সংস্কার করার পর বর্ধমান হাউসের বর্তমান রূপ। ১৯৫৫ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা একাডেমি।
সংস্কার করার পর বর্ধমান হাউসের বর্তমান রূপ। ১৯৫৫ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা একাডেমি।ফাইল ছবি

বর্ধমানের মহারাজ বিজয়চাঁদ মাহতাবের (১৮৮১-১৯৪১) ঢাকা অবস্থানকালীন আবাসস্থল বর্ধমান ভবন ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এখানেই বসবাস করেছেন খাজা নাজিমুদ্দিন ও নুরুল আমিন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্বে এ ভবনে ছাত্রদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে এবং বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর এ বাসভবন থেকেই নুরুল আমিনের কাছ থেকে ছাত্রদের গুলি করার নির্দেশ এসেছে। সেই থেকে এ ভবনকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণাগারে রূপ দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের গণবিরোধী পদক্ষেপের সমুচিত জবাব দেওয়ার দাবি প্রবলতর হচ্ছিল। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ১৬তম দাবিটি ছিল, ‘বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে কম বিলাসের বাড়িতে যুক্তফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান করা এবং বর্ধমান হাউসকে প্রথম ছাত্রাবাস ও পরে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করা।’

১৯৫৪ সালে বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এক সাহিত্য সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ‘একুশের সুরে বাঁধা’ শীর্ষক তাঁর স্মৃতিচারণায় আমরা সে সময় বর্ধমান হাউসে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার তৎপরতার অনন্য বিবরণ পাই, ‘যে বর্ধমান রাজপ্রাসাদ নুরুল আমিনের বাসস্থান ছিল, সে প্রাসাদ আজ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। সে বাড়িতে বাংলা ভাষার আকাদেমি হবে। সম্মেলনের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা এই বাড়িতেই হয়েছিল। নুরুল আমিন কীভাবে দেশের মানুষের খুনে হাত রক্তাক্ত করেছে, প্রদর্শনী উপলক্ষে এই বাড়িতেই তার সচিত্র প্রমাণ উপস্থিত করা হয়েছিল। ভাগ্যের খুবই সামান্য একটু নিষ্ঠুর পরিহাস মাত্র।’

১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের রক্তধারায় প্রতিষ্ঠা পায় বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমি উদ্বোধনের দিন প্রধান অতিথি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের বক্তব্যেও উঠে আসে একাডেমি প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে ভাষা আন্দোলনের প্রেরণার কথা, ‘সাড়ে চার কোটি পূর্ব-বঙ্গবাসীর মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা এবং তাহাকে উপযুক্ত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার যে সার্বজনীন দাবী, মূলত তাহা হইতেই বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা জন্ম লইয়াছে। কাজেই বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা পূর্ব বাংলার ভাষার শাশ্বত দাবী ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনেরই প্রথম বাস্তব স্বীকৃতি।’

বিজ্ঞাপন

মূলত উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানের ঢেউয়ের তরঙ্গ এসে লাগে বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানে। প্রতিবাদী কবিতার ধ্বনি-বারুদ আর দেশাত্মবোধক গানের অগ্নিসুরে উত্তাল হয়েছে ফেব্রুয়ারি ’৬৯, ’৭০, ’৭১-এর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। উনসত্তরের একুশের অনুষ্ঠানে সৈয়দ শামসুল হক ‘হারাধনের দশটি ছেলে’, নির্মলেন্দু গুণ ‘গণতন্ত্র’ ও ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ আর একাত্তরে একুশের আয়োজনে বাংলা একাডেমির বটতলায় শামসুর রাহমান পাঠ করেছিলেন তাঁর স্মরণীয় কবিতা ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’—‘শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।/ একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ।’

default-image

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি অমর ভাষা আন্দোলন-স্মরণ সপ্তাহের প্রধান অতিথি নির্বাচন করে সত্তরের নির্বাচনে বাংলার বীর বিজয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি সেদিন তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল এই বাংলা একাডেমী। ১৯৫২ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এই ভবনে বসেই ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর গুলির আদেশ দিয়েছিলেন। তাই যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালে ক্ষমতায় এসে এখানে বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করে।’ স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত প্রথম জাতীয় সম্মেলনের প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু আবারও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলা একাডেমির সংযোগ স্মরণ করেন ‘বাংলা একাডেমী এ দেশের দুর্জয় জনতার মাতৃভাষার সংগ্রামে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের জ্বলন্ত সাক্ষ্য বহন করছে।’

৬৫ বছর ধরে বাংলা একাডেমি অমর একুশের স্মৃতি ও মর্মবাণীকে ধারণ করেছে নানা মাত্রায়। স্বাধীন বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের চেতনাবাহী জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি একুশের শহীদ স্মরণে প্রকাশ করেছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, দলিলপত্র, ভাষাশহীদ ও ভাষাসংগ্রামীদের জীবনী, ঢাকাসহ বাংলার প্রান্তিক অঞ্চলে একুশের ইতিহাস, একুশের স্মৃতিচারণা, একুশের সংকলনপঞ্জি, একুশের কবিতা, একুশের গল্প, একুশের উপন্যাস, একুশের নাটক, ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা, প্রথম শহীদ মিনার এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ইতিহাস। একাডেমির নিয়মিত বার্ষিক প্রকাশনা একুশের প্রবন্ধ ও একুশের স্মারকগ্রন্থ।

১৯৮৫ থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আয়োজন করা হয় অমর একুশে বক্তৃতা। আশির দশকে একাডেমির সদ্য প্রয়াত মহাপরিচালক মনজুরে মওলার উদ্যোগে ১০১টি গুরুত্বপূর্ণ বাংলা গ্রন্থমালার শিরোনাম ছিল ‘ভাষা-শহীদ গ্রন্থমালা’। ‘একুশে আমাদের পরিচয়’ এ বক্তব্য ধারণ করে ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা, যা এখন বিশ্বের দীর্ঘ সময়ব্যাপ্ত ও সাড়া জাগানো বই-উৎসব। সূচনাপর্বে যেমন একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করেছেন ভাষাসংগ্রামী বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, তেমনি ১৯৮৫-তে সংস্কারকৃত ঐতিহাসিক বর্ধমান ভবন উদ্বোধনের জন্যও বাংলা একাডেমি নির্বাচন করেছে ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের জননী রাফিজা খাতুনকে। বাংলা একাডেমির বর্ধমান ভবনেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভাষা আন্দোলন জাদুঘর।

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ১৬তম দাবিটি ছিল, ‘বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে কম বিলাসের বাড়িতে যুক্তফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান করা এবং বর্ধমান হাউসকে প্রথম ছাত্রাবাস ও পরে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করা।’

বিভিন্ন সময় একাডেমির সভাপতি ও মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের দুই অংশগ্রহণকারী আনিসুজ্জামান ও রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলা একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম তত্ত্বযোদ্ধা প্রাবন্ধিক আবদুল হক এবং ভাষাসংগ্রামী সরদার ফজলুল করিম।

একুশের চেতনায় নিহিত আছে পৃথিবীর সব মানুষের মাতৃভাষার অধিকারের কথা। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ইংরেজি অনুবাদে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত দেশে দেশে, কালে কালে, বিভিন্ন ভাষায় লেখা মাতৃভাষা চেতনার কবিতার সংকলনের শিরোনামেই যেন ব্যক্ত আছে অমর একুশের গণতান্ত্রিক চেতনার মর্ম, টোয়েন্টি ফার্স্ট ফেব্রুয়ারি স্পিকস ফর অল ল্যাঙ্গুয়েজেস, (একুশে ফেব্রুয়ারি সব ভাষার কথা কয়)।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন