বড় হচ্ছে ভ্যাটমুক্ত পণ্যের তালিকা

নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইনে বড় পরিবর্তন আসছে। ভ্যাট অব্যাহতির পণ্য ও সেবার তালিকা আরও বড় হচ্ছে। ভোজ্যতেল, জীবন রক্ষাকারী ওষুধসহ বেশ কিছু পণ্য এই তালিকায় ঢুকছে। নতুন আইনে মাত্র ১৭০টি পণ্য ও সেবায় সম্পূরক শুল্ক থাকার কথা। সেটিও থাকছে না। দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় বর্তমানে যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ পণ্য ও সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক আরোপ আছে, সেটিই বহাল রাখা হচ্ছে।
‘নতুন ভ্যাট আইন: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন আইনের এসব পরিবর্তনের দিকগুলো জানান। প্রথম আলো ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যৌথভাবে এই গোলটেবিলের আয়োজন করে। ভ্যাটমুক্ত সীমা এবং টার্নওভার করের পরিধি বৃদ্ধির ইঙ্গিতও দেন তিনি। এ ছাড়া খেলাপি ভ্যাট আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে আদায় করার ধারাটিও বাতিল হচ্ছে বলে এ সময় জানানো হয়।
আগামী ১ জুলাই নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হবে। আইনে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ। ২০১২ সালে আইনটি করা হলেও ভ্যাট হার কমানো, ভ্যাটমুক্ত সীমা, টার্নওভার করের পরিধি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এসব সমস্যা সমাধানে এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির সুপারিশগুলো রাখা হবে কি না, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্যও আসেনি। অবশ্য কয়েক দিন আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একটি স্বস্তিদায়ক ভ্যাট হার নির্ধারণের কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তবে ১ শতাংশ ভ্যাট কমালে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব কমবে বলে এনবিআর নীতিনির্ধারকদের জানিয়ে দিয়েছেন। এমন অবস্থায় ভ্যাট হারটি অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতির পণ্য ও সেবার তালিকাটি আরও বড় করা হতে পারে। নতুন আইনে মৌলিক খাদ্যপণ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষা, কৃষি, মৎস্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের ১ হাজার ৮৭৪টি পণ্য ও সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি আছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আরও ৭০টি পণ্য ও সেবা এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভোজ্যতেল, হার্টের রোগীর রিং, দেশি সফটওয়্যার, ডায়ালাইসিসের কৃত্রিম কিডনি ইত্যাদি। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন অর্থমন্ত্রী।
এ রকম এক পরিস্থিতিতে কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে প্রথম আলোর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গতকালের গোলটেবিল বৈঠকে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়। এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয় এনবিআরের পক্ষ থেকে। এনবিআরের সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, অর্থমন্ত্রী আগামী ১ জুলাই যে বাজেট দেবেন, ব্যবসায়ীদের যেসব সমস্যার কথা বলছেন, এর সুরাহা হয়ে যাবে।
বৈঠকে হালকা প্রকৌশলশিল্প, পুনরুৎপাদন শিল্প, কুটিরশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে নতুন আইনে ভ্যাটমুক্ত সীমার বাইরে কিংবা টার্নওভার করের আওতায় ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। জাহাঙ্গীর হোসেন আশ্বাস দেন, এ ক্ষেত্রে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য ইতিবাচক সুরাহা হবে।
অগ্রিম ব্যবসায় ভ্যাট (এটিভি) এবং ১ জুলাইয়ে মজুত থাকা পণ্যের হিসাব নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর হোসেন উত্তর দেন, অবিক্রীত মজুত নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকবে না। তবে এটিভি নতুন আইনের দর্শনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। আশা করি, আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এ ধরনের এটিভি থাকবে না। তিনি বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে খেলাপি ভ্যাট আদায়ের যে বিধান আছে, তা বাতিল করা হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর হোসেন আরও বলেন, নতুন ভ্যাট আইনের কারণে কোনো পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে না। ব্যবসায়ীরা যথাযথ হিসাব রেখে রেয়াত নিতে পারলে পণ্য ও সেবার দাম বরং কমতে পারে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছু দুষ্ট লোক আছেন, যাঁরা ভ্যাটকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে দাম বাড়াতে পারেন। সেদিকে নজর রাখতে হবে। তাঁর মতে, ভ্যাটের কারণে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির দাম বাড়বে না। জাহাঙ্গীর হোসেন আরও বলেন, নতুন আইনে একক ভ্যাট হার থাকবে। সেটা মাথায় রেখেই যেন ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করার আহ্বান জানান।
গোলটেবিল বৈঠকে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, গবেষকেরা অংশ নেন। এতে সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
