default-image

অস্ট্রিয়ান নাগরিক ভিক্টোরিয়া। ১৯৪৫ সালে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পাকিস্তানের ফিরোজ খান নূনকে। নাম পরিবর্তন করে হন ভিকারুননিসা নূন। ১৯৫৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৫৮–এর ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ছিলেন ফার্স্ট লেডি। পেশায় কূটনীতিবিদ না হয়েও অনেক পেশাদার কূটনীতিবিদের চেয়ে তিনি ছিলেন দক্ষ। ১৯৫৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ‘গোয়াদর’ ভূখণ্ডের মতো সোনার ডিম পাড়া মুরগিকে ওমান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে ৫০০ কোটি রুপিতে খরিদ করার সুযোগ পায় পাকিস্তান। লেডি নূনের কূটনৈতিক সাফল্যের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনি ওমানের কাছ থেকে ‘গোয়াদর’ বাগিয়ে নেওয়ার জন্য ইরানের শাহও ছিলেন একজন প্রতিদ্বন্দ্বী। নূন শেষ পর্যন্ত দ্বারস্থ হয়েছিলেন উইনস্টন চার্চিলের।

১৯৫৯ সালে নিশান-ই-ইমতিয়াজ–এ ভূষিত করা হয় ভিকারুননিসাকে। কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে এই নারীর জুড়ি মেলা ভার। ১৯৫২ সালের আরেকটি ঘটনা। পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের দায়িত্বে তখন ফিরোজ খান। আমেরিকান রাষ্ট্রদূত হিসেবে আভরা ওয়ারেন তখন পাকিস্তানে নিযুক্ত। ঢাকাতে ওয়ারেনের আগমনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বেগম নূনের পক্ষ থেকে ছবির এক বছর বয়সী বাচ্চা হাতিটিকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। কী অভিনব উপহার!

নিবেদিতপ্রাণ এই সমাজকর্মীর জন্ম ১৯২০ সালের জুলাই মাসে। স্বামীর সঙ্গে প্রথম পরিচয় লন্ডনে। ফিরোজ খান ছিলেন সেখানকার হাইকমিশনার। পরবর্তী সময়ে ভারতের ভাইসরয়ের মন্ত্রিপরিষদে। একপর্যায়ে সেখান থেকে পদত্যাগ করে স্ত্রীকে নিয়ে লাহোর চলে আসেন ফিরোজ খান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন ভিকারুননিসা। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বে এ–সংক্রান্ত সভা-সমিতিগুলোতে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো।

১৯৫০ সালের কথা। রমনার জিমখানায় অবস্থিত প্রিপারেটরি স্কুল পরিদর্শনে গেলেন ভিকারুননিসা। স্কুলটিকে বিস্তৃত পরিসরে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। বিত্তবান মানুষদের কাছ থেকে অনুদান পাওয়ার প্রচেষ্টা নেন। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ১৪ জানুয়ারি বেইলি রোডে স্থাপিত হয় স্কুলটি। বর্তমানে যা স্বনামধন্য ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এ আর আফ্রিদি তখন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি। ৭০০ ছাত্রছাত্রীর পড়ালেখার সুব্যবস্থা হয় এমন একটি ইংরেজি পাবলিক স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়–সংবলিত একটি আবেদন হাতে পান চেম্বার প্রেসিডেন্ট। ১৯৫৩ সালের শুরুতে এমসিসিআই সদস্যদের কাছ থেকে ২৮ হাজার ৫০০ রুপি অনুদান সংগৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে আরও ৬১ হাজার ৭৫০ রুপি। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এস এইচ কোরেশীর মাধ্যমে বার্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে পাওয়া যায় ১০ হাজার রুপি। ফান্ড সংগ্রহের বিষয়ে অধৈর্য হননি নূন। ১৯৫৩ সালে এমসিসিআই প্রেসিডেন্ট আর ডব্লিউ এন ফার্গুসনকে পান স্কুলটির গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে। ওই বছর গভর্নিং বডিতে সংযুক্ত হন স্বনামধন্য ইস্পাহানী গ্রুপের এম এম ইস্পাহানী। ইস্পাহানী ও এ ডি বোলডির প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের ব্যবধানে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) কাছ থেকে পাওয়া যায় ৫৮ হাজার ও ১ হাজার ২৫০ টাকার দুটি চেক। ‘এমসিসিআই: আ জার্নি (১৯০৪-২০১৪)’ স্মরণিকায় এসবের প্রমাণ মেলে।

ভিকারুননিসা নূনের একটি ম্যুরাল রয়েছে স্কুলপ্রাঙ্গণে। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতেও তিনি মেয়েদের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। স্বামীর মৃত্যুর (১৯৭০) পর তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ড থেমে যায়নি। ১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর (পৃষ্ঠা-৮), দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘লেডি নূন জাস্ট আ সিম্পল হিউম্যানিটারিয়ান’। তিনি ছিলেন তখন পাকিস্তান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের পরিচালক ও পশ্চিম পাকিস্তান রেডক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান। সমাজকর্মী হিসেবে নূনের অনন্য সব কর্মকাণ্ডের স্মারক ওই নিবন্ধ। ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন অব পাকিস্তানের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আইইউডি (কপারটি) এবং ভ্যাসেকটমি জনপ্রিয় করে তোলায় তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনকালে তিনি ছিলেন পাকিস্তান সরকারের পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ফেডারেল মন্ত্রী।

default-image

নূন প্রসঙ্গে পঞ্চাশ দশকের একটি ব্যতিক্রমী ঘটনার উল্লেখ না করলে নিবন্ধটি বোধ করি অসমাপ্ত থেকে যাবে। ১৯৫৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর আমন্ত্রণে ফিরোজ খানের সঙ্গী হয়েছেন তিনি। পিআইএর বিশেষ বিমানে তাঁরা নয়াদিল্লি যান। সিঁড়ির কয়েক ধাপ থাকতেই কীভাবে যেন বেগম নূনের একটি জুতা নিচে পড়ে যায়। সিকিউরিটির কেউ নন, বরং সিঁড়ির নিচ থেকে বেগম নূনের জুতাটি স্বয়ং জওহরলাল নেহেরু তুলে আনেন। সবাইকে হতবাক করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জুতাটি বেগম নূনের পায়ে পরিয়ে দিতে এগিয়ে যান। ধারণা করা যায়, নেহরু ও নূন উভয়ের অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণেই এই বিরল ঘটনার জন্ম। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ভিকি নূন এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন (ভিএনইএফ)। মেধাবী পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় ভিএনইএফের এই কার্যক্রম। ফাউন্ডেশনটি যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৃত্তির ব্যবস্থা করে। ২০০০ সালের ১৬ জানুয়ারি এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে।

তথ্যসূত্র:
১.
ভিক্টোরিয়া ও গোয়াদর, এলইউবিপি (লেট আস বিল্ড পাকিস্তান), ১২ ডিসেম্বর, ২০১৮

২.
অমরজিৎ সিং, ফাউন্ডেশন অব পাকিস্তান: আ স্টাডি অব দ্য উইমেন লিডারশিপ অব দ্য পাঞ্জাব প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগ, জার্নাল অব দ্য রিসার্চ সোসাইটি অব পাকিস্তান, ভলিউম-৪৫, নং-০১, ২০০৮
৩.
বাংলাপিডিয়া, ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ

৪.
সৈয়দ আবুল মকসুদ, রাজনৈতিক নেতাদের সৌজন্যবোধ ও ভাষারীতি, দৈনিক প্রথম আলো, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

*লেখক: গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0