বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ নগরকেন্দ্রিক আইস সেবনকারী একটা শ্রেণি তৈরি হয়েছে। আইসের বহুবিধ ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই মাদক সরাসরি সেবন করা যায়। আবার এটি ইয়াবা তৈরিরও মূল উপাদান। ইয়াবায় ৫ শতাংশ আইস থাকে। সরাসরি আইস সেবনে ইয়াবার চেয়ে ২০ গুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আবার অন্যান্য মাদকের সঙ্গে মিশিয়েও আইস সেবন করা হয়। এক তরুণ ২০১৯ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ল্যাব স্থাপন করে আইস দিয়ে পরীক্ষামূলক নতুন ধরনের মাদক তৈরির চেষ্টাও করেছিল। হাসিব বিন মোয়াম্মার রশিদ নামের ওই তরুণকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গ্রেপ্তার করে। এরপর জানা যায়, এই কাজে নাইজেরিয়ার এক নাগরিক তাঁকে সহায়তা করছিলেন।

এ ছাড়া গত তিন বছরে আইস ছাড়াও আরও কয়েক ধরনের অপ্রচলিত মাদক ধরা পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেনইথাইলামিন (দেখতে কোকেনের মতো), এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড), ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন বা ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম এবং খাত (ইথিওপিয়ার উঁচু ভূমিতে জন্মানো একধরনের উদ্ভিদের পাতা)। খাত ছাড়া বাকিগুলো কৃত্রিম মাদক। এসব মাদক বিভিন্ন দেশ থেকে নানাভাবে এ দেশে এসেছে।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যসেবা দাতা সংস্থা হেলথ ডাইরেক্ট অস্ট্রেলিয়ার তথ্যমতে, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ খুবই ভয়ংকর মাদক। অ্যামফিটামিন গোত্রের এই মাদক দেখতে স্বচ্ছ কাচের (ক্রিস্টাল) মতো। এই মাদক সেবনে নিদ্রাহীনতা, স্মৃতি বিভ্রম, মস্তিষ্কবিকৃতিসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে এই মাদক সেবনে ওজন হারানো, কিডনি ও হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা এবং বিষণ্নতা ও স্ট্রোকের মতো বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।

ডিএনসি ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০ আগস্ট আইস সেবন ও বিক্রির অভিযোগে রাজধানীর বনানী, উত্তরা, বনশ্রী ও খিলগাঁও থেকে ১০ জনকে ৫০০ গ্রাম আইসসহ গ্রেপ্তার করা করেছে ডিএনসি। ১৭ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও যাত্রাবাড়ী থেকে আধা কেজি আইস, ৬৩ হাজার ইয়াবাসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। দুটি চালানে উদ্ধার হওয়া আইস মিয়ানমার থেকে দেশে এসেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বে আইস পুরোনো মাদক। এটি বাংলাদেশে এত দিন ছিল না। হঠাৎ করে দেশে এর ব্যবহার কেন বেড়ে যাচ্ছে, এ বিষয়ে নজরদারি শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, আইস দিয়ে গোপনে ইয়াবা বানানো হচ্ছে নাকি সরাসরি আইস মাদক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসাবারেও এর ব্যবহার হতে পারে। মিয়ানমারে আইস ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হয়।

এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘এ দেশে আইস প্রথমে আসছিল মালয়েশিয়া থেকে, পরে আফ্রিকা থেকে। এখন মিয়ানমার থেকে আসছে। এটা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। ব্যাপকসংখ্যক মানুষ আসক্ত হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে আইসের ১৪টি চালান ধরা পড়েছে। সবচেয়ে বেশি, ৮টি চালান ধরা পড়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। ঢাকায় ধরা পড়ে ৫টি চালান। এর বাইরে পিরোজপুরে একটি চালান ধরা পড়ে। এসব চালানের মধ্যে তিনটি চালান এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। মালয়েশিয়া থেকে আকাশপথে বা কুরিয়ারে এসব চালান আসে বলে জানা গেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুস সবুর মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, আইসসহ বিভিন্ন মাদক কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এ নিয়ে আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। চলতি মাসে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠক করে বিভিন্ন দিকনির্দেশনাও দিয়েছে। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা জাল ছড়িয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে আভিযানিক কাজ বাড়ানো হয়েছে। এর সুফলও মিলছে। নতুন নতুন মাদক নিয়ে যাঁরা আসছেন, তাঁরা ধরা পড়ছেন।

ডিএনসির কর্মকর্তারা জানান, দেশে একসময় মাদক হিসেবে ফেনসিডিলের ব্যাপক বিস্তার ছিল। একপর্যায়ে ইয়াবা এসে ফেনসিডিলকে ছাড়িয়ে যায়। ইয়াবার প্রসার হলেও ফেনসিডিল আসা বন্ধ হয়নি। ফেনসিডিলের মূল উৎস ভারত। সম্প্রতি ফেনসিডিলের বিকল্প মাদক এস্কাফ নামের একটি সিরাপ ভারত থেকে আসছে। সাম্প্রতিকালে সীমান্তবর্তী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও ফেনীতে এস্কাফের অনেকগুলো চালান ধরা পড়েছে। ঢাকায় গত ২৫ জুন একটি চালান ধরা পড়ে।

করোনাকালে বিভিন্ন কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও মাদক চোরাচালান কমেনি, বরং বেড়েছে। জরুরি পণ্য পরিবহনের ট্রাক, লাশবাহী গাড়ি, তেলের লরি, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এসব মাদক পরিবহনের সময় ধরাও পড়েছে। ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৩ কোটি ৮৪ লাখের মতো ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এর আগের বছর ২০১৯ সালে উদ্ধার করা হয়েছিল ৩ কোটি ৪৪ লাখ ইয়াবা।

কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত মিয়ানমার থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে এ দেশে ইয়াবা আসে। অনেক দিন ধরেই ইয়াবার বিস্তার সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন নতুন করে আসছে আরও ভয়ংকর মাদক আইস। এটি এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আরও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মাদকবিষয়ক গবেষক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এম ইমদাদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে মাদক ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি বহুলাংশে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা মাদক পাচারে বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। এ কারণে মাদক চোরাচালান রোধে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা কার্যক্রম তদারকি জোরদার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইন্টারপোল এবং জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর—ইউএনওডিসির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন