বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেশভাগ ও ম্যালেরিয়া

বাংলা ভাগের পেছনেও মহামারির পরোক্ষ ভূমিকা দেখা যায়। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ভারতবর্ষে ১১টি বড় আকারের মহামারি ঘটে। এরপরও ১৯২০ সাল পর্যন্ত কলেরা, ম্যালেরিয়া ও বসন্ত রোগের মহামারিতে অনেক প্রাণহানি ঘটে। ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিতে ব্রিটিশ ভারতে প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে। অখণ্ড বাংলার পশ্চিমাঞ্চলেই এই মহামারিগুলো বেশি ধ্বংসলীলা চালায়। ১৮৭৪-১৮৭৮ পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ কালাজ্বরে মারা যেত। ১৮৯৬-১৯০০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৬ লাখে।

ব্রিটিশ ভুল নদীশাসনব্যবস্থার কারণেই যে ম্যালেরিয়া মহামারি ঘটছে, তা ব্রিটিশ নদীবিশেষজ্ঞ স্যার উইলিয়ম উইলকক্স তাঁর বাংলার নিজস্ব সেচব্যবস্থা বইয়ে দেখিয়ে দেন। ব্রিটিশের তৈরি ভুল বাঁধ ও রেলের অবকাঠামোর কারণে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতাকে ম্যালেরিয়াবাহী মশার জন্য দায়ী করেন ব্রিটিশ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। (বাংলার নিজস্ব সেচব্যবস্থা: উইলিয়ম উইলকক্স, ২০২১, ডাকঘর)

১৮৭১-১৯৩১ সাল পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে ছিল ১২.৮৫ শতাংশ, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে তা ছিল মাত্র ১.৪ শতাংশ, মধ্যবাংলায় ৫.৪ শতাংশ এবং উত্তর বাংলায় ৫.২ শতাংশ। এসব মহামারিতে পশ্চিম বাংলার জনসংখ্যা কমে যায়, অনেকে দেশান্তরী হয়। কম আক্রান্ত পূর্ব বাংলার বিপুল কৃষকেরাই পরের যুগে জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ ও পাকিস্তান আন্দোলনে গতি দেন। দেশভাগের আগে দেখা যায় যে পূর্ব বাংলার জনসংখ্যা পশ্চিম বাংলার তুলনায় বেশি এবং তাদের বেশির ভাগই মুসলমান। পূর্ব বাংলার আয়তন পশ্চিম বাংলার চেয়ে ছিল বড় এবং কৃষক পরিবারের সদস্যসংখ্যাও থাকে বেশি। মহামারির সুদূরপ্রসারী অভিঘাতে বাংলার বড় অংশের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পূর্ব বাংলার মুসলমানদের হাতে আসে। (Kohei Wakimura: ‘Indian Economy and Disasters during the Late 19th Century’)

ব্রিটিশ শাসন: কালাজ্বরের রানি

ভারতীয় মহামারিগুলোর জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের সৃষ্টি করা জলাবদ্ধতা ও দুর্ভিক্ষে দুর্বল জনস্বাস্থ্য দায়ী হলেও ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এশিয়া তথা ভারতবর্ষের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুই কলেরার কারণ। তাঁদের ধারণা, গরম দেশগুলো শ্বেতাঙ্গদের জন্য অনুপযুক্ত। তাই দীর্ঘদিন এসব দেশে উপনিবেশ চালানো কঠিন। এই চিন্তা থেকে ব্রিটিশরা এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের চিন্তা বাদ দেয়। ১৮৬০-এর পর বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর প্রমুখের গবেষণায় জানা যায়, পূতিবাষ্প নয়, রোগের আসল কারণ জীবাণু। সেই থেকে স্থানীয় মানুষের শরীরের জীবাণু যাতে শ্বেতাঙ্গ শরীর স্পর্শ করতে না পারে, সে জন্য উভয়ের আবাসন আলাদা করা হয়। ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতায় শ্বেতাঙ্গদের আলাদা আবাসন তৈরি হয়। বড় ভয় ছিল সেনাবাহিনী নিয়ে। ১৭৫৭ সালের পলাশী থেকে সিপাহি বিপ্লব পর্যন্ত ৯৪ শতাংশ ইংরেজ সেনার মৃত্যুর কারণ ছিল বিভিন্ন ধরনের রোগ। কলেরা ছিল এসবের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক। মাত্র ৬ শতাংশ ব্রিটিশের মৃত্যু হয়েছিল সরাসরি যুদ্ধে।

ব্রিটিশ ক্যান্টনমেন্টগুলো কেবল দেশীয়দের আক্রমণ থেকেই সুরক্ষিত রাখা হতো না, লোকালয় ও দেশীয় মানুষের শরীরের থেকে এসবের বিচ্ছিন্ন থাকার মূল কারণ ছিল মহামারির আতঙ্ক। ১৯০৯ সালে ক্যান্টনমেন্টস ম্যানুয়ালে লেখা হলো, ‘এ কথা আমাদের সর্বদা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে…ক্যান্টনমেন্টগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য ব্রিটিশ সৈন্যের স্বাস্থ্যরক্ষা…। অন্য সবকিছুরই স্থান তার নিচে।’

আজকেও আধুনিক রাষ্ট্রগুলো এই ঔপনিবেশিক বিধি ব্যবহার করে যাচ্ছে। ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী লিখছেন, ‘এই নীতি অনুসারে জন্ম হলো ভারতের নানান শহরে ক্যান্টনমেন্ট, সিভিল লাইন, হিল স্টেশন ইত্যাদি। সাম্রাজ্যবাদী জনস্বাস্থ্যের মূল কথাই ছিল জাতিবৈষম্যকে বাঁচিয়ে রাখা।’ এসব দেখে বিরক্ত ব্রিটিশভক্ত নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলেও ব্রিটিশ শাসনকে রুশ জারতন্ত্রের চেয়ে নিকৃষ্ট বলে নিন্দা করেন। মহামারি মোকাবিলায় ব্যর্থতা ভারতীয় কংগ্রেস পার্টিকে ব্রিটিশ আনুগত্য থেকে ব্রিটিশবিরোধী করে তোলে। ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার নাম দেওয়া হয় কুইন অব ব্ল্যাক ডেথ বা কালাজ্বরের রানি।

ব্ল্যাক ডেথ ও আধুনিকতা

চৌদ্দ শতকে ব্ল্যাক ডেথ নামক প্লেগে ইউরোপের অর্ধেক মানুষ মারা যায়। ফলে সস্তা শ্রমের অভাব দেখা দিলে ভূমিদাসপ্রথা বিলুপ্ত হয় এবং প্রযুক্তিগত আবিষ্কারগুলো ত্বরান্বিত হয়। ইউরোপে শান্তিও আসে। একটানা যুদ্ধলিপ্ত ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স প্লেগ মহামারির চাপে যুদ্ধবিরতি করে ফেলে। নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্রিটিশ সামন্তবাদ ধসে পড়ে, আধুনিকতার উন্মেষ ঘটতে থাকে। পাশাপাশি ইহুদিদের দায়ী করা হতে থাকে প্লেগের জন্য। তাদের বিতাড়ন করা থেকেই ইউরোপজুড়ে দেখা যায় একদল ‘ইহুদি শরণার্থী’। ইতালির বিপুল মানুষ ব্ল্যাক ডেথ নামের প্লেগে মারা গেলে জীবন-জগৎ সম্পর্কে নতুন বোধের প্রসার হতে থাকে। মানুষ নিজেদের জীবনের দিকে ফিরে তাকায়। শিল্প-সাহিত্যে নতুন যুগের শুরু হয়, যাকে পরে নাম দেওয়া হয় ‘রেনেসাঁ’ বা নবজাগরণ। একটানা যুদ্ধলিপ্ত ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স প্লেগ মহামারির চাপে যুদ্ধবিরতি করে ফেলে। নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্রিটিশ সামন্তবাদ ধসে পড়ে, আধুনিকতার উন্মেষ ঘটতে থাকে। প্লেগের কারণে দুর্বল হয়ে যাওয়া ভাইকিংরা (স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জলদস্যু) আমেরিকা মহাদেশ অভিযানের চিন্তা বাদ দেয়। ফরাসি বিপ্লব যখন চলছে, তখন মহামারিতে বিপর্যস্ত কৃষকেরা ইউরোপের দেশে দেশে বিদ্রোহ করছে। মহামারি, দুর্ভিক্ষ ও নির্যাতনে মরিয়া কৃষক-শ্রমিকেরাই ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয়। আর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে সাম্য ও গণতন্ত্রের চেতনা।

নেপোলিয়নের স্বপ্নভঙ্গ ও অ্যাজটেকদের বিনাশ

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের ক্যারিবীয় ও আমেরিকান সাম্রাজ্যের স্বপ্ন তছনছ করে দিয়েছিল মহামারি। হলুদ জ্বরের মহামারির সময় হাইতির কালো দাসেরা দেখে জ্বর তাদের ধরছে না, মারছে শুধু ফরাসিদের। দাসদের নেতা তুসো ল্যুভার্চার সুযোগটা নেন। তারা বিদ্রোহ করে। নেপোলিয়ন তাঁর গ্রেট আর্মাডা নৌবহর পাঠিয়েও ব্যর্থ হন। হাইতিও অল্পকালের জন্য স্বাধীন হয়। শুধু হাইতিই নয়, নেপোলিয়নের আমেরিকা দখলের খায়েশেরও ইতি ঘটায় হলুদ জ্বরের মহামারি। আমেরিকান সাম্রাজ্যের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হওয়ার পর ফরাসিরা ১৮০৩ সালে তাদের অধিকৃত লুইজিয়ানা অঞ্চল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের কাছে বিক্রি করে দেন। লুইজিয়ানা হাতে পেয়ে আমেরিকার আয়তন দ্বিগুণ হয়ে যায়। এমনকি নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী মস্কো পর্যন্ত দখল করে ফিরতে বাধ্য হয় আমাশয় মহামারির কারণে। খুব অল্পসংখ্যক ফরাসি সেনাই দেশে ফিরতে পারে। বলা হয় নেপোলিয়নকে পরাজিত করেছিল মহামারি, কোনো সেনাপতি নয়।

মহামারির কারণে নেপোলিয়ন ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চল ও আমেরিকা থেকে সরে এলেও তারও আগের কলম্বাসের বেলায় সেটা শাপে বর হয়েছিল। ১৫২০ সালে বসন্ত রোগে আমেরিকার আসল অধিবাসীদের অ্যাজটেক সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। কৃষকেরা ফসল ফলাতে ব্যর্থ হয় এবং দুর্বল জনপদগুলো স্প্যানিশ উপনিবেশকারীদের কবলে পড়ে। অ্যাজটেকদের পতন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এতে ইউরোপীয়দের হাতে আসে বিশাল আদিবাসী ভূখণ্ড।

মহামারিতে বিপর্যস্ত প্রাচীন দুনিয়া

বিশ্ব ইতিহাসের আরেকটি মোড় হলো প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের পোলোপসেনীয় যুদ্ধ (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১-৪০৪)। গ্রিসের দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার এই যুদ্ধ চলাকালে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে এথেন্সে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইসিস লিখেছেন, প্রখ্যাত জেনারেলসহ এক-তৃতীয়াংশ অ্যাথেনীয় মারা যায়। এথেন্স হারে, শেষ হয় গ্রিক স্বর্ণযুগ। নগররাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য চলে যায় স্পার্টার হাতে।

আজকের ইউরোপও এক অর্থে মহামারির দান। জার্মানি থেকে মহামারির কারণে রোমান সেনাদের বিদায় নিতে হয়। রোমান সাম্রাজ্যে ৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে জাস্টিনিয়ান প্লেগে ৫ কোটি লোকের মৃত্যু ঘটে। রোমান সাম্রাজ্য কমজোরি হয়, সমাজে খ্রিষ্টধর্ম প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে। মূর্তিপূজকরা বসন্ত রোগের ভয়ে পালালেও খ্রিষ্টানরা মানুষের সেবায় থেকে যায়। ফলে ধর্মান্তর ঘটে। একপর্যায়ে রোমান সম্রাটরাও খ্রিষ্টান হয়ে যান।

স্পার্টা-এথেন্স এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র

ইতিহাস তো অনেক হলো। করোনা সত্যিকার অর্থেই প্রথম বিশ্বায়িত মহামারি। বহু রাষ্ট্র আর আগের মতো থাকবে না। স্পার্টা ও এথেন্সের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ, তার ফয়সালাও করে দিচ্ছে করোনা মহামারি। এই সময়ে ভূরাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে চীন অন্যদের তুলনায় অনেক এগিয়েছে। মহামারিজনিত অর্থনৈতিক সংকটের সুবিধা নিয়ে চীন অনুন্নত দেশগুলোকে নিজের বলয়ে টেনে আনতেও পেরেছে। অন্যদিকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারত বরং মহামারির আঘাতে আরও পিছু হটেছে।

বাংলাদেশেও ঘটছে সমাজ রূপান্তর

ইতিহাস দেখায়, প্রতিটি মহামারির সময়েই সমাজ বিবর্তিত বা পুনর্গঠিত হয়েছে। করোনার এই সময়ে নতুন করে দারিদ্র্যের কবলে পড়েছে প্রায় আড়াই কোটি বাংলাদেশি। দুর্বল হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। অনেকে কাজ হারিয়ে শহর ছেড়েছে। গবেষণা বলছে, শহরের তুলনায় গ্রাম ও কৃষি সামলে নিতে পারছে বেশি। টিকা পাওয়ার কার্ড হয়ে উঠেছে নতুন স্বাস্থ্য পাসপোর্ট। স্বাস্থ্য রাজনীতি ও স্বাস্থ্য-ব্যবসা হয়ে উঠছে মুনাফা ও সংঘাতের বড় ময়দান। মহামারির অর্থনৈতিক ক্ষতি সামলে মধ্যম আয়ের দেশে পুরোপুরি উত্তরণ কঠিন হতে পারে বাংলাদেশের জন্য। জনসংখ্যার সুফল তথা পপুলেশন ডিভিডেন্ড ব্যবহার করে অর্থনৈতিক রূপান্তরের সম্ভাবনা কমে আসছে। ধনী ও গরিবের বৈষম্য মহামারির সময়েই প্রকট হচ্ছে। মহামারির ইতিহাস বলে, স্বজনদের মৃত্যু দেখতে দেখতে, সরকারি অবহেলা সইতে সইতে মানুষের মন কঠিন হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় ব্ল্যাক ডেথ মহামারির সময় অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ ঘটে। মহামারি জয় করা মানুষ দাবি করতে থাকেন আরও অধিকার, আরও স্বাধীনতা। গণতন্ত্র ও জনস্বাস্থ্য যে একে অপরের পরিপূরক, সেটাও মহামারিরই শিক্ষা।

ফারুক ওয়াসিফ, লেখক ও সাংবাদিক।

[email protected]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন