default-image

সৌদি আরবে গত ১৪ আগস্ট মারা যায় কুমিল্লার নদী আক্তার। নদীর পরিবারকে জানানো হয়েছিল নদী আত্মহত্যা করেছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সৌদি কর্তৃপক্ষ সেখানেই তার দাফন করতে চেয়েছিল। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নদীর মৃতদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। গত শনিবার ঢাকায় দাফন হয়েছে নদীর। সৌদি আরবে যাওয়ার ১৮ মাসের মাথায় নদী মারা গেছে।
নদীর জন্মনিবন্ধন সনদ বলছে, তাঁর জন্ম ২০০৭ সালের ১ ডিসেম্বর। সরকারি নীতিমালা বলছে, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যাওয়ার ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর। সে হিসাবে নদীর বিদেশ যাওয়ার কথা নয়।
টেলিফোনে নদীর বাবা দুলাল শেখের সহজ স্বীকারোক্তি, ‘দালাল বলছিল, নদীর বয়স ২৭, সেভাবেই তার কাগজপত্র বানানো হইছিল। বিদেশ থেইক্যা নদী পাঁচ মাস ২২ হাজার করে টাকাও পাঠাইছে। তারপর আর টাকা পাঠায় নাই। ও আত্মহত্যা করে নাই, ওরে মাইরা ফেলছে।’
নদীর লাশ দাফনের পর তার মা বিউটি আক্তারের অভিযোগ, নদীর শরীরে বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন থাকলেও গলায় ফাঁস দেওয়ার চিহ্ন বা আত্মহত্যা করেছে, সে ধরনের কোনো আলামত তিনি দেখতে পাননি।
সৌদি আরবের জেদ্দার কাউন্সেলর (শ্রম), বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের অফিস থেকে গত ২৬ আগস্ট পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মদিনায় আত্মহত্যা করেছে নদী আক্তার।

বিজ্ঞাপন
default-image

১৪ বছরের উম্মে কুলসুমও এখন সব আলোচনার ঊর্ধ্বে। পাসপোর্টে কুলসুমের বয়স ২৬ বছর। কিশোরী নয়, প্রাপ্তবয়স্ক নারী হিসেবেই সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছিল। মালিকের পৈশাচিক আচরণ, নির্যাতন ও মারধরের শিকার হয়ে ওই দেশের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। গত ১২ সেপ্টেম্বর কফিনবন্দী হয়ে সে ফিরে আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামে। ১০ আগস্ট কুলসুম মারা গেছে বলে পরিবার খবর পেয়েছিল।
শহিদুল ইসলাম ও নাসিমা বেগমের মেয়ে কুলসুম। সৌদি আরবে যাওয়ার আগে কুলসুম নূরপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ২০১৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয় কুলসুম। সনদ বলছে, ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর জন্ম কুলসুমের। অথচ পাসপোর্ট এবং নতুন জন্মসনদে তার জন্মতারিখ ১৯৯৩ সালের ১৩ মার্চ।


কুলসুম মারা যাওয়ার পর তার পরিবার তৎপর হয়েছিল। দালাল ও নিয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে থানায় অভিযোগ করে। লাশ দেশে আনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) বরাবর লিখিত আবেদনও করে কুলসুমের পরিবার। নদীর পরিবারও নদীর মারা যাওয়ার খবর পাওয়ার পর লাশ দেশে আনা বা একবার শুধু মেয়ের মুখ দেখতে চায়—এ কথা বলে বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করে অবশেষে লাশ দেশে আনতে পারে।
অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন—এমন কয়েকজন বলছেন, নদী বা কুলসুমের মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি তাদের পরিবারও দায়ী। আর কেউ না জানলেও নদী বা কুলসুমের মা-বাবা তো মেয়ের বয়স কত, তা জানতেন। লোভে পড়ে বা সংসার চালানোর জন্য মেয়েকে অজানা দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বললেন, প্রথমত, মেয়ের বয়স কত, তা আর কেউ না জানলেও পরিবার জানে। ১৩ বা ১৪ বছরের মেয়েকে ২৫ বছর বা আরও বেশি বয়স দেখিয়ে বিদেশ পাঠানোর দায় মা–বাবা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। বিদেশ গিয়ে যখন নির্যাতন বা বিভিন্ন কারণে মারা যাচ্ছে, তখন মা–বাবা মেয়ের লাশ দেখার জন্য কান্নাকাটি করছেন। এরপর কথা হলো পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধনে বয়স কারা বাড়াচ্ছ? কীভাবে করছে? সেই পাসপোর্ট নিয়ে মেয়েটা সবার চোখের সামনে দিয়ে আবার বিদেশও চলে যাচ্ছে। সৌদি আরব বা অন্যান্য দেশে পৌঁছানোর পর তারাও কি কিছু দেখছে না বা বুঝতে পারছে না? বয়স গোপন করে বিদেশ যাওয়ার ঘটনা একেবারে কম ঘটছে না। তাই ভুল করে হচ্ছে, তা তো বলার উপায় নেই।

দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন এজেন্সি প্রথমেই মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পাসপোর্ট বানানোসহ প্রায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরে বিএমইটি, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন স্তর পার হচ্ছে। ইমিগ্রেশনসহ প্রতিটি স্তরেই কিশোরীর বিদেশে যাওয়া আটকে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কিছুই করা হচ্ছে না।
নমিতা হালদার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অবৈতনিক সদস্য


কুলসুম সৌদি আরবে যে বাড়িতে কাজ করত, সেই বাড়ির নিয়োগকর্তা ও তাঁর ছেলে কুলসুমকে মেরে দুই হাত-পা ও কোমর ভেঙে দিয়েছিলেন। কুলসুমের একটি চোখও নষ্ট করে দিয়েছিলেন। তারপর ওই অবস্থায় রাস্তায় ফেলে গেলে সৌদি পুলিশ সেখান থেকে কুলসুমকে উদ্ধার করে। হাসপাতালে নিয়ে যায়। অন্যদিকে, নদীর ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সেটুকু জানতেই পারেনি তার পরিবার।
নদীর মা বিউটি আক্তার টেলিফোনে জানালেন, তিনি নিজেও সৌদি আরবে আড়াই বছর কাজ করেছেন। ছুটিতে দেশে এসে তখন আর ফিরে যাননি। পরে দালালের মাধ্যমে মা ও মেয়ে একসঙ্গে সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিউটি আক্তারকে সৌদি কর্তৃপক্ষ দেশটিতে ঢুকতে দেয়নি। দুদিন আটকে রেখে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। নদী একাই কাজের জন্য থেকে গিয়েছিল দেশটিতে।
বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চার বছরে বিভিন্ন দেশ কাজ করতে যাওয়া ৪১০ জন নারী লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই মারা গেছেন ১৫৩ জন। ৪১০ জনের মধ্যে ৬৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। শুধু সৌদি আরবেই আত্মহত্যা করেছেন ৩৯ জন। তবে তাঁদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী কত জন ছিল, সে তথ্য আলাদা করে নেই। কেননা, কাগজে-কলমে তো তারা প্রাপ্তবয়স্ক।

বিজ্ঞাপন

২০০৮ সালে লেবাননে গিয়ে ১ মাস ১১ দিনের মাথায় মারা গিয়েছিল আনোয়ারা আক্তার। রাজধানীর পল্লবী থেকে আনোয়ারার মা খায়রুন নেছা বললেন, মেয়ের বয়স ছিল ১৬ বছর। পাসপোর্টে বেশি দেখানো হয়েছিল। মেয়ে মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে চার বছরের মাথায় ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
১৮ বছর ধরে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন বাংলাদেশে নারী শ্রমিক কেন্দ্রের (বিএনএসকে) প্রতিষ্ঠাতা সুমাইয়া ইসলাম। তিনি বলেন, এই মেয়েদের মা-বাবা তো দায় এড়াতে পারেন না। ঝুঁকি আছে জেনেও তাঁরা মেয়েকে দালালের মাধ্যমে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে, অল্প বয়সী মেয়েরা বিদেশে যাচ্ছে কীভাবে? কান টানলে মাথা আসে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত যেকোনো এক জায়গা ধরে তদন্ত করলেই অন্য অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। তারপরও এ ধরনের দুর্নীতি থামছে না। তাই দুর্নীতি বন্ধের পাশাপাশি বিদেশে থাকা নারী শ্রমিকেরা যাতে যেকোনো বিপদে সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে পারে, সে ধরনের সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে হবে।

২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চার বছরে বিভিন্ন দেশ কাজ করতে যাওয়া ৪১০ জন নারী লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই মারা গেছেন ১৫৩ জন। ৪১০ জনের মধ্যে ৬৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। শুধু সৌদি আরবেই আত্মহত্যা করেছেন ৩৯ জন

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অবৈতনিক সদস্য নমিতা হালদার এর আগে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি অভিবাসী নারী শ্রমিক আবিরনের (আবিরন প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন) মৃত্যুর বিষয়টি (গত বছর মৃতদেহ দেশে এসেছে) তদন্ত করেছেন। নমিতা হালদার বলেন, দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন এজেন্সি প্রথমেই মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পাসপোর্ট বানানোসহ প্রায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরে বিএমইটি, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন স্তর পার হচ্ছে। ইমিগ্রেশনসহ প্রতিটি স্তরেই কিশোরীর বিদেশে যাওয়া আটকে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কিছুই করা হচ্ছে না। বিদেশে গিয়ে মারা গেলে তখন বিষয়টি নজরে আসছে।
আবিরনের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের কথা উল্লেখ করলেন নমিতা হালদার। তিনি বললেন, সুপারিশ অনুযায়ী এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আবিরনের ঘটনায় অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিতে হবে।
সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. শামছুল আলম মনে করেন, একটি দুষ্টচক্র এসব কাজ করছে। বয়স বাড়িয়ে দেশের বাইরে চলেও যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবার সচেতনতা প্রয়োজন। এ ধরনের বিষয় নজরে এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মন্তব্য পড়ুন 0