বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১১ এপ্রিল ডোপ টেস্টের সনদ পাননি তারিকুল ইসলাম। তাঁকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ঢাকায় থাকার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই, আত্মীয় বা নিকটজনও নেই। তাঁকে ভোলায় ফিরে যেতে হবে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবার ঢাকায় লঞ্চে যাওয়া–আসা, থাকা–খাওয়া মিলিয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হয়। ডোপ টেস্টের জন্য ৯০০ টাকা দিতে হয়েছে। এ খরচ তাঁর জন্য অনেক বেশি। ভোলায় ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা থাকলে সময় ও অর্থ দুই–ই বাঁচত।

এ সমস্যা শুধু ভোলার তারিকুল ইসলামের একার নয়। গত মাসে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেন্স সেন্টারে মাদক পরীক্ষা করিয়েছেন, এমন একজন চালক প্রথম আলোকে বলেছেন, সহজে পরীক্ষা করাতে পারেননি। লাইন অনেক লম্বা। অনেক ধরাধরি করতে হয়েছে, তারপর কাজটি হয়েছে।

default-image

বিআরটিএর হিসাবে দেশে গাড়িচালক আছেন ৪০ লাখের মতো। এর মধ্যে পেশাদার চালক প্রায় ১৫ লাখ। আবার প্রতিবছর সরকারি চাকরিতে গড়ে ৪০ হাজার মানুষ যোগ দেন। নিজ নিজ জেলায় পরীক্ষা করাতে না পেরে চালক ও চাকরিপ্রার্থীদের ঢাকায় আসতে হচ্ছে। তাঁদের সময় নষ্ট হচ্ছে, আর্থিক চাপে পড়তে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক বিকার তৈরি করে বা শরীরে বল বৃদ্ধি করে এমন ওষুধ, পানীয় বা দ্রব্যের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয় ডোপ টেস্টের মাধ্যমে। রক্ত, প্রস্রাব, থুতু, ঘামের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে তা শনাক্ত করা যায়। নখ ও চুলের নমুনা পরীক্ষা করেও মাদক শনাক্ত হয়।

কেন ডোপ টেস্ট

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য বা গবেষণা না থাকলেও জনমনে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত যে গাড়িচালকদের একটি অংশ মদ বা অন্য কোনো মাদক খেয়ে গাড়ি চালান। অনেক চালক গাড়ি চালানোর সময় বেসামাল থাকেন। ডোপ টেস্টের আওতায় আনলে চালকেরা মাদক কম নেবেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। সরকারি চাকরিজীবীদের কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়েছেন, এমন খবর গণমাধ্যমে এসেছে। সরকার একে গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছে।

২০২০ সালে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গাড়িচালকদের জন্য মাদক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছিলেন। এর আগে ২০১৮ সালে সরকারের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিসিএস ক্যাডার, নন–ক্যাডার—সরকারি যেকোনো চাকরিতে যোগদানের আগে অবশ্যই ডোপ টেস্ট করতে হবে।

গাড়ির কয়েক লাখ চালক ও সরকারি চাকরিপ্রার্থীর ডোপ টেস্ট দরকার। কিন্তু ডোপ টেস্ট করার সক্ষমতা সব হাসপাতালের নেই।

সরকার অনেক ভালো উদ্যোগ নেয়, সিদ্ধান্ত নেয়। ছোটখাটো কারণ, এমনকি নানা অজুহাতে অনেক কিছু বাস্তবায়িত হয় না। গাড়ির চালকেরা সহজে যেন এ সনদ পেতে পারেন, তার জন্য সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা করতে হবে। এটা জরুরি।
ইলিয়াস কাঞ্চন, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান

পরিপত্র ও পরিস্থিতি

এ বছর ১২ জানুয়ারি বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারের সই করা পরিপত্রে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য ৩০ জানুয়ারি থেকে পেশাদার মোটরযানচালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া ও লাইসেন্স নবায়নের আবদনপত্রের সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের ডোপ টোস্ট রিপোর্ট বা সনদ দাখিল করতে হবে। ডোপ টেস্ট রিপোর্ট বা সনদ পজিটিভ হলে (মাদক সেবনের আলামত পাওয়া গেলে) বা তাতে কোনো বিরূপ মন্তব্য থাকলে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হবে না বা লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না।

পরিপত্রে আরও বলা হয়, দেশের সব পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে এবং ঢাকা মহানগরীর ছয়টি প্রতিষ্ঠানে (ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেন্স সেন্টার, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল) ডোপ টেস্ট করতে হবে।

পরীক্ষা কম হচ্ছে

দেশের সব সরকারি হাসপাতালে ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে তাতে কাজ বেশি হয়নি।

কী কাজ হয়েছে তার নমুনা পাওয়া যায় ২২ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে লেখা বিআরটিএর চেয়ারম্যানের একটি চিঠিতে। সারা দেশে কোন কোন বিভাগে, কোন কোন জেলায় পরীক্ষার পরিস্থিতি কী তার হিসাব ছিল ওই চিঠিতে।

ওই হিসাব বলছে, বিআরটিএ ৩০ জানুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ হাজার ৭৮২টি ডোপ টেস্টের আবেদন বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছিল। এর মধ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডোপ টেস্টের রিপোর্ট বা সনদ জমা হয়েছিল ১ হাজার ৮৯৯টি।

তখন পর্যন্ত ২৫ জেলায় ডোপ টেস্ট শুরু হয়নি। অন্য জেলাগুলোতে পরীক্ষা হয়েছে কম। কুষ্টিয়া জেলায় ডোপ টেস্ট করার মতো ব্যবস্থা নেই। রিপোর্ট বা সনদ দাখিল করার মতো সক্ষমতা জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতালে নেই। ফেনী ও খাগড়াছড়ি জেলার সিভিল সার্জনরা জানিয়েছিলেন, পরীক্ষা করার রি–এজেন্ট ওই দুই জেলায় নেই।

ঢাকার মহানগরীর নির্ধারিত ছয়টি হাসপাতালের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডোপ টেস্ট শুরু হয়নি।

অন্যদিকে মাদক পরীক্ষা করার সক্ষমতার ঘাটতির কথা বিআরটিএ–কেও জানানো হয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বিআরটিএর চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতে বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের প্যাথলজি পরীক্ষাগারের ক্ষমতা সীমিত। সেখানে মাত্র দুজন টেকনিশিয়ান। ওই দুজনকে অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগের রোগীর নমুনা ছাড়াও কোভিড–১৯ শনাক্তের জন্য নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। সে কারণে দৈনিক ২০ জন মোটরযানচালকের ডোপ টেস্ট করা সম্ভব।

১১ এপ্রিল অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালের ক্ষমতা সীমিত। হাসপাতালের নিজস্ব রোগীর বাইরে বেশি মানুষের ডোপ টেস্ট করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, মোটরযানচালকদের ডোপ টেস্টের অনেক আবেদন জমা পড়েছে। সেপ্টেম্বরের আগে নতুন কারও নাম নেওয়া সম্ভব নয়।

একটি হাসপাতালের পরিচালক প্রথম আলোকে বলেছেন, হাসপাতালের নিয়মিত ডোপ টেস্টের বাইরে বাড়তি পরীক্ষা করতে হলে বাড়তি জনবল ও কিট দরকার। এ দুটির ব্যবস্থা না করে ডোপ টেস্ট বাড়াতে বলা বাস্তবসম্মত হয়নি।

কী করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

ডোপ টেস্টের কিছু দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের। অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) মো. মাসুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ডোপ টেস্টের বিষয়ে একটি বিধিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। ডোপ টেস্ট বিষয়ে একটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের ২২টি জেলায় ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা হবে।

মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের অধীনে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা আছে। সেখানে টেকনিশিয়ান মাত্র একজন। দিনে গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের ডোপ টেস্ট করা হয়। তবে দিনে সর্বোচ্চ ৫০টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব বলে কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কোন মাদকের পরীক্ষা

২০১৯ সালে পাঁচ ধরনের মাদকদ্রব্য পরীক্ষার জন্য পরিপত্র জারি করেছিল সরকার। এর মধ্যে আছে বেনজোডায়াজেপিন (ঘুমের ওষুধ), অ্যামফেটামিন (ইয়াবা), অপয়েটস (হেরোইন, মরফিন, কোকেন), ক্যানাবাইনয়েডস (গাঁজা) এবং অ্যালকোহল (মদ)। প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করে দু–তিন ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল জানিয়ে দেওয়া সম্ভব।

একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, প্রথম চারটি মাদকদ্রব্য পরীক্ষার কিট তাদের আগে থেকেই ছিল। কিন্তু অ্যালকোহল পরীক্ষার জন্য পৃথক কিটের দরকার হয়। বাজারে এ কিটের সরবরাহ কম। তাই একসঙ্গে পাঁচটি পরীক্ষা তাঁরা করতে পারছেন না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক আহমেদুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, অ্যালকোহল পরীক্ষার কিটের স্বল্পতা আছে। এ কারণে সরকারি অধিকাংশ হাসপাতাল এ পরীক্ষা করতে পারছে না। বেসরকারি হাসপাতালে এ পরীক্ষা চালু হলে মানুষের হয়রানি কম হবে। তিনি আরও বলেন, অ্যালকোহল পরীক্ষার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে। অ্যালকোহল বেশি সময় মানুষের শরীরে থাকে না। পুলিশ চালকের শ্বাসপ্রশ্বাস পরীক্ষা করে অ্যালকোহল শনাক্ত করতে পারে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিআরটিএর সঙ্গে কথা বলা হবে।

চলমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে বলেও জানিয়েছে একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ক্যানাবাইনয়েডস বা গাঁজা ছাড়া অন্য মাদকদ্রব্য সেবন বা খাওয়ার ৭২ ঘণ্টা পর পরীক্ষা করলে তা শনাক্ত হয় না। গাঁজা ছয় মাস পরেও শনাক্ত হয়। মদ ৪৮ ঘণ্টা পরে শনাক্ত হয় না। নমুনা পরীক্ষার কাগজ জমা দেওয়ার এক থেকে দেড় মাস বা তার বেশি সময় পর নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। যার নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে, তিনি এই সময়ের মধ্যে মাদক নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। একজন কর্মকর্তা বলেছেন, পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে কার নমুনা দেওয়া হচ্ছে, তা দেখার ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া নতুন কিছু মাদক আছে, যা শনাক্তের ব্যবস্থা নেই।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, সরকার অনেক ভালো উদ্যোগ নেয়, সিদ্ধান্ত নেয়। ছোটখাটো কারণ, এমনকি নানা অজুহাতে অনেক কিছু বাস্তবায়িত হয় না। গাড়ির চালকেরা সহজে যেন এ সনদ পেতে পারেন, তার জন্য সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা করতে হবে। এটা জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন