ভর্তির জন্য শিক্ষার্থী 'ধরে' আনতে হবে, না পারলেই মামলা

মিরপুরের আল-নাহিয়ান উচ্চবিদ্যালয়ে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থী ‘ধরে’ আনার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আর ধরে আনতে না পারলে শিক্ষক এবং কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের সন্তান যদি অন্য বিদ্যালয়ে পড়ে, তাদের এ বিদ্যালয়ে ভর্তি করা না হলেও শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এ নিয়ে শিক্ষক এবং অন্য কর্মচারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, শিক্ষকেরা স্কুলে আসেন, আর বসে বসে বেতন নেন। শিক্ষকেরা এতে করে একটু তৎপর হবেন। আর নিজেদের সন্তান এ স্কুলে না পড়লে অন্য অভিভাবকেরা উৎসাহিত হবেন না।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্টের (বাংলাদেশ) অধীনে পরিচালিত হচ্ছে স্কুলটি। শিক্ষার্থী ‘ধরে’ আনার নির্দেশের আরেকটি কারণ হচ্ছে, শিক্ষার্থী ভর্তির টার্গেট পূরণ করতে পারলেই ট্রাস্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন স্কেলে বেতন পাবেন। গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ট্রাস্টের সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ট্রাস্টের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নতুন স্কেলে বেতন পেতে হলে ট্রাস্টের আয় বাড়াতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে আয় বাড়ানোর জন্য আল-নাহিয়ান উচ্চবিদ্যালয়ে বর্তমানে যে পরিমাণ বহিরাগত ছাত্রছাত্রী আছে, তার দ্বিগুণ, অর্থাৎ প্রায় ৪৫০ জন নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে। ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষক-শিক্ষিকাকে কমপক্ষে ১৮ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি করাতে হবে। আর আল-নাহিয়ান শিশু পরিবারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কমপক্ষে পাঁচজন শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে। বহিরাগত শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূরণে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর নিজেদের সন্তানদেরও এ স্কুলে ভর্তি করা না হলে শিক্ষক-শিক্ষিকার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরপুরে ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত শিশু পরিবারের (২০০ জন) এতিম মেয়েশিশুরাও এ বিদ্যালয়ে পড়ছে।
ট্রাস্টের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারীর সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কথা বলা হয়েছে। শিক্ষকেরা বলছেন, শিক্ষকদের কাজ পড়ানো, শিক্ষার্থী ধরে আনা নয়। আর একজন ব্যক্তি তাঁর সন্তানকে কোথায় পড়াবেন, সে সিদ্ধান্ত কেন প্রতিষ্ঠান চাপিয়ে দেবে?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সফরে আসেন। পরে সরকারের সঙ্গে কার্যবিবরণী সইয়ের মাধ্যমে এ ট্রাস্ট গঠন করা হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে।
ট্রাস্টের অধীনে মিরপুরের শিশু পরিবার এবং বিদ্যালয়টি ছাড়াও লালমনিরহাটে আরেকটি শিশু পরিবার (২০০ মেয়ে শিশুর আবাসন) ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। মিরপুরেরটি ১৯৮৭ সালে আর লালমনিরহাটের শিশু পরিবার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। বিদ্যালয়, শিশু পরিবার এবং রাজধানীর বনানীতে ট্রাস্টের অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত মে মাস থেকে বেতন পাচ্ছেন না। ২০১৫ সালের নতুন বেতন স্কেলে গত বছরের জুলাই থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত বেতন দেওয়া হয়েছে, তারপর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০০৯ সালের বেতন স্কেলে বেতন দেওয়া হয়। আপাতত তা-ও বন্ধ। এখন কর্মীরা চলছে ট্রাস্ট থেকে ধার করা টাকায়। প্রায় আট মাস ধরে প্রায় ৮০ জনের বেশি কর্মী এভাবেই চলছেন।
মিরপুরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভালো না থাকলে শিশুরা কেমনে ভালো থাকব? এখন তো নিজেদের পরিবারই চলে না। এ পর্যন্ত দুইবার ঋণ হিসেবে ১৮ হাজার করে টাকা দিছে। পরে পরিশোধ কইরা দিতে বলছে। আবার স্কুলে বাচ্চাও ভর্তি করন লাগব।’
মিরপুরের একজন শিক্ষক বলেন, ‘আগে ট্রাস্ট থেকে ৫০ শতাংশ এবং স্কুলের আয় থেকে ৫০ শতাংশ মিলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়া হতো। বর্তমানে শতভাগ আয় করে নিজেদের বেতন নিতে বলছে কর্তৃপক্ষ। আর সে জন্যই শিক্ষার্থী ভর্তির টার্গেট দিয়ে দিয়েছে।’
ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক কে বি এম ওমর ফারুক চৌধুরী এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষকেরা নিজের বাচ্চাকে অন্য স্কুলে পড়ান। স্কুলকে নিজেদের রেস্ট রুম মনে করে। গতবার একজন শিক্ষক ১০৪ জন ছাত্র ভর্তি করেছেন, একজন পারলে অন্যরা পারবে না কেন? আর বিভাগীয় মামলার কথা বলেছি “ভয় দেখানোর” জন্য।’
ট্রাস্টের ঘাটতি বাজেট: ট্রাস্টের বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘২০১৫ সালের স্কেলের প্রযোজ্য বর্ধিত বেতন-ভাতা দেওয়ার মতো অর্থ নেই’—এ কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। ট্রাস্টের আয় বাড়লে বর্ধিত বেতন-ভাতা দেওয়া হবে। ট্রাস্ট বর্তমানে ঘাটতি বাজেটে চলছে। এ ছাড়া ট্রাস্টের ২০০৬ সালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরি প্রবিধানমালা অনুযায়ী, বেতন-ভাতা ট্রাস্টি বোর্ড যেভাবে নির্ধারণ করবে, সেভাবেই দেওয়া হবে। তাই পুরোনো বেতন স্কেলে বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
লালমনিরহাট শিশু পরিবার পাঁচ একর জায়গায়, আর মিরপুরের শিশু পরিবার ২ দশমিক ৭০ একর এলাকায় অবস্থিত। ট্রাস্টের অধীনে রাজধানীর বনানীতে ফ্ল্যাট (১২টি) এবং ইউ এ ই মৈত্রী শপিং কমপ্লেক্স আছে। ট্রাস্টের দোকান এবং ফ্ল্যাটের ভাড়া বর্তমান বাজার ও চাহিদা অনুযায়ী অপ্রতুল বলেও ট্রাস্টের বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ করা আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা কখনোই ট্রাস্টের আয় বাড়ানোর বিষয়টিতে নজর দেন না। আর যে পদ্ধতি শিক্ষার্থী ‘ধরে’ এনে আয় বাড়ানোর কথা ভাবছে, তা অবান্তর।
অন্যান্য অভিযোগ: লালমনিরহাটে একসময় কর্মরত শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, সেখানে পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্ধের পর্যায়ে আছে। এখানে বাইরের শিক্ষার্থী নেই, শিশু পরিবারের শিশুরা পড়াশোনা করত। সেখানে কর্মরত শিক্ষকদের ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। এখন সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত হয়তো শিশু পরিবারের শিশুরা পড়ার সুযোগ পাবে। তারপর শিশুদের বাইরের স্কুলে গিয়ে পড়তে হবে। অথচ এতিমখানার ভেতরেই দেড় কোটি টাকা খরচ করে একটি রেস্টহাউস বানানো হচ্ছে। মেয়েশিশুদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এ ধরনের রেস্টহাউস তৈরির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকেরা।
অন্যদিকে মিরপুরে শিশু পরিবারের ক্যাম্পাসের ভেতরেই ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক কে বি এম ওমর ফারুক চৌধুরীর অফিস কক্ষ। এর পাশেই যে কক্ষ, তাতে আগে থাকতেন শিশু পরিবারের হাউস মাদার। নির্বাহী পরিচালক প্রায় সময়ই অফিস করছেন সন্ধ্যার পর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত। মিরপুরের শিশু পরিবারে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েরা থাকে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে রাতের বেলা অফিস এবং বিশ্রামকক্ষ থাকার বিষয়টিতেও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মীরা। কেননা তাঁদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পরে অনেক নারী ও পুরুষ মেহমান আসে এখানে। দুটি শিশু পরিবারে ৪০০ এতিম মেয়েশিশুর আবাসনের ব্যবস্থা আছে। এই মেয়েদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও তার সুব্যবস্থা নেই। বর্তমানে কর্মীদের বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় শিশুদের খাবারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ততটা নজর দিতে পারছেন না বলে কর্মীরাই জানিয়েছেন।
তবে মিরপুরের আল-নাহিয়ান উচ্চবিদ্যালয় এবং শিশু পরিবারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী পরিচালক কে বি এম ওমর ফারুক চৌধুরী তাঁর বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগ সঠিক নয় বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন। তিনি ‘কড়াকড়িভাবে’ প্রশাসন চালাচ্ছেন বলে কর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে এ ধরনের অভিযোগ করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বেতন-ভাতা বন্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ট্রাস্টর আয় ২১ লাখ টাকা, আর কর্মীদের নতুন স্কেলে বেতন দিতে হলে প্রয়োজন ৩১ লাখ টাকা। কর্মীরা পুরোনো স্কেলে বেতন নিতে চাইছেন না। তাই আয় বাড়লেই এ স্কেলে বেতন দেওয়া হবে।
রাতের বেলা অফিস করা প্রসঙ্গে নির্বাহী পরিচালক বললেন, ‘শিশু পরিবারের শিশু খালা, শিশু মায়ের দায়িত্বে অবহেলা আছে। আমি এখানে সন্ধ্যার পর বসলে তাঁরা একটু তৎপর থাকেন। একবার এক ছেলে এক কক্ষের মধ্যে ঢুকে তিন দিন ছিল। থানায় মামলা করতে হয়, পরে মেয়ে ও ছেলেকে বিয়ে দিয়ে পার পেতে হয়।’
আর সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মো. নুরুল কবীর বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। খবর নিয়ে জানাতে পারব।’