বৈঠকে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ভ্যাটের চাপ পড়বে ভোক্তাদের ওপর, তাই এটি নিয়ে ভোক্তাদের শঙ্কিত হওয়ার কথা। তিনি জানতে চান, খোলা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আরোপ না হলেও এসব পণ্য মোড়কজাত করা হলে ভ্যাট বসবে কি না; বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে কি না।
বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে উচ্চ শুল্কের বিষয়ে গোলাম রহমান বলেন, দেশীয় শিল্প রক্ষার নামে অনেক খাতকে উচ্চ সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পণ্যের দাম বেশি পড়ছে, ভোক্তার গলা কাটা যাচ্ছে। সরকারি চিনিশিল্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশি চিনির ওপর উচ্চ কর বসিয়ে সরকারি চিনিকলগুলো রক্ষার কোনো মানে নেই। বরং সেগুলো বন্ধ করে অন্য কারখানা করা উচিত। বেসরকারি খাতেও এমন শিল্প আছে।
এফবিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, নতুন ভ্যাট আইনে বড়দের কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের, যাদের আওতায় মোট ব্যবসার ২৫ শতাংশ। তিনি বলেন, ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এনবিআরের উদ্দেশ্যও হয়তো সেটা নয়। কিন্তু দেশজুড়ে নতুন আইন নিয়ে ভয়ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ভ্যাট হার নিয়ে নয়; ব্যবসায়ীদের আলোচনা করা উচিত ব্যবসায় সহজে নিবন্ধন, রিটার্ন জমা, হয়রানি না হওয়া ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। এর বাইরে তাঁদের বক্তব্য থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ভ্যাটের অনেক বৈঠকে আমি অংশ নিয়েছি। ওই সব বৈঠকে হার নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। হঠাৎ করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ১ শতাংশ ভ্যাট কমালে ১ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হবে। এই অর্থ কোথায় যাবে?’ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, ‘পণ্যের দাম কমাবেন? মনে হয় না।’
আহসান এইচ মনসুরের মতে, কোনো দেশই সংরক্ষণব্যবস্থা দিয়ে বড় হতে পারেনি। তিনি এ ক্ষেত্রে এনবিআরের সমালোচনা করে বলেন, যেখান থেকে রাজস্ব আসবে, সেখানেই সম্পূরক শুল্ক বসানো ঠিক নয়। নতুন ভ্যাট আইনটি ভালো। এতে ব্যবসায়ীরাই সুবিধা পাবেন।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে অনেক কম। এর একটা বড় কারণ দেশে ব্যবসার খরচ বেশি। নতুন আইন যাতে ব্যবসার খরচ না বাড়ায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন ৩৩ হাজার কর দেবে—এই প্রশ্ন তুলে এনবিআরের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘এটা আপনাদের ব্যর্থতা।’ তিনি অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও ব্যবসায় অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি) আদায় বন্ধ করার তাগিদ দিয়ে বলেন, যে আয় ও ব্যবসা এখনো হয়নি, তার ওপর কর আদায় করা উচিত নয়।
দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি হুমায়ূন কবির বলেন, নতুন আইনটি ভালো, সাধুবাদ জানানোর মতো। তবে একটি ভালো আইন বাস্তবায়ন ঠিকভাবে না হলে তা মন্দ আইনে পরিণত হয়। ভ্যাটের কারণে যদি পণ্যের দাম বাড়ে, তাহলে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। এতে ব্যবসায় ক্ষতি হবে, পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, উৎপাদন খাতের ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে আছেন। ভ্যাটের জটিল হিসাব অনেকেই বোঝেন না।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক উপদেষ্টা মঞ্জুর আহমেদ বলেন, নতুন আইন নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে তিন ধাপে আলোচনা হয়েছে। সেখানে অনেক বিষয়ে এনবিআর ও এফবিসিসিআই একমত হয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করলেই হয়। ভ্যাট আইনের কারণে পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় স্তরে স্তরে ১৫ শতাংশ মূসকের কারণে দাম বাড়বে। রেয়াত ব্যবসায়ী নেবেন, কিন্তু তিন স্তরের পুরো ভ্যাট শেষ পর্যন্ত ক্রেতার ঘাড়ে গিয়েই চাপবে।
সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ভ্যাট হার আশপাশের দেশের তুলনায় বেশি। এটি ১২ শতাংশ হওয়া উচিত।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, রডের দাম বাড়লে ফ্ল্যাটের দামও বাড়বে। ফলে যাঁরা দু-একটি ফ্ল্যাট কিনতেন, তাঁরাও কিনবেন না। বরং টাকা বিদেশে চলে যাবে।
বাংলাদেশ ইনডেন্টিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি কে এম এইচ শহীদুল হক বলেন, ‘কোনো পণ্যের দাম না বাড়ানোর কথায় আমরা আশ্বস্ত হলাম। তবে বাস্তবে মনে হচ্ছে সেটা হবে না। দাম বাড়বে।’ তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গঠিত গবেষণা সংস্থা বিল্ডের হিসাবে বছরে ১২ বিলিয়ন ডলারের আন্ডার ইনভয়েসিং (আমদানিতে মূল্য কম দেখানো) করা হচ্ছে। এর ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক আদায় হলে ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় হতো। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাট নিয়ে চিন্তা করতে হতো না।
ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মুহম্মদ জাকির হোসেন বৈঠকের শুরুতে কয়েকটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করেন।