মানিকগঞ্জে মৌসুমি কৃষিশ্রমিকের হাট

এখন বোরো মৌসুম হওয়ায় মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শ্রমিকের হাট জমজমাট। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মৌসুমি শ্রমিকেরা কাজ করতে এখানে এসেছেন। ছবিটি গতকাল সকাল আটটার দিকে তোলা l প্রথম আলো
এখন বোরো মৌসুম হওয়ায় মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শ্রমিকের হাট জমজমাট। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মৌসুমি শ্রমিকেরা কাজ করতে এখানে এসেছেন। ছবিটি গতকাল সকাল আটটার দিকে তোলা l প্রথম আলো

ভোরের আলো ফোটার আগেই মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শ্রমিকের হাটে কয়েক শ মানুষের জটলা। জমির মালিকেরাও দরদাম করে শ্রমিকদের নিতে এখানে আসেন। বোরো মৌসুম হওয়ায় শ্রমিকদের ভিড়ে এখন জমজমাট এই হাট।

কয়েকজন জমিমালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার পাশেই মানিকগঞ্জ। এখানকার অভাবী মানুষ জীবিকার তাগিদে ঢাকা বা আশপাশের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন। কেউ কেউ রিকশা চালিয়ে, কেউবা ফুটপাতে ব্যবসা করে সচল রাখেন সংসারের চাকা। এ কারণে বোরো আবাদের সময় জেলায় স্থানীয় শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়। এ সময় দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হাজারো মৌসুমি কৃষিশ্রমিক আসেন মানিকগঞ্জের শ্রমের হাটে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রায় ১০ বছর ধরে গড়ে উঠেছে শ্রমের হাট। নবীন সিনেমা হলের সামনে থেকে হকার্স মার্কেট পর্যন্ত ভোর থেকে বসে শ্রম বিক্রির হাট। এখান থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকার জমির মালিকেরা দরদাম করে শ্রমিকদের কাজে নিয়ে যান। এখন বোরা ও পাট চাষের মৌসুম চলায় মৌসুমি শ্রমিকদের পদচারণায় জমজমাট শ্রমের হাট।

গতকাল রোববার ওই হাটে গিয়ে দেখা যায়, ভোর পাঁচটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত জমে শ্রমের হাট। তবে সময় যত বাড়তে থাকে, শ্রমিকের সংখ্যা ততই কমতে থাকে। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, গাইবান্ধা, বগুড়া, পঞ্চগড় ও রংপুরের শ্রমিকেরা এখানে এসেছেন কৃষিকাজের সন্ধানে। তবে এখানে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চরাঞ্চলের দু-একজন শ্রমিককেও পাওয়া যায়। অন্য জেলা থেকে যাঁরা আসেন, তাঁরা বেশি দিনের জন্য কাজে চুক্তিবদ্ধ হন। বর্তমানে এখানে একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা মজুরি পান।

মানিকগঞ্জের শিবালয়ের কিতাব আলী, সদরের হামেদ আলীসহ আরও ১০-১২ জন জমির মালিককে শ্রমিকদের কাজে নিতে দেখা যায়। এ সময় কথা হলে কিতাব আলী বলেন, ছয় বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন। জমির আগাছা পরিষ্কারের জন্য চারজন শ্রমিককে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিজনকে দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরি ও তিন বেলা খাবার দেওয়া হবে।

সকালে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার জোতনশী গ্রামের আবদুল গফুরের (৪৫) সঙ্গে কথা হয় হাটে। তিনি বললেন, বৈশাখ মাসের শেষের দিকে তাঁর এলাকায় গাছ থেকে আম পাড়ার কাজ শুরু হয়। এখন এলাকায় কাজ নেই।

নাটোরের লালপুর উপজেলার রামপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ আবদুর রাজ্জাকও এসেছেন হাটে। তাঁর চার ছেলেই বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। সন্তানেরা দেখভাল না করায় তিনি হাটে এসেছেন শ্রম বিক্রি করতে। তিনি বলেন, ‘বাড়িত বিবি (স্ত্রী) আছে। ছেলেপুলে খোঁজ নেয় নে, খাবার-দাবার দেয় নে। এলাকাত কাজও নাই। বুড়ো বয়সে কাজ খুঁজতে হইচ্ছে।’

মাঝেমধ্যে বিড়ম্বনারও শিকার হতে হয় শ্রমিকদের। কয়েকজন শ্রমিকে জানান, কাজ না পেলে রাতের বেলায় বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ফুটপাতে বা যাত্রীছাউনিতে থাকতে হয়। কখনো কখনো ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়তে হয়। এ ছাড়া কোনো কোনো জমির মালিক চুক্তির তুলনায় মজুরিও কম দিয়ে থাকেন।

ওই হাটে কথা হয় সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার চর অর্জুনা গ্রামের আক্কাস আলী ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ গ্রামের লেঙ্গারহাট গ্রামের আনজু শেখের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, তাঁদের এলাকায় এখন কাজ নেই। প্রতিবছর এই সময়ে তাঁরা এই অঞ্চলে ধান কাটা, আগাছা পরিষ্কারের জন্য আসেন। এ সময় কৃষিশ্রমিকের মজুরিও বেশি থাকে। এক মাস কাজ করলে খেয়েদেয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা নিয়ে তাঁরা বাড়ি ফিরতে পারেন।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুল্লাহ সরকার বলেন, মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকাসহ অন্যান্য এলাকায় রাতের বেলায় পুলিশ নিয়মিত টহল দেয়। শুধু এসব শ্রমিকের জন্য নয়, রাতের বেলায় যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।