default-image

মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে জাতিসংঘের ১৭ জন তরুণ নেতার তালিকায় স্থান পেলেন বাংলাদেশি তরুণ প্রযুক্তিবিদ জাহিন রোহান রাজিন। তাঁর বয়স মাত্র ২২ বছর।

জাতিসংঘ জাহিনের মতো ওই ১৭ তরুণকে বলছে ‘ইয়াং লিডার্স’, যাঁরা নিজ নিজ দেশে সংস্থাটি গৃহীত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে ভূমিকা রাখছেন। মোটা দাগে এসডিজি হলো দুনিয়াজুড়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি উদ্যোগ। যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উপায়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূল করা, শোভন কাজ, মানুষের অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ইত্যাদি ১৭টি ক্ষেত্রে দেড় শতাধিক লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছে।

জাতিসংঘ গত শুক্রবার ২০২০ সালের জন্য নির্বাচিত তরুণদের তালিকা প্রকাশ করে। সংস্থাটি বলছে, নিজ নিজ কাজ ও নেতৃত্বের মাধ্যমে যে তরুণেরা এসডিজি অর্জনে ভূমিকা রাখছেন, তাঁদের স্বীকৃতি দিতেই এই আয়োজন। এ বছর ১৭ জনের তালিকায় জাহিন ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চীন, কলম্বিয়া, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশের তরুণেরা রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

২০১৬ সাল থেকে দুই বছর পরপর এ তালিকা প্রকাশ করে আসছে জাতিসংঘ। এ নিয়ে তৃতীয়বার তরুণ নেতার তালিকা প্রকাশ করল তারা। জাহিন এ তালিকায় স্থান পাওয়া দ্বিতীয় বাংলাদেশি তরুণ। এর আগে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সওগাত নাজবিন খান প্রথম ওই তালিকায় স্থান পান। তিনি ময়মনসিংহে একটি ডিজিটাল স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ নানা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।

জাহিনকে নিয়ে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। জাহিনের কাজ মূলত চারটি। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে পানির গুণাগুণ ও পানিতে থাকা জীবাণু শনাক্তের কৌশল বের করেছেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ঢাকা ওয়াসা। জাহিন ২০১৯ সালের মাঝামাঝি থেকে ঢাকা ওয়াসার একজন ‘সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং’ পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।

জাহিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতিসংঘের তরুণ নেতৃত্বের তালিকায় আসাটা আমার জন্য একটা অনুপ্রেরণা। এটা আমার কাজকে আরও উৎসাহ দেবে।’

জাতিসংঘের তরুণ নেতৃত্বের তালিকায় আসাটা আমার জন্য একটা অনুপ্রেরণা। এটা আমার কাজকে আরও উৎসাহ দেবে।
জাহিন রোহান রাজিন
বিজ্ঞাপন

জাহিনের বেড়ে ওঠা ঢাকায়। জাহিন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটসন ইনস্টিটিউটে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছেন। তাঁর ইচ্ছা, স্ট্যাটিস্টিক্যাল হাইড্রোমেকানিকস বিষয়ে নিয়ে তিনি স্নাতকোত্তর করবেন। এর আগে তিনি স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোতে মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিত ও পরিসংখ্যান নিয়ে পড়াশোনা করেন। ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো তাঁকে ‘ফিউচার ওয়ার্ল্ড চেঞ্জার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

জাহিনের সঙ্গে গতকাল শনিবার দুপুরে গুলশানে তাঁদের বাসায় দীর্ঘক্ষণ আলাপ হয়। ঢাকায় যেহেতু বেড়ে ওঠা, তাই ঢাকা নিয়েও নিজের ভাবনার কথা জানালেন। জাহিন বলেন, নগরায়ণ মানেই উন্নয়ন নয়। বাংলাদেশে নগরায়ণ হচ্ছে। এই নগরায়ণ মানুষের জীবনের উন্নতি করে না। তাই পরিবেশবান্ধব জৈবপ্রযুক্তি নিয়ে তরুণদের কাজ করা উচিত। এই চিন্তাই তাঁর কাজে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

জাহিন এখন কয়েকটি প্রযুক্তিবিষয়ক উদ্ভাবনী কাজে যুক্ত রয়েছেন। তিনি কোয়ান্টাম পলিকেমিকস বায়োটেকনোলজি নামের একটি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল পণ্য তৈরি করে থাকে। তাঁর এই উদ্যোগের লক্ষ্য পরিবেশবান্ধব বায়োপ্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন করা, যাতে মোড়কজাতকরণ কোম্পানি, খাদ্য সরবরাহ, কৃষিকাজ, বস্ত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই পরিবেশবান্ধব বায়োপ্লাস্টিক ব্যবহার করতে পারে। একই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা মোবারক আহমদ খান, যিনি পাট থেকে পচনশীল পলিব্যাগ উদ্ভাবন করেছেন।

বিজ্ঞাপন
‘আমি মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমন উদ্ভাবন চালিয়ে যেতে চাই।’

জাহিন কয়েকটি উদ্যোগ (স্টার্ট-আপ) নিয়েও কাজ করছেন। এর মধ্যে একটি হলো ‘হাইড্রোকুয়োপ্লাস’। প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ পানি নিয়ে কাজ করে। ‘লিংউইং’ নামের একটি শিক্ষামূলক উদ্যোগ আছে জাহিনের। এই প্রযুক্তি দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজিতে বলা ও লিখতে পারদর্শী হয়ে ওঠা যায়। তাঁর আরেক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাকুয়ালিংক রোবোটিকস’। প্রতিষ্ঠানটি শিল্পে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সমাধান দেয়। তিনি এটির সহপ্রতিষ্ঠাতা।

জাতিসংঘের ১৭ তরুণ নেতার তালিকায় স্থান পাওয়া ছাড়াও জাহিন জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ‘ইয়াং চ্যাম্পিয়ন অব আর্থ’ শীর্ষক পুরস্কারের জন্য মনোনীত ৩৫ সম্ভাবনাময় তরুণের মধ্যে রয়েছেন। এ বছরের শেষ নাগাদ এ তালিকা থেকে সাতজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকেই জাহিন জাতিসংঘের ওয়ান ইয়াং ওয়ার্ল্ডের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছেন।

তিন ভাইবোনের মধ্যে জাহিন সবার ছোট। তাঁর সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে তাঁর মা নাসরীন জাহান এসে যোগ দেন। মা জানান, তাঁর ছেলে ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিল। খেলাধুলা সব সময় পছন্দ করত, বিশেষ করে ফুটবল। বেশি বেশি ফুটবল খেলার জন্য একবার ছেলেকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ।

জাহিন বলেন, গণিত তাঁর প্রিয় বিষয়। অবশ্য এ দেশে শিক্ষার্থীদের গণিত মুখস্থ করানোর প্রবণতা পছন্দ নয় তাঁর। বলেন, এটা গণিতচর্চা নয়। স্বপ্ন কী, জানতে চাইলে জাহিন বলেন, ‘আমি মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমন উদ্ভাবন চালিয়ে যেতে চাই।’

মন্তব্য পড়ুন 0