প্রথম আলো: বৈষম্যবিরোধী বিল ২০২২ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। আপনি যখন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন এ ধরনের একটি আইন নিয়ে প্রথম কথা ওঠে। মূলত বেসরকারি সংগঠনগুলোই এই আইনের একটি খসড়া তৈরি করেছিল। পরে আপনি চলে যাওয়ার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নতুন করে আবার একটি খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করল। এতে আইনটি উত্থাপিত হতেই এক দশকের বেশি সময় চলে গেল। কী বলবেন এই অবস্থাটা নিয়ে?

মিজানুর রহমান: আপনি ঠিকই বলেছেন, আমি যখন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দায়িত্বে ছিলাম, তখনই এ ধরনের একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এবং সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করেছিলাম। বস্তুত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, ব্লাস্ট, নাগরিক উদ্যোগ, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ, আদিবাসী ফোরাম ইত্যাদি সংগঠন একযোগে অনেক মতবিনিময় ও আলাপ–আলোচনা করে বৈষম্যবিরোধী আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছিলাম। খসড়া আইনটি নিয়ে সব বিভাগীয় সদরে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছিল এবং তারপর সব সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক খসড়াটিতে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে চূড়ান্ত রূপ দেন এবং সেই চূড়ান্ত খসড়া আইনটি আমি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দায়িত্বে থাকাকালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করেছিলাম। পরে জানতে পেরেছি, আমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আবার নতুন করে এই বিষয়ের ওপর কাজ করে এবং একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করে। এর মধ্যে আসলেই এক দশকের বেশি সময় চলে গেছে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে অনাকাঙ্ক্ষিত কালক্ষেপণ হয়েছে। তবে এরপরও যে আইনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে, তা যেকোনো মানবাধিকারকর্মীর জন্য অতি আনন্দের বিষয়। আর মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করছে বলে আমি মনে করি। এতটা সময় চলে যাওয়ার কারণে মনে শঙ্কা বেঁধেছিল যে বৈষম্যবিরোধী আইন কোনো দিনই আলোর মুখ দেখবে কি না। শঙ্কাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে আমি দারুণ রোমাঞ্চিত, আনন্দিত এবং সরকারকে এ জন্য সাধুবাদ দিই।

প্রথম আলো: বৈষম্যবিরোধী আইনের প্রয়োজনীয়তা আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কতটুকু আছে?

মিজানুর রহমান: কথাটি হয়তো অনেকের বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হবে যে বাংলাদেশ অত্যন্ত বৈষম্যমূলক একটি সমাজ। এখানে জানা-অজানা নানা কারণে মানুষ বৈষম্যের শিকার হন। এটি শুধু ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য নয়। শুধু জাত-পাত, ধর্মবিশ্বাস, লৈঙ্গিক পরিচয় এগুলোই বৈষম্যের কারণ নয়। নানা অজুহাতে, নানা ছুতোয় মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করা হয় এবং নাগরিক বৈষম্যের শিকার হন। তাই এ ধরনের বৈষম্যবিরোধী আইনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যেকোনো সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন, আমাদের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের সংবিধানের অবস্থান হচ্ছে অবৈষম্যমূলক (Non-Discrimination)। কিন্তু বাস্তব জীবনে বৈষম্যমূলক আচরণকে প্রতিহত করতে হলে আরও কঠিন ও শক্ত আইনি ভিত্তি প্রয়োজন। তাই অবৈষ্যমকে বৈষম্যবিরোধী (Anti-Discrimination) হিসেবে গণ্য করতে হবে। এভাবে চিন্তা করলেই বৈষম্যবিরোধী আইনের প্রয়োজনীয়তা যে কারও কাছে স্পষ্ট করে প্রতিভাত হবে।

প্রথম আলো: বৈষম্য হলে এর বিরুদ্ধে শাস্তির কোনো ব্যবস্থা বিদ্যমান আইনে রাখা হয়নি। এর সমালোচনা হচ্ছে। এতে আইনটি কি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে না? কী করা উচিত বলে আপনার মনে হয়?

মিজানুর রহমান: দেখুন আমরা যে খসড়া করেছিলাম সেখানে বৈষম্যকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। কিন্তু উপস্থাপিত বিলে যদি শাস্তির কোনো বিধান না থাকে, তাহলে আইনটি কতটুকু ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে, তা নিয়ে বিশাল সংশয় থেকে যায়। আবারও বলছি, বাংলাদেশে যে ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ প্রতিনিয়ত ঘটে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে ভুক্তভোগীদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হলে বৈষম্যমূলক আচরণকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। না হলে এরূপ অসম্পূর্ণ আইন দ্বারা উদ্দেশ্য সাধিত হবে বলে মনে হয় না।

প্রথম আলো: বৈষম্যের শিকার হলে এখনো কেউ আদালতে যেতে পারে। কিন্তু আইনটি হওয়ার পর আগে বৈষম্য দেখভাল করা কমিটির কাছে যেতে হবে। পরে আদালতের প্রশ্ন আসছে। এতে ভুক্তভোগী মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা কি আরও বেড়ে গেল?

মিজানুর রহমান: ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও অধুনা বাংলাদেশে কেন যেন আমলাতন্ত্রকে অপরিহার্য মনে করা হয়। ভুক্তভোগী মানুষ নিজে যদি সরাসরি আদালতে শরণাপন্ন হতে না পারেন, তাহলে এ ধরনের আইন কতটা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে—এ ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমার এ সন্দেহ অমূলক কোনো সন্দেহ নয়। ভোক্তা অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও ভুক্তভোগী ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার পরই আইনের আশ্রয় পেতে পারেন। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই ভোক্তা অধিকার আইন কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবে নেই। আমার ভয় হচ্ছে যে বৈষম্যবিরোধী আইনেরও অনুরূপ পরিণতি না ঘটে।

প্রথম আলো: বিলটির বিরোধিতা করে এক সাংসদ বলেছেন, এতে ব্যভিচার বেড়ে যাবে। ধর্মীয় উপাসনালয়কে পাবলিক প্লেস সংখ্যার মধ্যে রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর আপত্তি আছে। কী বলবেন এই বিষয়ে।

মিজানুর রহমান: ব্যভিচার কেন বেড়ে যাবে, তা আমার কাছে একদমই বোধগম্য নয়। তবে এ ব্যাপারে আমি এই মুহূর্তে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছি। কেননা বিলটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা না করে এটিকে সমালোচনা করা সমীচীন হবে বলে মনে হয় না। তবে ধর্মীয় উপাসনালয় অবশ্যই পাবলিক প্লেস—এ ব্যাপারে মাননীয় সংসদ সদস্যের আপত্তির কোনো যৌক্তিক কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না।

প্রথম আলো: আমাদের দেশের জনবান্ধব আইন অনেকগুলো আছে। কিন্তু আইন থাকা এবং এর যথাযথ প্রয়োগের মধ্যে একটা পার্থক্য সব সময় লক্ষ করা যায়। সে দিক থেকে দেখতে গেলে বৈষম্যমূলক আইন কতটুকু কার্যকর হবে বলে আপনি মনে করেন।

মিজানুর রহমান: ‘আইন’ এবং ‘আইনের প্রয়োগ’ দুটি স্বতন্ত্র বিষয়। আইনের প্রয়োগের জন্য রাষ্ট্রের সদিচ্ছা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আইন প্রয়োগকারীর সংস্থার প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে একজন নাগরিক যদি নিজেই আইনের দ্বারস্থ হতে না পারেন এবং তাঁকে অন্য কারও মধ্যস্থতায় (এ ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখভাল করা কমিটির সন্তুষ্টির শর্ত পূরণ হলে) আইনি সাহায্য নিতে হয়, তাহলে প্রকারান্তরে এটি আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। এই বাধার অন্য অর্থ হচ্ছে আইন নামে থাকবে কিন্তু কার্যত এই আইনের ব্যবহার হবে না। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, বৈষম্যবিরোধী আইনেরও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে।

প্রথম আলো: আপনি ব্যক্তিগতভাবে আইনটির কতটুকু সীমাবদ্ধতা দেখেন। সেগুলোর উত্তরণে এখন কী করার আছে।

মিজানুর রহমান: খসড়া আইনটি সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি, এতে আমার মনে হয় আইনের প্রধান সীমাবদ্ধতা দুটি:
১. ‘বৈষম্য’কে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত না করা এবং
২. ভুক্তভোগী স্বয়ং আইনের সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টিকারী বৈষম্য দেখভাল কমিটির ভূমিকা। এই দুটি সীমাবদ্ধতাই এই আইনকে অকার্যকর করার জন্য যথেষ্ট। আমি মনে করি, বৈষম্য নির্মূল করার লক্ষ্যে ও মানবাধিকার রক্ষার্থে সরকার যে মহৎ উদ্দেশ্যে বৈষম্যবিরোধী আইনটি গ্রহণ করতে চাইছে, সেই আইনের সুফল পেতে হলে উল্লেখিত ত্রুটিগুলো নির্মূল করা একান্ত প্রয়োজন। আমি আশা করি, সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে এবং প্রকৃত অর্থে বৈষম্যবিরোধী দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীবান্ধব যুগান্তকারী এই আইন প্রণয়নের ফলে আপামর জনসাধারণের আশীর্বাদপুষ্ট হবেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন