বিয়ের ন্যূনতম বয়স নিয়ে ধীর গতিতে এগোচ্ছে সরকার
বাবা মা চাইলে বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারবেন কি না তা সুরাহা হয়নি এখনো। গত ১২ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪ নামে আইনের যে খসড়াটি মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে তা এখনো সেখানেই আছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার এ ক্ষেত্রে ধীর গতিতে এগোচ্ছে।
তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক খুব দ্রুত এ বিষয়ের সমাধান হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। বয়স সংক্রান্ত জটিলতা সম্পর্কে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুব দ্রুত মতামত জানিয়ে দেওয়া হবে।’
মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮-ই থাকছে। তবে মা-বাবা চাইলে ১৬ বছরেও বিয়ে হতে পারে। বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ১৬ করার এই পরিকল্পনা তীব্রভাবে সমালোচিত হওয়ার পর সরকার নতুন কৌশল অনুসরণ করে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রায় সাড়ে চার মাস আগে আইন মন্ত্রণালয়ে মতামতের জন্য যে খসড়া পাঠিয়েছে তাতেও উল্লেখ করা ছিল, ‘যুক্তিসংগত কারণে মা-বাবা বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর বয়সে কোনো নারী বিয়ে করলে সেই ক্ষেত্রে তিনি “অপরিণত বয়স্ক” বলে গণ্য হবেন না।’ খসড়া অনুযায়ী, অপরিণত বয়স্ক বা ‘মাইনর’ বলতে পুরুষ হলে অন্যূন ২১ এবং নারী হলে অন্যূন ১৮ বছর বয়সী কোনো ব্যক্তিকে বোঝাবে।
এর আগে খসড়া আইনটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৮ ডিসেম্বর যে অনুশাসন দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, ‘বিয়ের বয়স ১৮, তবে পিতামাতা বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সামাজিক সমস্যা কম হবে।’
আইনের খসড়ায় মতামত দিতে আর কত দিন লাগবে জানতে চাইলে আইন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ আইনের খসড়াটি নিয়ে অনেক আলোচনা, সমালোচনা আছে। সচিব স্যার নিজে খসড়াটি নিয়ে কাজ করছেন।’
অন্যদিকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকার এ বিষয়ে ধীরে চলো নীতিতে এগোচ্ছে। আর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইনের খসড়াটি মন্ত্রিসভায় আবার উত্থাপনের আগেই প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে বসার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে বিয়ের বয়সটি নিয়ে আবার যাতে কোনো ধরনের জটিলতার সৃষ্টি না হয় তার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয়ে খসড়াটিতে ভেটিং (মতামত) এর কাজ চলছে। তবে আমরা নিজ গরজেই আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে বসেছি। আলোচনা করেছি।’ ‘বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮-ই থাকছে, তবে তার বাইরেও আরও কিছু বিষয় আছে’ বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সাজা ও জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪’ -এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এই খসড়ায় নাবালকের সংজ্ঞায় পুরুষ হলে অন্যূন ২১ এবং নারী হলে অন্যূন ১৮ বছরের কথা উল্লেখ ছিল। একই বৈঠকে ১৯২৯ সালের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ছেলেদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ থেকে ১৮ এবং মেয়দের ১৮ থেকে ১৬ করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা ও বিরোধিতা শুরু হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন নারী ও মানবাধিকার সংগঠন সরকারকে স্মারকলিপি দিয়ে, মানববন্ধন করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানায়।
কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর করার দাবিতে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আন্দোলন এখনো চলছে। গত সোমবার এ দাবিতে ৬৯টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, ‘১৯২৯ সালের আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ করা হয়, আর ২০১৫ সালে এসে সরকার কীভাবে বিয়ের বয়স ন্যূনতম ১৬ করতে চায় তাই আমাদের প্রশ্ন।’ সরকার বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শর্ত বহাল রাখলে নারী আন্দোলন কঠোর কর্মসূচিতে যাবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আইন ও সালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল, উইমেন ফর উইমেনের সভাপতি জাকিয়া কে হাসান, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী, জাতীয় নারী জোটের আহ্বায়ক আফরোজা হক, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। তাঁরা বাল্যবিবাহের বিভিন্ন কুফল তুলে ধরেন।
গত জুলাই মাসে জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফ ও যুক্তরাজ্য সরকারের যৌথ আয়োজনে ২১ থেকে ২৩ জুলাই লন্ডনে অনুষ্ঠিত গার্ল সামিটে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছর বয়সের আগে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান।