বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিচারের ধীরগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর বিমল সমাদ্দার প্রথম আলোকে বলেন, নানাবিধ কারণে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা মামলার বিচার বেশি দূর এগোয়নি। তবে এখন সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষে যা যা পদক্ষেপ দরকার, সেটি করা হচ্ছে।

রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৫ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন আরও ১ হাজার ১৬৯ জন। এ ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে অবহেলাজনিত মৃত্যু চিহ্নিত হত্যা মামলাটি করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে অপর মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে। এই তিন মামলার কোনোটিরই বিচার শেষ হয়নি।

হত্যা মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত দুই আসামি মারা যাওয়ায় মামলা থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মামলার বর্তমান আসামির সংখ্যা ৩৯। এর মধ্যে কারাগারে আছেন কেবল রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা। পলাতক সাতজন। জামিনে আছেন ৩১ জন আসামি। অবশ্য পাঁচ বছর আগে সম্পদের হিসাব না দেওয়ার মামলায় সোহেল রানার তিন বছর কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত।

রানা প্লাজা ধসে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে। আর ইমারত আইনের মামলার বিচারে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ এম আমিন উদ্দিন, অ্যাটর্নি জেনারেল

এ মামলার আসামিদের মধ্যে আছেন রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক ও মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার সাবেক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাইট ইঞ্জিনিয়ার সরোয়ার কামাল, সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র রেফায়েত উল্লাহ, পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খান, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের তৎকালীন পরিদর্শক (প্রকৌশল) মো. ইউসুফ আলী, ঢাকা বিভাগের তৎকালীন পরিদর্শক (প্রকৌশল) মো. শহিদুল ইসলাম, সাবেক উপপ্রধান পরিদর্শক মো. আবদুস সামাদ এবং উপপ্রধান পরিদর্শক (সাধারণ, ঢাকা বিভাগ) মো. জামশেদুর রহমান প্রমুখ।

সাভারের রানা প্লাজার ছয়তলার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন ঝুমা খাতুন। ৯ বছর ধরে তাঁর খোঁজ মেলেনি। ঝুমার ভাই আনোয়ার হোসেন গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মা আনোয়ারা বেগম আজও অপেক্ষায় আছেন, আমার বোন ঝুমা বাসায় ফিরে আসবে। কিন্তু আমরা জানি, ঝুমা আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। সোহেল রানাসহ যাদের কারণে আমার বোনসহ এত শ্রমিক মারা গেল, তাদের সবার ফাঁসি চাই।’

রানা প্লাজা ধসের ঘটনার মামলাগুলোর বিচার প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, রানা প্লাজা ধসে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে। আর ইমারত আইনের মামলার বিচারে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রানার দম্ভোক্তি, ‘১০০ বছরেও রানা প্লাজা ভেঙে পড়বে না’

অভিযোগপত্রের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টায় সাভারের রানা প্লাজা ভবনের তৃতীয় তলায় পিলার ও দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। খবর পেয়ে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর কর্মকর্তারা রানা প্লাজা ভবনে যান। পোশাক কারখানার মালিকদের পরামর্শ দেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভবন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা পর্যন্ত সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে। কিন্তু পাঁচ পোশাক কারখানার মালিক ও তাঁদের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে পরদিন (২৪ এপ্রিল) শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেন। এর সঙ্গে যোগ দেন রানা প্লাজা ভবনের মালিক খালেক ও তাঁর ছেলে সোহেল রানা। সোহেল রানা সেদিন বলেছিলেন, ‘আগামী ১০০ বছরেও রানা প্লাজা ভেঙে পড়বে না।’

অভিযোগপত্রে বলা হয়, রানা প্লাজা তৈরির প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন ভবনটির মালিক ও তাঁর ছেলে, যা রানা প্লাজা ভবনকে একটি মৃত্যুকূপে পরিণত করে। এই ভবনে পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল। এসব কারখানায় বসানো হয় বৈদ্যুতিক ভারী জেনারেটর, ভারী সুইং মেশিন। রানা প্লাজা ধসের আগের দিন ভবনের তৃতীয় তলায় ফাটল দেখা দেয়। কিন্তু মালিকপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা না করে পরদিন পাঁচটি পোশাক কারখানা চালু করে। ঘটনার দিন সকাল ৯টায় রানা প্লাজায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন একসঙ্গে পোশাক কারখানাগুলো তিনটি জেনারেটর চালু করে। ঠিক তখনই রানা প্লাজা ভবন বিকট শব্দ করে ধসে পড়ে।

ইমারত আইনে মামলার বিচার স্থগিত

ভবন নির্মাণে ত্রুটি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে করা ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় রানা প্লাজার সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরের বছর (২০১৬ সাল) ১৪ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালত। তবে ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আসামি রিভিশন আবেদন করেন। সিজেএম আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে গেলে গত বছরের ৮ নভেম্বর স্থগিতাদেশ আসে। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার না হওয়ায় সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

এ ছাড়া রানা প্লাজা ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতির মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম চলছে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে। ২০১৭ সালের ২১ মে সোহেল রানাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। মাত্র ১৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ হয়েছে।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ৯ বছর পরও বিচার প্রাথমিক ধাপে থাকার তথ্য জানার পর এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেন বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক ও শ্রমিকনেত্রী কল্পনা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এত বছর পরও যদি বিচার প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে, তাহলে বিচার শেষ হবে কবে? এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ তথা সরকারের যদি ন্যূনতম তৎপরতা থাকত, তাহলে এত দিনে বিচার শেষ হয়ে যেত। এই বিচার শেষ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও প্রশ্ন তুলছেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন