পর্ব: ৩০

মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ী-মানিকগঞ্জে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও লুটতরাজ

বিজ্ঞাপন
>
default-image

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যাকাণ্ড চালায়। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বিশ্বে নজিরবিহীন। এখনো আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি মেলেনি। বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার শিকার হয় ৩০ লাখ মানুষ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায় এ হত্যাকাণ্ড চলে। বধ্যভূমিতে অসংখ্য মাথার খুলি, হাড়গোড় ও চুল পাওয়া গেছে। ৬৪ জেলার গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ধারাবাহিকভাবে থাকবে প্রথম আলোর নাগরিক সংবাদে। আজ থাকছে রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জের গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

রাজবাড়ী
কালুখালী রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশের বধ্যভূমি
কালুখালী রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশের বধ্যভূমিতে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়। এ সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট (অব.) আকামত আলী মণ্ডল বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় কালুখালী রেলস্টেশনের ওই স্থানে একটি বড় খাল ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ওই খালে ফেলত।

লোকোশেড বধ্যভূমি
রাজবাড়ীর লোকোশেড এলাকা ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে হত্যা করে লোকোশেডের পুকুরে ফেল দেওয়া হতো। তখন রাজবাড়ী রেলস্টেশন দিয়ে বেশ কয়েকটি ট্রেন চলাচল করত। ট্রেন রাজবাড়ী রেলস্টেশনে থামলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা বগিতে থাকা যাত্রীদের সন্দেহ হলে ধরে লোকোশেড ক্যাম্পে নিয়ে আসত। তারপর নির্যাতন করে হত্যার পর পুকুরে ফেলে দিত।

গোয়ালন্দের গণহত্যা
১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল সকাল নয়টার দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে গোয়ালন্দের উজানচরের বাহাদুরপুর ঘাটে আসে। এখানে মুক্তিযোদ্ধা ও সম্মিলিত জনতা তাদের বাধা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন আনছার কমান্ডার ফকির মহিউদ্দিন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘাট দখল করে অদূরে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে প্রবেশ করে গ্রামের ২১ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর অবাঙালি বিহারি ও রাজাকাররা ব্যাপক লুটপাটের পর গ্রামটি জ্বালিয়ে দেয়।

ছোটভাকলার বালিয়াকান্দি গ্রামে গণহত্যা
ছোটভাকলার বালিয়াকান্দি গ্রামে ২৭ এপ্রিল কুখ্যাত বিহারি সাইদ, ইউনুছ, সামিমসহ ১৫ থেকে ২০ জনের সশস্ত্র একটি দল স্থানীয় জমিদার যামিনী রঞ্জন রায়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে জমিদারের শ্যালক হরেকৃষ্ণ, পার্শ্ববর্তী জমিদার মুহিত কুমার সাহার ছেলে মৃগেন্দ্র নাথ সাহা, জমিদারবাড়িতে আশ্রয় নেওয়া স্কুলপণ্ডিত পরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী ও পণ্ডিতের ভায়রাকে (অজ্ঞাত) গুলি করে হত্যা করে। এরপর বিহারিরা জমিদারবাড়িতে ব্যাপক লুটপাট চালায়। বিহারিরা চলে যাওয়ার পর রাত ১০টার দিকে স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আবদুল আজিজ শিকদার ও অনীল চন্দ্র বৈরাগী লাশ চারটিকে জমিদার বাড়ির পেছনে গর্ত করে পুঁতে রাখেন।

