default-image

গত এক দশকে জাতীয় কিংবা স্থানীয় সব নির্বাচনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিরোধীদের কোণঠাসা করতে পেরেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। চলতি পৌরসভা নির্বাচনেও এ ধারা অব্যাহত আছে। তবে এতেও স্বস্তি মিলছে না আওয়ামী লীগের। কারণ, প্রচারে সহিংসতা, ভোটকেন্দ্রে আধিপত্য এবং নির্বাচন–পরবর্তী উত্তেজনা—সবকিছুতেই মূল পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর অনুসারীরা। ভোটে নিজ দলের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে কেউ কেউ নির্বাচনব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, এখন কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জয় কোনো বড় খবর নয়। জয়টা কীভাবে এল, সেটাই বড় খবর হয়ে উঠছে। আর এতে খুব বেশি খুশি হওয়ার সুযোগ থাকছে না। নির্বাচনে জিততে দলের মনোনীত প্রার্থীরা বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিশানা বানাচ্ছেন। আবার বিদ্রোহীরাও চড়াও হচ্ছেন দলের লোকজনের ওপর। অভ্যন্তরীণ কোন্দল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নির্বাচন সুষ্ঠু হলে দলীয় প্রার্থী ‘পালানোর পথ খুঁজে পাবে না’, এমন বক্তব্য আসছে নিজ দলের প্রার্থীর কাছ থেকেই। ফলে নির্বাচনে জয় অনেকটাই প্রার্থীর নিজের জয় বা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা। তাঁরা মনে করছেন, বিপুল জয়ে দল খুব বেশি লাভবান হতে পারছে না।

করোনা সংক্রমণের কারণে এবার চার ধাপে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে ২৪টি পৌরসভায় নির্বাচন হয়েছে। গত শনিবার দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচন হয়েছে ৬০টি পৌরসভায়। দুই ধাপ মিলিয়ে ৬৪ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন আটজন। বিএনপির ঝুলিতে পড়েছে আটটি মেয়র পদ। এর মধ্যে দুজন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীও আছেন।

নির্বাচন একটা লড়াই। জেতার জন্য প্রার্থীরা অনেক কিছুই বলেন। কিন্তু দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না। এ বিষয়ে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা খুবই কঠোর অবস্থানে।
আব্দুর রাজ্জাক, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে যে আওয়ামী লীগের কজন পৌর মেয়র হয়েছেন, তা চট করে বলতে পারব না। কিন্তু নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জার সেই বক্তব্য “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, কিন্তু ভোটের অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠা হয়নি” তা কানে বাজছে।’ ওই নেতা বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে আওয়ামী লীগ খুবই স্পর্শকাতর। গত এক যুগে সরকার ও দলের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা হয়েছে। তবে দলের ভেতর থেকে নির্বাচন নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেননি। নোয়াখালীতে আবদুল কাদের মির্জা এই কাজই করেছেন।

বিজ্ঞাপন

পৌরসভা নির্বাচনের দেখভাল করছেন, আওয়ামী লীগের এমন একাধিক নেতা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে তেমন কৌশল নেই। মনোনয়ন থেকে শুরু করে জয়—অনেকটাই প্রার্থীর টাকা ও প্রভাবের ওপর চলে গেছে। দলের ভেতর টাকাওয়ালা ও প্রভাবশালীর সংখ্যা বেড়েছে। ফলে সংঘাত, কেন্দ্র দখল ও প্রকাশ্যে ভোট দিতে বাধ্য করার বিষয়গুলো দলীয় নেতা-কর্মীরাই নিয়ন্ত্রণ করছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন একটা লড়াই। জেতার জন্য প্রার্থীরা অনেক কিছুই বলেন। কিন্তু দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না। এ বিষয়ে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা খুবই কঠোর অবস্থানে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এলাকার নানা জটিল বিষয় থাকে। অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক সংঘাত-সহিংসতার নজির আছে। তবে আওয়ামী লীগ এ বদনামের ভাগীদার হতে চায় না।

সংঘাতের পক্ষ-বিপক্ষ আ.লীগের
পৌরসভা নির্বাচনের প্রথম পর্বে বড় ধরনের সংঘাত হয়নি। দ্বিতীয় পর্বে তিনজনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় নিহত হন আওয়ামী লীগের দুজন নেতা-কর্মী। আর সিরাজগঞ্জে নির্বাচনে জয়ী হয়েও প্রাণ হারানো কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন নির্দলীয়। তবে তাঁকে খুনের পেছনে জড়িত ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী বলে অভিযোগ এসেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২৭ জানুয়ারি। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার রাতে শহরের পাঠানটুলী ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীর অনুসারীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত হন। অর্থাৎ এ পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে প্রতিটি প্রাণহানির পেছনে আওয়ামী লীগের নাম জড়িয়ে আছে।

সরকার ও নির্বাচন কমিশন মিলে নির্বাচনব্যবস্থাটাকেই ভেঙে দিয়েছে। এখন ভালো কিংবা খারাপ, দুটোই করার ক্ষমতা আছে আওয়ামী লীগের।
বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন

এ ছাড়া পৌরসভার দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনী প্রচারের সময় ও নির্বাচনের দিন বেশ কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে আলোচিত পৌরসভা হচ্ছে রাজশাহীর আড়ানী, বরগুনা, নরসিংদী, ঝিনাইদহের শৈলকুপা, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুর।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ধাপে ১৬টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। মূলত এসব পৌরসভায় বাধা, সংঘাতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। তবে যেখানে বিদ্রোহী নেই, সেখানে সাংসদ-উপজেলা চেয়ারম্যান দ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কারণেও পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এখন বিএনপি বা অন্য দলের প্রার্থীকে কেউ আর প্রতিপক্ষ মনে করছে না। দলের মধ্যে বিরোধের কারণে সংঘর্ষ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থী ও প্রতিপক্ষ দুজনই আওয়ামী লীগের হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঠিক কী ভূমিকা নেবে, সেটি নির্ধারণ করাও সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। পৌরসভার আগামী দুই পর্বের নির্বাচনেও সেই শঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা দুঃখ প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বেশি থাকলে দল উপকৃত হবে, এমনটাই মনে করে সবাই। কিন্তু করোনা মহামারিতে ত্রাণ বিতরণে জনপ্রতিনিধিদের ওপর পুরোপুরি ভরসা করা যায়নি। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। উল্টো জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ত্রাণ আত্মসাতের খবর আসে। এর বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধি। বদনাম কামিয়ে এসব জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে দলের লাভ কী?

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, দল ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছু ব্যক্তির মধ্যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা, সংঘাতে জড়ানো এবং দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা আছে। তবে দল বিষয়গুলো দেখছে। ব্যক্তির স্বার্থে দলকে বিব্রত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

নির্বাচনব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ
নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভায় সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা সড়ক অবরোধ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই। পরিবার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নিয়ে তিনি কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বক্তৃতার এ ধারা অব্যাহত রাখেন নির্বাচনের আগ পর্যন্ত, যা জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়। শনিবারের নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।

সড়ক অবরোধের পর আবদুল কাদের মির্জা বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, কিন্তু ভোটের অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠা হয়নি।’ দলের স্থানীয় সাংসদদের ইঙ্গিত করে তাঁকে বলতে শোনা গেছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারটা আসন ছাড়া বাকি আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদেরা পালানোর দরজা খুঁজে পাবেন না। এসব বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ এখন মানুষের মুঠোফোনে ঘুরছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ধাপে ১৬টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। মূলত এসব পৌরসভায় বাধা, সংঘাতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। তবে যেখানে বিদ্রোহী নেই, সেখানে সাংসদ-উপজেলা চেয়ারম্যান দ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কারণেও পাল্টাপাল্টি হামলা হয়।

গত শনিবারের পৌরসভার দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুজন নেতার সঙ্গে আবদুল কাদের মির্জার সমালোচনার বিষয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলেন, আবদুল কাদেরের বক্তব্যের পেছনে দুটি কৌশল থাকতে পারে। এক. সরকার ও দলের বিরুদ্ধে বললে ভোট বাড়ে। তাঁর বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার ফলে এ যুক্তি আরও শক্ত হয়েছে। কারণ, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তিনি যেসব আশঙ্কা করেছিলেন, তা বসুরহাটে নির্বাচনের দিন দেখা যায়নি। দুই. আসলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলে তিনি মনে করেছিলেন। এ জন্য প্রশাসন ও দলের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চেয়েছেন আবদুল কাদের মির্জা। যে কৌশলই তিনি নিন না কেন, তিনি সফল হয়েছেন। তবে এর মাধ্যমে দলের অবস্থান ও দেশের নির্বাচনব্যবস্থা—দুটি নিয়েই তিনি প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন মিলে নির্বাচনব্যবস্থাটাকেই ভেঙে দিয়েছে। এখন ভালো কিংবা খারাপ, দুটোই করার ক্ষমতা আছে আওয়ামী লীগের। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এ ধারণা তৈরি হয়েছে যে শক্তি থাকলে যেকোনো কিছুই করা সম্ভব। বিরোধীরা যেহেতু মাঠে নেই। তাই এখন সেই শক্তি প্রয়োগ হচ্ছে নিজেদের ওপর। এর মাধ্যমে দল ও নির্বাচনব্যবস্থা যে আরও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, সেটা মনে হয় কারও ভাবনায় নেই।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন