বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ফেসবুকে স্বজনদের কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, এটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি নয়। তাঁরা বান্ধবী নন। তাঁরা সম্পর্কে ননদ-ভাবি। আর চারজনের মধ্যে দুজন মারা গেছেন। তারপরও ছবিটি নিয়ে থামেনি নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দান।

ফেসবুক সূত্রে ওই চার নারীর স্বজনদের খুঁজে বের করে জানা গেল তাঁদের পরিচয়। সাদাকালো ছবিতে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসা আয়েশা রহমান, তিনি শামসুদ্দীন আহমেদের মেয়ে। সামনে তাঁর পাশেই বসা শামসুদ্দীন আহমেদের ছেলের বউ রোকেয়া আহমেদ। আর পেছনে অন্য দুজন হলেন শাহানারা আহেমদ ও রাশিদা আহমেদ, তাঁরাও ছেলের বউ। রোকেয়া ও রাশিদা মারা গেছেন। আয়েশা থাকেন লন্ডনে। শাহানারা দেশেই আছেন। রাশিদা আর শাহানারার কোনো স্বজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

default-image

শামসুদ্দীন আহমেদের ছেলে আলাউদ্দীন আহমেদ বিয়ে করেন রোকেয়া আহমেদকে। সাদাকালো ছবিটি তুলেছিলেন আলাউদ্দীন আহমেদ। আর মা ও চাচিদের পরের রঙিন ছবিটি তুলেছিলেন আলাউদ্দীন ও রোকেয়া আহমেদের ছেলে আমিন উদ্দিন আহমেদ। গত শুক্রবার কথা হলো আমিন উদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। রোকেয়া আহমেদ মারা গেছেন গত বছর। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে আমিন উদ্দিনের বাড়িতে খোলা জিপে বসা সেই চার নারীর ছবিসহ সে সময়ের বেশ কয়েকটি সাদাকালো ছবি বাঁধাই করে রাখা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানালেন, বনানীর বাড়িতে আরও অনেক ছবি বাঁধাই করে রাখা আছে। শুধু ছবি নয়, পঞ্চাশ-ষাটের দশকের সেই গাড়িসহ পারিবারিক বেশ কয়েকটি গাড়িও বেশ যত্নের সঙ্গে রেখে দিয়েছেন তাঁরা। এসব তাঁদের কাছে মহামূল্যবান স্মৃতি।

এই পরিবারের সদস্যদেরও ছবি তুলে তা সংরক্ষণের ঝোঁক আছে। তাই তো রোকেয়া আহমেদ গাড়িতে যেভাবে বসে বা হেলান দিয়ে ছবি তুলতেন, সেই একই ভঙ্গিতে আমিন উদ্দিন আহমেদের ছোট নাতনিকে দিয়েও ছবি তোলানো হয়েছে।

মা-চাচিদের ছবি ফেসবুকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তা নিয়ে বিব্রত ব্যবসায়ী আমিন উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই এটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি নয়। পারিবারিক একটি ছবি। প্রথম ছবির মতো করে দ্বিতীয়বার ছবি তুলতে গিয়ে বন্দুক নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়। আমার লাইসেন্স করা বন্দুক একজনের হাতে দিই। আর একজনের হাতে একটি স্টিক ধরিয়ে দিই।’

আমিন উদ্দিনের স্ত্রী রিফাত আহমেদ বললেন, ‘ফেসবুকে ছবিটি নিয়ে ঝড় বইছে তা দেখছি। প্রতিবাদও করছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। কেউ ইচ্ছে করে ছবিটি নিয়ে বিতর্ক করছেন তা নয়, তবে এর পেছনে অশিক্ষা অবশ্যই বড় কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করার আগে কেউ তার সঠিক ইতিহাস জানার চেষ্টা করছে না। আর আমার দাদাশ্বশুর ছিলেন সেই সময়ের ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাঁর পরিবার মুক্তিযুদ্ধের সময় নানাভাবে সহায়তাও করেছে। তবে ছবির এই চারজন বীর মুক্তিযোদ্ধা নন।’

default-image

রিফাত আহমেদ আরও বলেন, ছবিগুলো প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। বাবার আলমারিতে নেগেটিভ খুঁজে পেয়ে ছবিগুলো আবার করিয়েছেন তাঁর স্বামী। তারপর তাঁরই পরিকল্পনায় ‘বিফোর ও আফটার’ ছবির জন্ম।

‘আমার শ্বশুর ব্যবসায়ী ও আমুদে ছিলেন। নিজেদের জাহাজ নিয়েই শিকারে চলে যেতেন সুন্দরবনে। পরিবারের নারী সদস্যরাও সরাসরি শিকার না করলেও অনেক সময় শিকারে সঙ্গে গেছেন। রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ওই ছবিটা আমাদের একটি পারিবারিক ছবি। ভালোবাসার ছবি। এতে কোনো রাজনীতি নেই।’

আমিন উদ্দিন ও রিফাত আহমেদ দম্পতির বড় ছেলে রেনান আহমেদের বিয়ের সময় তাঁদের পরিবারের ইতিহাস তুলে ধরতে দুই পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের ছবিগুলো দিয়ে বাড়ি সাজানো হয়েছিল।

রেনান আহমেদ বলেন, শুধু ছবি নিয়ে বিতর্কই নয়, ফেসবুকে অনেকেই নিজেদের এই চারজনের স্বজন দাবি করছেন তাও সবার ক্ষেত্রে সত্য নয়। পরিবারের পক্ষ থেকে তিনিও চান, আসল সত্যটা সবাই জানুক। যে ক্যামেরা দিয়ে তাঁর দাদির ছবি তোলা হয়েছিল, সেই ক্যামেরাও দেখালেন তিনি।

সাদাকালো ছবির আয়েশা রহমান (স্টিয়ারিংয়ে বসা) সেই ১৯৬৮ সাল থেকেই ছেলেমেয়েদের সঙ্গে লন্ডনে স্থায়ীভাবে থাকেন। এই এপ্রিলে তাঁর বয়স হবে ৮৪ বছর। ডিমেনশিয়ায় এখন আর কোনো কথা মনে রাখতে পারেন না।

আয়েশা রহমানের ৬৭ বছর বয়সী ছেলে শামসুল মুলক ঢাকা ও লন্ডন দুই জায়গাতেই থাকেন। বর্তমানে আছেন লন্ডনে। হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। ছবির প্রসঙ্গে শুরুতেই বললেন, ‘ফেসবুকে মা-মামিদের ছবি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। একজন মেসেঞ্জারে একদিন ছবিটি পাঠায়, তার নিচে লেখা মুক্তিযুদ্ধের ছবি। ছবি দেখে প্রথমেই মুখ দিয়ে বের হয়, আরে, ছবির উনি তো আমার মা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশেই ছিলেন না, ছিলেন ইংল্যান্ডে। ফেক বা ভুয়া নিউজের কথা শুধু শুনতাম, এখন দেখি তা আমার পরিবারের পিছু নিয়েছে।’

default-image

নতুন ছবি প্রসঙ্গে শামসুল মুলক জানালেন, ২০১৫ বা ২০১৭ সালের দিকে তাঁর মা ঢাকায় গেলে আমিন উদ্দিন আহমেদ ছবিটি তোলেন।

তবে ছবিটি আলোচনায় আসায় শামসুল মুলকসহ অন্য স্বজনেরা স্মৃতিতে ডুব দিয়ে চলে যাচ্ছেন সেই ছোটবেলায়। বললেন, বাড়িতে বাঘ-হরিণের চামড়া দেখে বড় হয়েছেন।

শামসুল মুলক হাসতে হাসতে বললেন, সাদাকালো ছবিটি নাকি ঢাকার আহসান মঞ্জিলেও স্থান পেয়েছে বলে শুনেছেন। তবে সেখানে ছবিটি কে দিলেন বা ছবির ব্যাখ্যায় কী লেখা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় হেসে হেসে এভাবে পোজ দিয়ে কেউ ছবি তুলেছে কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন