বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভাওয়াল পরগনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পুরোনো গৌরব আজ আর নেই। একসময় যে ঘন শালবন ছিল, তা এখন ‘অপরিকল্পিত’ শিল্পায়ন এবং বসতি স্থাপনের কারণে অনেকটাই বিলীন।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, গাজীপুর জেলায় প্রায় ২৫ লাখ লোকের বাস। তবে এখন তা অনেক বেড়েছে। দুটি পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়ন একত্র করে গঠন করা হয়েছে সিটি করপোরেশন। এর আয়তন ৩৩০ বর্গকিলোমিটারের মতো। ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে বৃহত্তম এই সিটি করপোরেশনের বয়স প্রায় আট বছর। সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড এখনো গ্রামীণ আবহে রয়ে গেছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৮ সালে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগপর্যন্ত শহরের কোথাও একটি ভালো রাস্তা, পানিনিষ্কাশনের নালা বা ড্রেন, ফুটপাত পাননি। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কাজ চলছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৭৩০ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

অপরিকল্পিত শিল্পায়নের শহর

নির্বিচার বন উজাড়, ‘অপরিকল্পিত’ শিল্পায়ন ও প্রভাবশালীদের দখলে নগরসহ পাঁচটি উপজেলা হারাতে বসেছে ‘সবুজ-শ্যামল’ উপাধি। বন বিভাগের এক সমীক্ষা বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে গাজীপুরে মোট ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ বন কমেছে। বন বিভাগের প্রাক্কলন, পরের চার বছরে বন কমে যাওয়ার হার অন্তত ৫-৬ শতাংশ।

রাজধানীর আবদুল্লাহপুর পার হলেই টঙ্গী শিল্পাঞ্চল শুরু, যা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মধ্যে পড়েছে। সেখানেই রয়েছে টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)। এর লাগোয়া দেশের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান বাটার জুতার কারখানা। একটু সামনেই টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় ১৯৬৪ সালে গড়ে তোলা হয় ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প নগরী (বিসিক)। সেখানে বর্তমানে উৎপাদনরত ১৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৬টি হলো বস্ত্র ও এ খাতসংশ্লিষ্ট কারখানা। আর এই সব কটিই শতভাগ রপ্তানিমুখী। তখন এর উদ্দেশ্য ছিল ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য পরিকল্পিত শিল্পকারখানা তৈরির সুযোগ করে দেওয়া। রাজধানীর কাছে হওয়ায় এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহনের সব সুবিধা থাকায় বিসিকের বাইরে দিন দিন শিল্পকারখানার সংখ্যা বাড়তে থাকে।

শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে সব মিলিয়ে সাড়ে চার হাজার কারখানা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিসিকের বাইরের বেশির ভাগ কারখানা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। অনেক কারখানা নানাভাবে বায়ুদূষণ করছে। বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি ব্যবহার না করায় দূষিত হচ্ছে নদী-নালা ও খাল-বিল। কমে গেছে আবাদি জমি।

দিন দিন ঘিঞ্জি শহরে পরিণত হচ্ছে গাজীপুর। হু হু করে গড়ে উঠেছে অট্টালিকা। সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর-পরিকল্পনাবিদ ময়নুল ইসলাম জানান, গাজীপুর নগরে বাসাবাড়ি বা আবাসিক হোল্ডিং রয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ১৬০টি। আর বাণিজ্যিক হোল্ডিং রয়েছে ১০ হাজার ৩৫৩টি।

গাজীপুর চেম্বার অ্যান্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ার পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাজীপুরে একটি শিল্পাঞ্চল করা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে শিল্পাঞ্চল করতে হবে।’

ভাওয়াল এস্টেটের জমি বেদখল

১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর ভাওয়াল রাজার মালিকানা থেকে অন্যান্য জমি চলে গেলেও রয়ে যায় ১৪০ দশমিক ৪৬ একর জমি। এ জমির মধ্যে ঢাকা জেলায় রয়েছে ২ দশমিক ৩০ একর ও গাজীপুরে রয়েছে ১৩৮ দশমিক ১৬ একর। ভাওয়াল রাজার কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় জমির দেখভালের দায়িত্ব পায় ভূমি সংস্কার বোর্ড। তারা ভাওয়াল এস্টেট গঠন করে ওই জমি দীর্ঘদিন ধরে দেখভালসহ ভূমি ব্যবস্থাপনা করে আসছে।

ভাওয়াল এস্টেটের অফিসের তথ্যানুযায়ী, এই জমি থেকে রাজস্ব আয় হয় বছরে কোটি টাকার ওপরে। এখানে ইজারা দেওয়া জমি রয়েছে ৬০ দশমিক ০৯ একর। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে অনুদান এবং বিক্রি হওয়া জমির পরিমাণ ৪১ দশমিক ৮৬ একর। ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসন ভাওয়াল এস্টেটের ১১ দশমিক ৫৩ একর জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত করেছে (খাসজমিতে পরিণত করা)। এর বাইরে দখল হওয়া জমির পরিমাণ ২৩ দশমিক ৯০ একর।

শহরবাসীর দুঃখ রেলক্রসিং

‘অপরিকল্পিত’ শহর গাজীপুরের বড় দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে জয়দেবপুর জংশনের পাশে থাকা রেলক্রসিংটি। এর দুই পাশেই রয়েছে সরকারি-বেসরকারি অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। এসব কার্যালয়ে জেলার কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে যান।

জেলা শহরের ওই রেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন ২৪ জোড়া আন্তনগর ও ১৬ জোড়া মেইল ট্রেন চলাচল করে। একেকটি ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় কমপক্ষে ১০ মিনিট করে থেমে থাকতে হয় শহরবাসীকে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। শহরের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সড়কটি। নগরের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার আর কোনো বিকল্প সড়ক নেই।

যেখানে খুশি ময়লা ফেলা

সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, টঙ্গী ও গাজীপুরে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এসব বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। তাই যেখানে খুশি, সেখানে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে কিছুদূর পরপর ময়লা-আবর্জনা চোখে পড়ে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক এস এম সোহরাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ময়লা ফেলার জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জায়গা না থাকা, প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব, গাড়িসহ অন্যান্য সংকটের কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধান হচ্ছে না।

সরকারি-বেসরকারি পর্যটন

গাজীপুরকে বলা হয় ‘রিসোর্টের রাজধানী’। এখানে বড় শিল্পমালিক ও উদ্যোক্তারা ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় গড়ে তুলেছেন শতাধিক পর্যটনকেন্দ্র বা রিসোর্ট। কেউ বাণিজ্যিকভাবে, কেউ শখের বসে এসব রিসোর্ট গড়ে তুলেছেন। রাজধানীর কাছে হওয়ায় মানুষের কাছেও রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। রিসোর্টগুলোতে প্রতিদিন বিভিন্ন নাটক-সিনেমার শুটিং চলে। গাজীপুরে আছে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত নুহাশপল্লী। আছে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক।

মহাসড়কে যানজটের ভোগান্তি

আবদুল্লাহপুর থেকে চান্দনা চৌরাস্তা ১২ কিলোমিটার। এ পথে চলাচলকারী এমন কেউ নেই, যে যানজটে আটকা পড়ে দুর্ভোগ পোহায়নি। এ পথের দূরত্ব কম হলেও এর ভোগান্তি অনেক বেশি, অভিজ্ঞতা তিক্ত। ১২ কিলোমিটার পথের জন্য নানা উদ্যোগ নিয়ে সফল হতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সবশেষে সময় বাঁচানোর জন্য শুরু করা হয় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। সেই সময় বাঁচানোর প্রকল্পই এখন চলাচলকারীদের পুরো সময় খেয়ে নিচ্ছে। প্রকল্পটি ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ করে বাস বিআরটিতে নামানোর কথা ছিল। কাজ শেষ হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ এ পথের যানজট থেকে মুক্তি মিলবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অনন্য স্থাপনা

দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গাজীপুরেই অবস্থিত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২ হাজার ২৪৯টি কলেজ রয়েছে। আছে সর্বস্তরের শিক্ষাকে দূরশিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গঠিত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। আছে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), আইইউবিটি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

টাঁকশাল নামে পরিচিত ‘দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লি.’ গাজীপুরে অবস্থিত। এখানে টাঁকশালের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। জেলায় রয়েছে দেশের একমাত্র সমরাস্ত্র কারখানা। কৃষির উন্নয়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি ও ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ল্যান্ডিং স্টেশনও গাজীপুরে। এখানে রয়েছে দেশের প্রথম তালিবাবাদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র। তবে সাবমেরিন কেব্‌ল সংযুক্ত হওয়ার পর এ কেন্দ্রের কার্যক্রম সীমিত রয়েছে।

এত এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যে শহরের, সে শহরে জেলা প্রশাসনের নিজস্ব ভবন নেই। প্রায় ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও জেলা প্রশাসনের নিজস্ব কোনো ভবন হয়নি। ভাওয়াল রাজার বাড়িতেই বর্তমানে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কাজ চলছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসনের নিজস্ব ভবনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে কাজও শুরু হবে। তবে নতুন ভবন তৈরি হতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগবে।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিনোদনের ব্যবস্থার অভাব

দেশের প্রায় সব জেলায় শিল্পকলা একাডেমির নিজস্ব ভবন থাকলেও গাজীপুরে তা নেই। শিল্পকলা একাডেমি চলছে রাজবাড়ির চিলেকোঠার অপরিসর ঘরে। গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও আদালত ভবনের কার্যক্রম চলছে গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়িতে। ১৫ একর আয়তনবিশিষ্ট সেই বাড়িতে অন্যান্য সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ঠাঁই হলেও শিল্পকলা একাডেমির জন্য বরাদ্দ হয়েছে চিলেকোঠার অপরিসর কয়েকটি ছোট কক্ষ।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে কালের সাক্ষী হয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ি। এর সামনে রয়েছে বিশাল একটি মাঠ। শহরের আশপাশে বড় কোনো খেলার মাঠ নেই। রাজবাড়ি মাঠটিই শহর ও আশপাশের বাসিন্দাদের খেলাধুলার একমাত্র জায়গা। কিন্তু বছরের বেশির ভাগ সময় এ মাঠে চলে সভা-সমাবেশ। আয়োজন করা হয় বিভিন্ন মেলার। ফলে খেলার সুযোগ থাকে না।

শহীদ বরকত স্টেডিয়াম রয়েছে। কিন্তু খেলাধুলার উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজন নেই। একসময় জেলায় ১৫টি প্রেক্ষাগৃহ বা সিনেমা হল থাকলেও এখন প্রায় সব কটি বন্ধ হয়ে গেছে।

গাজীপুর ভাষাশহীদ কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানো উচিত। তাই জেলায় শিল্পকলা একাডেমিসহ আরও খেলার মাঠ প্রয়োজন।

গাজীপুর ব্যতিক্রম নয়

সব মিলিয়ে শিল্পের শহর হিসেবে গাজীপুরে আর্থিক সমৃদ্ধি এসেছে, কিন্তু বাসযোগ্য নগর গড়ে ওঠেনি। দেশের অন্য শিল্পঘন এলাকাগুলোর যে অবস্থা, গাজীপুরও তার ব্যতিক্রম নয়।

অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, গাজীপুর একসময় বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। গত দুই দশকে ক্রমাগত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বাকিটুকু রক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন