ভাড়া আদায় মালিকদের ইচ্ছায়

সরকারের করা ভাড়ার হার না মানা, পরিবহনে ভাড়ার তালিকা না থাকা, একই দূরত্বে বাস-মিনিবাসভেদে ভিন্ন ভাড়া, কাউন্টার সার্ভিসে স্বল্প দূরত্বে গেলেও দূরবর্তী স্থানের ভাড়া আদায় এবং যাত্রী-স্বাচ্ছন্দ্যের তোয়াক্কা না করাই যেন রাজধানীতে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবহনমালিকদের এই নৈরাজ্য অবসানে প্রশাসনের নীরবতায় জিম্মি হয়ে আছেন যাত্রীরা।
এ ছাড়া পরিবহন খাতে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নেয়, তাও যায় মালিকদের স্বার্থে। যাত্রীস্বার্থ হয় উপেক্ষিত। যাত্রীদের অভিযোগ, এই খাতে সরকার কেবল বাসের চলার অনুমতি (রুট পারমিট) দেওয়া এবং ভাড়া নির্ধারণ করা ছাড়া আর কিছুই করে না।
ঢাকায় বাস চলাচলের অনুমতি দেয় মহানগর পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি (মেট্রো আরটিসি)। এই কমিটিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ (বিআরটিএ) সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, একাধিক মালিক ও শ্রমিক সমিতির নেতারা থাকলেও যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি নেই। আর ভাড়া নির্ধারণ করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। সেখানেও পুলিশ, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি রয়েছেন। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের একজন প্রতিনিধি থাকলেও তাঁর ভূমিকা রাখার সুযোগ কম।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিগত মহাজোট সরকারের সময়ে রাজধানীতে দুই দফা বাসভাড়া বাড়ানো হয়। কিন্তু নতুন ভাড়ার হার কার্যকরের পর বাস-মিনিবাসে ভাড়ার যে তালিকা লাগানো হয়, তাতেও ছিল শুভংকরের ফাঁকি। এখন কোনো বাস-মিনিবাসেই ভাড়ার তালিকা নেই। অধিকাংশ বাসমালিকই সরকারনির্ধারিত ভাড়ার হার মানছেন না।
ভাড়া আদায় ইচ্ছামতো: সরেজমিনে ঢাকার প্রায় প্রতিটি পথে সরকারনির্ধারিত হার না মেনে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে।
বিকল্প অটো সার্ভিসের মিনিবাসে মতিঝিল থেকে মিরপুর ১২ নম্বরের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৪ টাকা। কিন্তু বিআরটিএর হিসাবে এই পথের দূরত্ব ১৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার, প্রতি কিলোমিটার দেড় টাকা হিসাবে ভাড়া হয় ২১ টাকা ৯০ পয়সা। এই মিনিবাসে মতিঝিল থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ১০ টাকা এবং ফার্মগেট থেকে মিরপুর পর্যন্ত ১৪ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু মতিঝিল থেকে ফার্মগেটের আগে যেকোনো স্থানে এবং ফার্মগেট থেকে আগারগাঁও গেলেও ১৪ টাকা নেওয়া হয়। অর্থাৎ এই মিনিবাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ ও ১৪ টাকা। অথচ আগে কম দূরত্বে এক-দুই টাকা ভাড়া দেওয়া গেলেও সর্বশেষ ভাড়া বাড়ানোর সময় মালিকদের স্বার্থে সর্বনিম্ন ভাড়া করা হয়েছে পাঁচ টাকা।
এদিকে গুলিস্তান থেকে ফার্মগেট হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরে চলাচল করা ইটিসি, বিহঙ্গসহ বিভিন্ন মিনিবাসের ভাড়া যথাক্রমে আট ও ২০ টাকা। আবার গুলিস্তান থেকে এয়ারপোর্ট পথে চলা ৩ নম্বর রুটের মিনিবাসে ফার্মগেট পর্যন্ত নেওয়া হয় ছয় টাকা। কিন্তু বিআরটিসির বাসে নেওয়া হয় ১০ টাকা। বড় বাসে প্রতি কিলোমিটারের নির্ধারিত ভাড়া এক টাকা ৬০ পয়সা।
তালতলা থেকে প্রতিদিন বিকল্প পরিবহনে মতিঝিলে যাতায়াত করা মোশাররফ হোসেন গত রোববার বলেন, ‘রাজনীতির ডামাডোলে বাসমালিকদের দৌরাত্ম্য সবাই ভুলে গেছে। এখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। আমরা অন্য অনেক সন্ত্রাসের সঙ্গে ভাড়া-সন্ত্রাসেরও শিকার।’
আজিমপুর-উত্তরা পথের দিবানিশি পরিবহনে রামপুরা সেতু/রামপুরা বাজার থেকে পান্থপথ/রাসেল স্কয়ার/সোবহানবাগ যেতে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। কিন্তু পান্থপথ বা রাসেল স্কয়ার থেকে রামপুরা যেতে নেওয়া হচ্ছে ২৫ টাকা। অর্থাৎ একই পথে দুই যাত্রায় ভাড়ার ব্যবধান পাঁচ টাকা।
সাভার থেকে শ্যামলীর দূরত্ব ১৭ দশমিক ১ কিলোমিটার। সে হিসাবে ভাড়া হয় ২৭ টাকা ৩৬ পয়সা। কিন্তু বিআরটিসি, লাব্বাইক, বৈশাখী, হানিফ পরিবহনে ৩০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। মতিঝিল-গুলিস্তান থেকে গাবতলী-সাভার-নবীনগরে চলা বাসে ফার্মগেট নামলেও ভাড়া দিতে হয় গাবতলীর। মিরপুর-আবদুল্লাহপুর পথে জাবালে নূর পরিবহনের বাসে উঠলেই ৩০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, বাসের ভাড়ার হার নির্ধারণের উপাদানগুলোর মধ্যে যাত্রীর গড় বোঝাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভাড়া নির্ধারণের কমিটিতে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা সংখ্যায় বেশি থাকায় তাঁরা ভাড়া নির্ধারণী বৈঠকে চাপ দিয়ে বাসের গড় বোঝাই কমিয়ে আনতে বাধ্য করেন। এতে ভাড়ার হার বেড়ে যায়।
ভাড়া নির্ধারণ-সংক্রান্ত কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, বিদ্যমান ভাড়ার হার নির্ধারণে গড় যাত্রী বোঝাই দেখানো হয়েছে ৭০ শতাংশ। সে হিসাবে ৩১ আসনের একটি মিনিবাসে ২২ জন এবং ৫১ আসনের বাসে ৩৬ জন যাত্রী বোঝাই হলেই সরকারনির্ধারিত ভাড়া আদায়ের শর্ত পূরণ হয়। কিন্তু মিনিবাসে ৩১ আসনের বললেও আসন করা হয় ৪০টি, বাসে আসন করা হয় ৬০টি। বাস-মিনিবাসে দাঁড়ানো যাত্রীও নেওয়া হয়।
বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা বলেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে সরকারনির্ধারিত ভাড়ার হার অর্ধেক হয়ে যাবে। কারণ, ৩ শতাংশ যাত্রী বোঝাই বেড়ে গেলে ভাড়া কমে যায় প্রায় পাঁচ পয়সা।
কিন্তু ভাড়া ও সেবা নিয়ে মালিকদের এই নৈরাজ্য থামাতে সরকারি কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য বিআরটিএর দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আছেন। কিন্তু বাড়তি ভাড়া আদায় কিংবা যাত্রী-অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে এই আদালত কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন, এমন শোনা যায়নি।
মেট্রো আরটিসির গত পাঁচ বছরের বৈঠকের কার্যপত্র পর্যালোচনা করেও যাত্রী-অধিকার লঙ্ঘন কিংবা বাড়তি ভাড়া আদায়ের দায়ে শাস্তি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। নতুন পথে বাস চালানো, এক পথের বাস অন্য পথে স্থানান্তর, বাসের রং কী হবে—এসব সিদ্ধান্তই নিয়েছে এই কমিটি। অথচ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার সময় দেওয়া শর্তগুলোর অন্যতম হলো সরকারনির্ধারিত হারে ভাড়া নেওয়া এবং ভাড়ার তালিকা টাঙানো। এই শর্ত না মানলে চলাচলের অনুমতিই বাতিল হওয়ার কথা।
বিআরটিএর হিসাবে বর্তমানে ঢাকা ও এর আশপাশে ১৭০টি পথে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বাস-মিনিবাসের চলাচলের অনুমতি আছে।
ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্যের বিষয়ে যোগাযোগসচিব এম এ এন সিদ্দিক বলেন, ‘আমি আরও কঠোর হতে চাই। জনগণের একটু সহায়তা লাগবে।’