বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুধু রোটেশন নয়, নতুন লঞ্চ নামানোর ক্ষেত্রেও মালিকেরা বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন কোনো মালিকের পক্ষে নির্দিষ্ট রুটে লঞ্চ নামানো কঠিন। কারণ, মালিকেরা চান না, প্রতিযোগিতা তৈরি হোক।

এর ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রীরা। তাঁরা বলছেন, লঞ্চমালিকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার অভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। গাদাগাদি করে ওঠানোয় যাত্রীসেবার মান খারাপ হয়। লঞ্চ চলাচলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। যাত্রীদের অভিযোগ, মালিকদের এই রোটেশন প্রথা ও লঞ্চে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নেওয়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তাদের অজানা নয়। তাঁরা বরং জেনেশুনে সুযোগটি দেন। এর বদলে আর্থিক সুবিধা নেন।

বিআইডব্লিউটিএকে রুট পারমিট দিতে হবে যাত্রীসংখ্যার সঙ্গে সংহতি রেখে। রুট পারমিট দেওয়ার পর কত লঞ্চ চলবে, তা মালিক সমিতি নির্ধারণ করে, এটা আইনসম্মত নয়। বিআইডব্লিউটিএ যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে যাত্রীদের দুর্ভোগ হবে না।
গোলাম রহমান, ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান

যাত্রীরা এর প্রমাণ দিচ্ছেন ঝালকাঠিতে সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ নামের লঞ্চের অগ্নিদুর্ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনে। তাঁরা বলছেন, এই লঞ্চে যাত্রী ছিল প্রায় ৮০০ জন। অথচ বিআইডব্লিউটিএর সদরঘাটের পরিবহন পরিদর্শক লঞ্চটি ছাড়ার আগে অনুমোদনপত্রে লিখে দিয়েছিলেন, এতে ৪২০ জন যাত্রীর ধারণক্ষমতার (রাত্রিকালীন) বিপরীতে যাত্রী আছে ৩১০ জন। কেউ কেউ এ–ও বলছেন যে অভিযান-১০ লঞ্চে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী না থাকলে এত মানুষের মৃত্যু হতো না।

২০১৭ সালে রোটেশন প্রথা বাতিলের দাবিতে ভোলায় একটি মানববন্ধন হয়েছিল। এতে অংশ নিয়েছিলেন জেলার সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী। তিনি গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, লঞ্চ কম চলার কারণে গাদাগাদি করে যাত্রীদের যাতায়াত করতে হয়। বেশির ভাগ সময় কেবিন পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে প্রভাবশালীদের দিয়ে তদবির করিয়ে কেবিন নিতে হয়। তিনি বলেন, রোটেশন প্রথার কারণে যাত্রীর ব্যয় বেশি হয় এবং ঝুঁকি তৈরি করে।

উল্লেখ্য, ঢাকা-ভোলা রুটে ছয়টি লঞ্চের রুট পারমিট আছে। তিনটি করে লঞ্চ প্রতিদিন উভয় প্রান্ত থেকে ছাড়ার কথা। কিন্তু ছাড়া হয় দুটি করে।

কত লঞ্চ, কত চলে

বিআইডব্লিউটিএর হিসাবে, সদরঘাট থেকে ৪৪টি নৌপথে চলাচলের জন্য ২২২টি যাত্রীবাহী লঞ্চের রুট পারমিট রয়েছে। এসব লঞ্চ নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার পথে বিভিন্ন জায়গায় থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করায়। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে রুট পারমিটের হিসাব ও আগমন-নির্গমন নিবন্ধন সংগ্রহ করে এবং স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দু-একটি অগুরুত্বপূর্ণ পথ ছাড়া বাকি রুটের কোনোটিতেই নির্ধারিত সংখ্যক লঞ্চ একই দিনে চলে না।

সবচেয়ে বেশি লঞ্চ চলে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে। এই পথে রুট পারমিট আছে ১৭টি লঞ্চের। মানে হলো, দিনে অন্তত আটটি করে লঞ্চ ঢাকা ও বরিশাল থেকে ছাড়বে। তবে ছাড়ে ছয় থেকে সাতটি লঞ্চ। ঢাকা-বরিশাল রুটের নিয়মিত লঞ্চ যাত্রী আল-নাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, লঞ্চে একটি কেবিনের জন্য তদবির করতে হবে, দালাল ধরে দুই থেকে তিন শ টাকা বেশি দিতে হবে—এটা কোনো কথা হতে পারে না।

ঢাকা থেকে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া পথে রুট পারমিট আছে চারটি লঞ্চের। প্রতিদিন দুটি করে লঞ্চ উভয় প্রান্ত থেকে ছাড়ার কথা। কিন্তু ছাড়ে একটি করে। ঢাকা থেকে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ (ভাসানচর) রুটের অবস্থাও একই। এই পথে ৪টি লঞ্চের রুট পারমিট থাকলেও চলাচল করে উভয় প্রান্ত থেকে একটি করে। একটি পুড়ে যাওয়ার আগে ঢাকা-বরগুনা রুটে রুট পারমিট ছিল ছয়টি লঞ্চের। দিনে চলে দুটি করে চারটি।

কেন এই রোটেশন প্রথা তা জানতে চাওয়া হয়েছিল লঞ্চমালিকদের সংগঠন অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাপ) সংস্থার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন আহমেদের কাছে। তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য না দিয়ে নতুন লঞ্চ নামানো নিয়ে কথা বলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশে কোন রুটে কয়টি লঞ্চ চলবে, তার কোনো মাপকাঠি নেই। কারও কাছে টাকা থাকলেই যদি লঞ্চ নামিয়ে দেন, তাহলে তো কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মালিক সমিতির এই নেতা প্রশ্ন করেন, যাত্রী বেশি হলে যদি নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে ঈদের সময় কীভাবে লঞ্চ চলাচল করে। উল্লেখ্য, ঈদের মৌসুমে লঞ্চে যাত্রী এত বেশি নেওয়া হয় যে পা ফেলার জায়গা থাকে না।

মালিকদের এই যুক্তির জবাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি লঞ্চে যাত্রী ধারণক্ষমতা কত, সেটা নির্ধারণ করা হয় ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে নৌযান ডুবে যাওয়ার ঘটনা দেশে অনেক আছে।

লঞ্চের সংখ্যা যেভাবে নির্ধারিত হয়

যাত্রীবাহী লঞ্চকে এক বছরের জন্য রুট পারমিট ও চলাচলের সময়সূচির অনুমোদন দেয় বিআইডব্লিউটিএ। রুট পারমিট দেওয়ার শর্তে বলা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে লঞ্চ বন্ধ রাখলে এবং সময়সূচি অনুযায়ী লঞ্চ পরিচালনায় ব্যর্থ হলে অনুমোদন বাতিল করা হবে। অবশ্য বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানিয়েছে, রোটেশন প্রথায় মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী চালানোর কারণে কোনো লঞ্চের নিবন্ধন, সার্ভে সনদ বাতিল বা কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই।

কোনো রুটে নতুন লঞ্চের রুট পারমিট দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রুটটির যাত্রী পরিবহন বিষয়ে জরিপ করা যেতে পারে বলে বিধান রয়েছে। মালিকদের দাবি, বিআইডব্লিউটিএ ঠিকমতো জরিপ না করেই রুট পারমিট দিয়ে দেয়। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএর এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, মালিকেরাই চাপ তৈরি করে অপ্রয়োজনীয় রুট পারমিট নেন। কিন্তু যেসব রুটে যাত্রীর চাপ রয়েছে, সেসব রুটে নতুন লঞ্চের অনুমোদন না দিতে চাপ তৈরি করেন।

অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন (নৌরুট পারমিট, সময়সূচি ও ভাড়া নির্ধারণ) বিধিমালায় বলা হয়েছে, রুট পারমিটের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ প্রয়োজনে মালিক সমিতির পরামর্শ নিতে পারবে। এই বিধানের সুযোগ নিয়ে মালিকেরা বিআইডব্লিউটিএকে চাপে রাখেন বলে দাবি করেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, নতুন কোনো বিনিয়োগকারী লঞ্চ নামানোর আগে মালিক সমিতির কাছ থেকে পূর্বসম্মতি পাওয়ার চেষ্টা করেন। নইলে নামাতে পারেন না।

বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা হিসাব করি সার্ভিস দিয়ে (এক দিনে কয়টি লঞ্চ ছাড়বে)। এখন যে মালিকদের লঞ্চ আছে, তাঁরাই লঞ্চ বাড়ান। বাইরের লোক কম।’ উল্লেখ্য, বিআইডব্লিউটিএর এই ‘সার্ভিসে’র হিসাব নিয়ে প্রশ্ন আছে। যেমন ঢাকা-ভান্ডারিয়া রুটে ‘সার্ভিস’ আছে ছয়টি। এর বিপরীতে লঞ্চ থাকার কথা ১২টি। আছে ৯টি। চলে দৈনিক উভয় প্রান্ত থেকে দুটি করে চারটি।

‘ঘুষ দিয়ে’ বেশি যাত্রী

লঞ্চে যাত্রীরা চলাচল করেন তিনভাবে। কেবিন, চেয়ার ও সাধারণ ডেক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লঞ্চে কেবিন চাইলেই পাওয়া যায় না। হয় অনেক আগে বুকিং দিয়ে রাখতে হয়, নয়তো দালালদের ধরে বাড়তি টাকা দিয়ে কেবিন নিতে হয়। সাধারণ যাত্রীদের জন্য আগে থেকে টিকিট কাটার কোনো ব্যবস্থা নেই। লঞ্চ ছাড়ার পর টিকিট দিতে আসেন মালিকপক্ষের কর্মীরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই ব্যবস্থার কারণে একটি লঞ্চে কত যাত্রী উঠল, এর কোনো হিসাব থাকে না। লঞ্চ ছাড়ার আগে বিআইডব্লিউটিএর পরিদর্শক নামকাওয়াস্তে যাত্রীর একটি হিসাব লিখে দেন, যেখানে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী দেখানো হয় না। অভিযোগ আছে, এই অনিয়মের বিনিময়ে লঞ্চের কাছ থেকে ঘুষ নেন বিআইডব্লিউটিএর পরিদর্শক।

ঝালকাঠিতে আগুনে পুড়ে যাওয়া অভিযান-১০ লঞ্চে যাত্রীসংখ্যা কম দেখানোর অভিযোগের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর সদরঘাটের পরিবহন পরিদর্শক দিনেশ কুমার সাহা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনিই লিখে দিয়েছিলেন লঞ্চটিতে ৩১০ জন যাত্রী আছে। কোনো ত্রুটি নেই। যদিও পরে দেখা যায়, যাত্রী অনেক বেশি ছিল।

বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক এ অভিযোগের বিষয়ে গত রোববার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অবশ্য যাত্রীরা বলছেন, প্রতিটি লঞ্চেই ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী নেওয়া হয়। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোর সময় কেবিনের সামনের হাঁটার জায়গায় ও ছাদে যাত্রী নেওয়া হয়।

কাউন্টার দিয়ে টিকিট বিক্রি করলে বেশি যাত্রী নেওয়ার সুযোগ থাকে না। অভিযোগ আছে, এ কারণে কাউন্টার ব্যবহার করেন না মালিকেরা। বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদী বন্দরের তথ্যমতে, সদরঘাটে মোট ৩২টি টিকিট কাউন্টার রয়েছে। এগুলো বরাদ্দ নিয়েও কোনো কোম্পানি তা ব্যবহার করেনি। গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেসার্স এম কে শিপিং লাইনস নামের একটি কোম্পানি শুধু একটি কাউন্টার ব্যবহার করছে। বাকি কাউন্টারের বেশির ভাগই পরিত্যক্ত ও ভবঘুরেদের ঘুমানোর জায়গা।

সার্বিক বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিআইডব্লিউটিএকে রুট পারমিট দিতে হবে যাত্রীসংখ্যার সঙ্গে সংহতি রেখে। রুট পারমিট দেওয়ার পর কত লঞ্চ চলবে, তা মালিক সমিতি নির্ধারণ করে, এটা আইনসম্মত নয়। বিআইডব্লিউটিএ যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে যাত্রীদের দুর্ভোগ হবে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন