default-image

মোস্তফা হাওলাদারের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের আবুগঞ্জ বাজারের দক্ষিণ পাশে। কোরবানি সামনে রেখে তিনি এ বছর প্রথম বাড়িতে মহিষ পালন শুরু করেছেন। প্রথম বছরই তাঁর সফলতা দেখে অন্যরাও গরু-ছাগলের মতো বাড়ির গোয়ালঘরে মহিষ পালনের চিন্তা করছেন। মোস্তফা এ বছর তিনটি চেলা মহিষ (পুরুষ) বিক্রি করেছেন ৩ লাখ ২০ হাজার টাকায়। দুটি দুই লাখ টাকায়। অন্যটি ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়।

মোস্তফা হাওলাদার জানান, মহিষ তিনি অনেক আগে থেকে পুষছেন। সেটা ছিল চরাঞ্চলে, বাথানভিত্তিক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। বর্ষার মৌসুমে চরে ঘাসের ব্যাপক সংকট থাকায় দেখা দেয় মহিষের নানা রকম সমস্যা। কাদাপানি আর জোয়ারের পানিতে মহিষ ভেসে যায়। দেখা দেয় রোগ। বেসরকারি সংস্থার প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শে চলতি বছর তিনি বাড়ির পাশে খামারভিত্তিক মহিষ পালনে উদ্যোগী হন। একটি স্বাস্থ্যসম্মত টিনের ঘরে শুরু করেন ১২টি মহিষ পালন। মহিষকে তিনি কাঁচা ঘাস, ডালের ভুসি, ভুট্টা, ঝোলা গুড়, প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ানো শুরু করেন। কোরবানি সামনে রেখে তিনটি মহিষের আলাদাভাবে যত্ন নেওয়া শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘ঘরোয়াভাবে পোষা মা মহিষ থেকে দুধ বেশি পাচ্ছি। আবার মাংসের জন্য মহিষের দৈহিক বৃদ্ধি ছিল আশাব্যঞ্জক।’

মোস্তফা হাওলাদার বলেন, প্রথম দিকে মহিষ খামারে চারিতে (পাত্রে) খাবার খেতে চাইত না। যখন একটির অভ্যাস করিয়েছেন, ওর দেখাদেখি সবগুলো খাচ্ছে। ভবিষ্যতে তিনি কোরবানি সামনে রেখে আরও মহিষ মোটাতাজা করবেন।

কোরবানি সামনে রেখে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ অত্যন্ত জনপ্রিয় ও লাভজনক উপায়। কারণ দেশে মাংসের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ছিল অনেকাংশে কম। কোরবানির সময় গবাদিপশুর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ২৩ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত জেলার ২২ জন মহিষ খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারা দেশের মতো কোরবানি সামনে রেখে ভোলার মানুষও পশু মোটাতাজা ও বিক্রি করছেন। কয়েক বছর ধরে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে পশু আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর দেশে গবাদিপশু মোটাতাজা করার পদ্ধতি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কোরবানির সময় বরাবরই ভোলা থেকে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে কয়েক হাজার গরু, ছাগল ও মহিষ বাইরের জেলায় পাঠানো হচ্ছে। আর ভোলার গরুর জনপ্রিয়তা বাইরের জেলায় বেশি। কারণ এখানে ভেষজ পদ্ধতিতে গবাদিপশু মোটাতাজা করা হচ্ছে। আকার ছোট হলেও পশুগুলো স্বাস্থ্যবান।

খামারিরা আরও জানান, বিগত সময়ে গবাদিপশুর মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ সচরাচর দেখা যেত। অর্থাৎ কোরবানি সামনে রেখে গরুর বিশেষ যত্ন বেড়ে যেত। দুই বছর ধরে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার (জিজেইউএস) চিকিৎসকদের পরামর্শে কোরবানি উপলক্ষে মহিষেরও বিশেষ যত্ন নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নতুন বললে ভুল হবে না। এতে গৃহভিত্তিক মহিষের আবাদ বাড়ছে। সঙ্গে ক্ষুদ্র খামারিরাও ফল পেতে শুরু করেছেন। তবে মহিষের বাজার কেবল চট্টগ্রামেই বেশি। সারা দেশে এর চাহিদা বাড়লে কৃষক আরও মহিষ পালনে উদ্বুদ্ধ হতেন।

ভোলার সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের চর চটকিমারার খামারি ইউসুফ শনি বলেন, তিনি চলতি বছর পাঁচটি মহিষ বিক্রি করেছেন ৪ লাখ টাকায়। একটি মহিষে ৫-৬ মণ মাংস হবে। যদি চাহিদা বাড়ত, তাহলে ৫ লাখেই বিক্রি হতো।

ইউসুফ বলেন, বিগত বছরেও তিনি মহিষ বিক্রি করেছেন। কিন্তু গত দুই বছর একটু ভালো দাম পাচ্ছেন। কোরবানির পাঁচ-ছয় মাস আগেই চেলা (পুরুষ) মহিষগুলোকে আলাদা করে বিশেষ যত্ন নেওয়া শুরু করেছেন। ঠিকমতো গোসল করাচ্ছেন, ওষুধ-বড়ি খাওয়াচ্ছেন, কাঁচা ঘাসের সঙ্গে খৈল-ভুসি খাওয়াচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘চেহারা মাশাআল্লাহ! তবে নিজের নয়, ব্যাপারীর মনের মতো দামেই বিক্রি করছি—এই যা!’

চরফ্যাশন উপজেলার মুজিবনগর ইউনিয়নের মো. জসিম উদ্দিন বলেন, মহিষকে খাওয়ানোর জন্য তিনি এবার নেপিয়ার ঘাসের খেত করেছেন। লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগরের সাবেক ইউপি সদস্য মো. কাঞ্চন বলেন, তাঁর মহিষ ১১০টি। বর্ষায় খাবার সংকটে মহিষ বেশির ভাগ থাকে রোগাপটকা। এর মধ্য থেকে বাছাই করে দুটি মহিষ বাড়িতে এনে যত্ন নিয়ে লালন-পালন করেছেন। দুটি দুই লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।

default-image

ভোলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, মহিষ মোটাতাজা করার তিনটি স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি রয়েছে। ইউএমএস (ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র), সাইলেস (ঝোলা গুড় সহযোগে খড়) ও শৈবাল পদ্ধতি (সার ব্যবহার করে জন্মানো শৈবাল খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়)। ইউএমএস পদ্ধতি ছাড়া বাকি দুটি অনেকটাই ভেষজ পদ্ধতি। তবে ইউএমএস পদ্ধতিতে ৭০ শতাংশ চিটা গুড়যুক্ত খড় ও ৩০ শতাংশ ইউরিয়া ব্যবহার করা হলেও এটিও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মহিষকে খাবার খাওয়ানোর তিন দিন পর সেটি শরীরে ভেষজে রূপান্তরিত হয়। মহিষের মাংস নরম ও কম চর্বিযুক্ত। গরু মোটাতাজাকরণের সঙ্গে সঙ্গে মহিষ মোটাতাজা করার পরামর্শ এ জন্য দেওয়া হচ্ছে। ভোলায় ১ লাখ ৫০ হাজার মহিষ আছে। প্রতিবছর ২০ শতাংশ মহিষ বাচ্চা দেয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ মহিষ চেলা (পুরুষ)। এই ৫০ শতাংশ যদি মানুষের মাংসের চাহিদা পূরণে যথাযথ ব্যবহার হয়, তাহলে দেশ মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রতিবছর তাঁরা ভোলায় মহিষ ও ভেড়া কোরবানিতে জনগণকে উৎসাহিত করছেন। বিগত বছরে কোরবানিতে মহিষ যুক্তের লক্ষ্য ছিল ১ হাজার ২০০টি। এ বছর তা বাড়িয়ে দেড় হাজার করা হয়েছে।

জিজেইউএসের উপপরিচালক (প্রাণী) খলিলুর রহমান বলেন, ভোলা ও উপকূলীয় এলাকা মহিষ পালনে উপযোগী অঞ্চল। এ কারণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইফাদ ও জিজেইউএস যৌথভাবে এ অঞ্চলে গৃহভিত্তিক মহিষ পালনে খামারিদের উদ্বুদ্ধ করছে। কোরবানি সামনে রেখে মহিষ মোটাতাজাকরণ তারই একটি অংশ। তাঁরা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এ বছর ৩০০ খামারিকে গৃহে মহিষ মোটাতাজাকরণে সহায়তা করেছেন এবং বাজার সৃষ্টিতে সহায়তা করছেন। এর মধ্যে ২৮৬টি পরিবারের মহিষ ইতিমধ্যে বিক্রি শেষ। বাকিদেরও বিক্রির পথে।

জিজেইউএসের (গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা) নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, তাঁরা দেশের মাংস বাজার স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এবং বিদেশে মাংস রপ্তানি করতে সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে মহিষ ও ভেড়ার মাংস উৎপাদনে কাজ করছেন। কোরবানিসহ চট্টগ্রামে মহিষের মাংসের বিরাট বাজার। যদি সারা দেশে এ রকম বাজার সৃষ্টি হয়, তাহলে খামারি আরও লাভবান হবেন। দেশের বাইরের বাজার ধরতেও তাঁরা কাজ করছেন। ইফাদ ও পিকেএসএফ সহযোগিতা করলে তা অচিরেই সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0