ফুলকলি একটি হাতির নাম। সেটা ১৯৬২ সালের কথা। তখন খাগড়াছড়ি ছিল একটি মহকুমা শহর। ঘন জঙ্গলে ভরা খাগড়াছড়ির যোগাযোগব্যবস্থা ছিল বেশ নাজুক। শহর থেকে দূরের পাহাড়ি পথে যাতায়াতের সুবিধার জন্য একটি পোষা হাতি এনেছিলেন সে সময়ের মহকুমা প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম। তিনি হাতির পিঠে চড়ে যাতায়াত করতেন। হাতিটির নাম রাখা হয় ফুলকলি। মহকুমা প্রশাসকের একমাত্র বাহন এই ফুলকলি সবখানে পরিচিতি পেয়ে যায়। দূর গ্রামের কোথাও গেলে মানুষজন ফুলকলিকে আদর করে, পেটভরে খেতে দিত। ফুলকলিরও বিশেষ টান ছিল মানুষের প্রতি। খাগড়াছড়ির জনমানুষের সঙ্গে ফুলকলির এক আত্মিক বন্ধন গড়ে ওঠে।

১৯৮৩ সাল। খাগড়াছড়ি মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয়। তখনো জেলা প্রশাসকেরা ফুলকলির পিঠে চড়ে দাপ্তরিক কাজ সামলাতেন। জেলা ঘোষণার পর খাগড়াছড়িতে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ধীরে ধীরে উন্নত হতে শুরু করে যোগাযোগব্যবস্থা। এল নতুন যানবাহন। এরপর খানিকটা অবসর পায় ফুলকলি। তখন ফুলকলির কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোতে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত প্যারেডে অংশ নেওয়া। ফুলকলি অভিবাদন জানাত সবাইকে।

সত্তর–আশির দশকে পাহাড়ি পথে কোনো যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে খাদে পড়ে গেলে তা টেনে তোলার একমাত্র সহায় ছিল ফুলকলি। ১৯৫০ সালে জন্ম ফুলকলির মাহুত ছিলেন আবদুর রশিদ ও চিন্তাহরণ। ফুলকলির প্রতিবেলার খাবার ছিল এক ছড়ি (৪০-৫০টা) পাকা কলা, ৫টি পাকা কাঁঠাল, ৫ কেজি ছোলা ও ৫ কেজি গম। এ ছাড়া ফুলকলির খাবার ছিল প্রতি তিন দিনে এক গাড়ি কলাগাছ। খাগড়াছড়ির তৎকালীন জেলা প্রশাসক খোরশেদ আনসারের লেখা আলুটিলা কথা বলে বইতে ফুলকলির বিবরণ পাওয়া যায়।

হাতির মাহুত আবদুর রশিদের ছেলে মোহাম্মদ হেলাল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আব্বা ও চিন্তাহরণ কাকা মিলে পালাক্রমে ফুলকলির দেখাশোনা করতেন। বাবা ফুলকলিকে মনে করতেন পরিবারের একজন সদস্য। ফুলকলির সঙ্গে আছে আমাদের পরিবারের অনেক স্মৃতি। ফুলকলি ছিল খুব লক্ষ্মী এবং মনিবের প্রতি আজ্ঞাবহ। ফুলকলি যখন মারা যায়, তখন আমার বয়স ছিল ১২ বছর। ফুলকলি মারা যাওয়ার পর বিশেষ করে আব্বা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। ফুলকলি মৃত্যুর দুই বছর পর আব্বাও মারা যান।’

ফুলকলির মৃত্যুর কাহিনি বড় করুণ। একদিন পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় বুনো হাতিরা ফুলকলিকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। ফুলকলি যায়নি। তখন সব বুনো হাতি মিলে তাকে আক্রমণ করে। ফুলকলির বাম পায়ের পাতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফুলকলির চিকিৎসার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয় চিকিত্সক। সেই সময় ফুলকলির সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতেন ওই সময়ের কম্পাউন্ডার শশী বিন্দু চাকমা। তিনি এখন অবসরপ্রাপ্ত। শশী বলেন, প্রায় আড়াই মাস চিকিত্সা শেষে ১৯৯০ সালের ২৭ জুলাই এক ঝুমবৃষ্টির দিনে পুনরায় আলুটিলা পাহাড়ে যায় ফুলকলি। একটা সময় বেখেয়ালে পাহাড়ের খাদে পড়ে যায়। তাতে তার মৃত্যু হয়। পরে ক্রেন দিয়ে ফুলকলিকে তুলে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তৎকালীন ইউএনও আজিজুল হক।

একসময় ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়েছিল ফুলকলির কবর। সংরক্ষণের অভাবে ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে। ফুলকলির স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে বর্তমান জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস ফুলকলির কবরটি আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। প্রতিদিন দূর–দূরান্ত থেকে ফুলকলিকে দেখতে আসছেন লোকজন।

বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা আশাপ্রিয় চাকমা (৪৫) বলেন, ‘আহত হওয়ার পর আমি দেখতে যেতাম। যেদিন ফুলকলি মারা যায়, সেদিন স্কুল থেকে বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে দেখতে গিয়েছিলাম মৃত ফুলকলিকে। ফুলকলির শূন্যতা অনেক দিন অনুভব করেছি। ফুলকলি খাগড়াছড়িবাসীর আবেগ এবং ভালোবাসার নাম।’

স্বজনদের নিয়ে ফুলকলির সমাধি দেখতে এসে শিক্ষিকা বিজয়া খীসা বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখতাম, বাড়ির পাশ দিয়ে মাহুত ফুলকলিকে চেঙ্গী নদী পার করে ওপাড়ের আলুটিলা পাহাড়ে নিয়ে যেতেন। গ্রামের মানুষ তাকে খুব ভালোবাসত।’

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি ঘুরতে এসেছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আজিজুল হক বলেন, ‘ফুলকলির সমাধি দেখে এবং কাহিনি শুনে আমি মুগ্ধ। একটি হাতির প্রতি মানুষের এমন ভালোবাসা হতে পারে, তা ভাবতেই অবাক লাগছে।’

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘ফুলকলির প্রতি মনিবের ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করতাম। খাগড়াছড়ির সাধারণ মানুষও ফুলকলিকে নিয়ে নানা কাহিনি শোনাতেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে হাতির অভিন্ন একটি সম্পর্ক রয়েছে। তৎকালীন জেলা প্রশাসনের হাতি ফুলকলির স্মৃতি ধরে রাখতে সমাধিসৌধকে নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে। এই সমাধিসৌধ দেখে বর্তমান প্রজন্ম ফুলকলিকে স্মরণ করবে। পাশাপাশি জানতে পারবে তৎকালীন খাগড়াছড়ির ইতিহাস ঐতিহ্য।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন