। তিনি জানালেন, বারডেম হাসপাতালে প্রথম চোখে অস্ত্রোপচার হয়। তারপর কানে, কানের পর পিঠে। পরে অস্ত্রোপচার হয় পেটে। সবশেষে অস্ত্রোপচার হয়েছিল পায়ে। মাবিয়া বলেন, ‘গরিব মানুষ, বাঁচতে পারতাম না। পাঁচটা অপারেশন হইছে, এক টাকাও লাগে নাই। ওষুধও পাইছি ফ্রি।’

দেশের লাখ লাখ ডায়াবেটিস রোগীর আস্থার বড় ঠিকানা রাজধানীর এই বারডেম হাসপাতাল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন ৩ হাজার রোগী এখানে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়। বাংলাদেশে আর কোনো হাসপাতাল এত বেশিসংখ্যক ডায়াবেটিস রোগীর চিকিৎসা দেয় না। ডেনমার্কভিত্তিক বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি নভো নরডিক্সের দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর এলাকার করপোরেট ভাইস প্রেসিডেন্ট সেবনেম আফসার টুনা এ মাসের প্রথম সপ্তাহে এই হাসপাতাল পরিদর্শন করতে এসে বলেন, বেসরকারি খাতে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল বারডেম।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। ২০৪০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হবে। এই রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে বারডেম বড় ভূমিকা রেখে চলেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, বারডেম হাসপাতাল বাংলাদেশের গর্ব। বারডেম বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের আধুনিক চিকিৎসা ও ডায়াবেটিস সম্পর্কে জ্ঞানচর্চার সূচনা করেছে। বহু মানুষকে তারা বছরের পর বছর সেবা দিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি অবদানের এটি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সমিতি থেকে হাসপাতাল

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে স্বতন্ত্র নয়টি প্রতিষ্ঠান আছে। এগুলো হচ্ছে বারডেম (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারস), রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস, বারডেম নার্সিং কলেজ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস এবং হেলথকেয়ার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ডায়াবেটিস যে একদিন বড় মাপের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দেখা দেবে, এটা প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শুরুতেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (তখন নাম ছিল ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন ফর পাকিস্তান) গঠিত হয়।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত বছর আগে অধ্যাপক ইব্রাহিম বুঝতে পেরেছিলেন আমাদের মতো দেশে দরিদ্র ডায়াবেটিক রোগীরা পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে উঠবে। কাজেই এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দরিদ্র ডায়াবেটিক রোগীরা বিনা মূল্যে প্রাথমিক সেবা পাবে।’

অধ্যাপক ইব্রাহিম সেগুনবাগিচায় নিজের বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষকে সমিতির ব্যবহারের জন্য প্রস্তাব করেন। ওই বাড়িতেই ডায়াবেটিস সেবার জন্য বহির্বিভাগ চালু করেন। সেখানেই প্রথম শুরু হয় বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা।

পাকিস্তান আমলে সেগুনবাগিচায় হাসপাতালের জন্য কিছু জমি সরকার দিয়েছিল সমিতিকে। শাহবাগে বর্তমান জায়গায় হাসপাতাল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৯৮০ সালে। ২০১৩ সালে সেগুনবাগিচায় বারডেম-২ হাসপাতাল চালু করা হয়।

৫ লাখ নিবন্ধিত রোগী

বারডেমের পরিচালক (হাসপাতাল ও প্রশাসন) মো. শহিদুল হক মল্লিক জানান, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৭১৬টি। এর মধ্যে ১১০টি শয্যা দরিদ্র রোগীদের জন্য। দরিদ্রদের বিনা মূল্যের শয্যাগুলো ১০০ শতাংশ পূর্ণ থাকে। অন্য শয্যাগুলো ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পূর্ণ থাকে।

প্রতিদিন এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে গড়ে যে ৩ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসে, তার একটি বড় অংশ আসে নিয়মিত চিকিৎসায়।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নিবন্ধন করতে হয়। ৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ রকম নিবন্ধিত রোগী ছিল ৫ লাখ ৬৯ হাজার ১৩৯ জন। এসব রোগীর মধ্যে ৬৯ হাজার ৮২৫ জন রোগী বিনা মূল্যে সেবা পায়। তা ছাড়া, রোগীর আর্থিক অবস্থাভেদে ইনসুলিন, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেওয়া হয়।

পরিচালক শহিদুল হক মল্লিক বলেন, দরিদ্র রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যায় থাকা রোগীদের খাবার ও ওষুধের খরচ বারডেম কর্তৃপক্ষই বহন করে। তবে চিকিৎসাসেবার মানে কোনো পার্থক্য নেই। তিনি জানান, মোট ৬০টি বিভাগে ৫১৯ জন চিকিৎসক, ৬৩৯ জন নার্স এবং ২ হাজার ৬৬২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন।

আয় থেকে ব্যয়

একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ও ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খানের লেখা বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি: পথ-পরিক্রমা বই থেকে জানা যায়, প্রায় শুরু থেকে বারডেম হাসপাতালকে সরকার সহযোগিতা করে আসছে। এ কে আজাদ খান প্রথম আলোকে বলেন, আজকাল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। এই অংশীদারত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বারডেম হাসপাতাল।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর ডায়াবেটিক সমিতিকে কিছু অর্থ দেয়। সেই অর্থের একটি অংশ পায় বারডেম হাসপাতাল। মো. শহিদুল হক মল্লিক জানান, গত অর্থবছরে এই অনুদানের পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি টাকা। বিপরীতে গত অর্থবছরে দরিদ্র রোগীদের ইনসুলিন, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও হাসপাতাল খরচ বাবদ ৫২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, কেবিন থেকে এবং অন্য শয্যা থেকে (দরিদ্রদের জন্য রাখা শয্যা ছাড়া) আয় করে বারডেম কর্তৃপক্ষ। সেই আয় দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় করা হয়। ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ থেকেও আয় হয়। তা ব্যয় করা হয় দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায়। তিনি বলেন, বারডেম যে আয় করে সেই আয় ডায়াবেটিক সমিতি বা বারডেম হাসপাতালসংশ্লিষ্ট কেউ বাড়তি উপার্জন হিসেবে নেয় না, নিতে পারে না, নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পুরোটাই দরিদ্র রোগী ও হাসপাতালের পেছনে খরচ হয়।

নিবন্ধন করে চিকিৎসা

পরীক্ষায় নতুন রোগীর ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে প্রথমেই নিবন্ধন করা হয়। নিবন্ধনের সময় রোগীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ইতিহাস লিখে নেওয়া হয়। এরপর প্রত্যেক রোগীকে একটি করে গাইড বই দেওয়া হয়। বইয়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য ছাড়াও পরীক্ষা-নিরীক্ষার তথ্য লেখা হয়। তাতে পরবর্তী কোন তারিখে হাসপাতালে আসতে হবে, তারও উল্লেখ থাকে। এতে পরবর্তী ধাপে চিকিৎসার সুবিধা হয়।

হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় অনেক রোগীর হাতে এই বই দেখা যায়। অনেকের হাতে বহু পুরোনো বই, অনেকের হাতে পুরোনোর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া নতুন বই চোখে পড়ে।

চিকিৎসকেরা বলেন, ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। সচেতন হলে এই রোগ থেকে দূরে থাকা যায়। তবে এই রোগ নিরাময়যোগ্য নয়। এটা নিয়ন্ত্রণে রাখা তাই জরুরি। বারডেমের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ইব্রাহিম শুরুতেই ভেবেছিলেন শুধু চিকিৎসা দিয়ে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। রোগী ও তাঁর স্বজনদের এ ব্যাপারে শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে হবে। সে জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষার ব্যবস্থা আছে।

বারডেমে প্রতিদিন স্বাস্থ্যশিক্ষার ক্লাস হয়। ক্লাসে রোগী ও রোগীর স্বজনেরা উপস্থিত থাকেন। ডায়াবেটিস কেন হয়, কীভাবে ডায়াবেটিস দূরে রাখা যায়, ডায়াবেটিস রোগী কী খাবে কী খাবে না, ওষুধ খাওয়ার বিধি ইত্যাদি সম্পর্কে জানানো হয়।

কিন্তু হাসপাতালের নাম বারডেম জেনারেল হাসপাতাল রাখা হলো কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস হচ্ছে সারা অঙ্গের রোগ। ডায়াবেটিস হলে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, কিডনির সমস্যাসহ আরও নানা রোগ দেখা দেয়। সেসব রোগের চিকিৎসাও তো হওয়া দরকার। তাই শুধু ডায়াবেটিস চিকিৎসার ব্যবস্থা না রেখে অন্য রোগের চিকিৎসার আয়োজনও করা হয়েছে।

দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি

শুধু দেশের ভেতরে নয়, উন্নত সেবার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে বারডেম। ১৯৮২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারডেমকে তাদের সহযোগী কেন্দ্র হিসেবে মর্যাদা দেয়। এশীয় অঞ্চলে বারডেমই প্রথম হাসপাতাল যেটি ‘ডব্লিউএইচও কোলাবরেটিং সেন্টার ফর প্রিভেনশন, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কন্ট্রোল অব ডায়াবেটিস’-এর স্বীকৃতি লাভ করে বলে এ কে আজাদ খান তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন।

১৯৮৩ সালে বারডেম স্বাধীনতা পদক পায়। ২০০৪ সালে ইবনে সিনা পুরস্কার পায় হাসপাতালটি। এ ছাড়া ২০১৪ সালে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই) বিশেষ পদক দেয় এই হাসপাতালকে।   

এত বড় প্রতিষ্ঠান এত সুনামের সঙ্গে মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে আসছে। ‘এর মধ্যে কোন স্বীকৃতিটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?’ উত্তরে এ কে আজাদ খান বলেন, ‘মানুষের আস্থা। দেশের মানুষ মনে করে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বারডেমই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। আর দরিদ্র মানুষ বারডেমকেই তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবেই দেখে। মানুষের আস্থা অন্য সব পুরস্কার বা স্বীকৃতির চেয়ে অনেক মূল্যবান।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0