পাংশার তারাপুর ব্রিজ বধ্যভূমি
১৯৭১ সালের ২১ মে পাংশার বাবুপাড়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর বাহিনী এলাকার নিরীহ ৩৬ জনকে হত্যা করে রেলব্রিজের নিচে পুঁতে রাখে। পাংশার বধ্যভূমি সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধা চাঁদ আলী খান জানান, সেদিন ছিল ২১ মে। পাকিস্তান বাহিনী রেলগাড়িতে করে এসে নামে মাচপাড়া রেলস্টেশনে। এরপর পশ্চিম পাশে মথুরাপুর, কালিনগর ও রামকোল বাহাদুরপুর গ্রামে ঢুকে বাড়িঘর জ্বালিয়ে–পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। এদের সঙ্গে মিলিশিয়া, বিহারি, রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকেরাও যোগ দেয়। গ্রামগুলো থেকে ৩৬ জন নিরীহ মানুষকে ধরে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে তারাপুর রেলব্রিজের কাছে নিয়ে আসে। তাদের মধ্যে তখনো কেউ কেউ বেঁচে ছিলেন। তখন ছিল বর্ষাকাল। ব্রিজের নিচ দিয়ে স্রোত বইছিল। নরপশুরা ওই ৩৬ জনের সবাইকে ব্রিজের নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করে। এ ছাড়া মাচপাড়া রেলস্টেশনের কাছে ইন্দারার মধ্যেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী মানুষকে হত্যা করে ফেলে দেয়, যাদের একজন ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হরেন্দ্রনাথ সরকার। তাঁকে হত্যা করে ইন্দারার মধ্যে ফেলা দেওয়া হয়।

কালুখালীর মালিয়াট বধ্যভূমি
কালুখালীর মালিয়াট বধ্যভূমিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্থান থেকে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে সেখানে ফেলে রাখত।

কল্যাণপুরের গণহত্যা
রাজবাড়ী সদরের কল্যাণপুরে প্রায় ১০০ পরিবারের বিহারি কলোনি ছিল। তাদের অত্যাচারে এলাকার লোকজন অতিষ্ঠ ও ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ২১ এপ্রিলের আগে এক রাতে এলাকার লোকজন বিহারি কলোনি ঘিরে ফেলে। ওই বিহারিরাই আশু সেনের বাড়িতে গণহত্যা চালায় এবং কল্যাণপুরে নৃশংসভাবে বহু নিরীহ লোককে হত্যা করে। তথ্য পাওয়া যায়, এখানে নৃশংসভাবে ২৫ জনকে হত্যা করে।

উজানচর গণহত্যা
১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল গোয়ালন্দের উজানচরের বাহাদুরপুর ঘাটের প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন আনছার কমান্ডার ফকির মহিউদ্দিন। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনী ঘাট দখল করে অদূরে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে প্রবেশ করে গ্রামের ২১ জন নর-নারীকে গুলি করে হত্যা করে।

পাংশার বাবুপাড়ার গণহত্যা
১৯৭১ সালের ২১ মে পাংশার বাবুপাড়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনী এলাকার নিরীহ ৩৬ জনকে হত্যা করে রেল ব্রিজের নিচে পুঁতে রাখে। রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মালিয়াটে পাকিস্তানিরা বাহিনী বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে হত্যা করে পুঁতে রাখত।

কল্যাণপুর গণহত্যা
কল্যাণপুরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ২৫ জন নিরীহ মানুষকে। এসব বধ্যভূমিতে রয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ।

মানিকগঞ্জ
তরাঘাট গণহত্যা
মানিকগঞ্জের সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড ঘটে ঢাকা-আরিচা সড়কের তরাঘাটে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে কালীগঙ্গা নদীর ফেরিঘাট দিয়ে মানুষ পারাপার হতো। মানিকগঞ্জ শহরের তিন কিলোমিটার দূরে গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী আবদুস সাত্তার জানান, বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজনকে ধরে এনে এই ক্যাম্পে নির্যাতন করা হতো। তারপর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিত। কখনো কখনো অর্ধমৃত অবস্থায় নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

বলাইবাবুর কুয়া
তরাঘাটের পশ্চিম পাড়ে ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের তাঁতিদের গ্রাম। এই গ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসে বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়। তারপর গ্রামবাসীকে ধরে গুলি করে হত্যা করে। তাদের মধ্যে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বলাইবাবু ও তাঁর স্ত্রীকে। জীবন্ত কুয়ায় ফেলে বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে রাজাকাররা।

পিটিআই বধ্যভূমি
মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প। এই ক্যাম্পেও নির্যাতন করে হত্যা করা হতো বাঙালিদের। লাশ পুঁতে রাখা হতো পিটিআইয়ের উল্টো দিকে একটি নিচু জমিতে।

সাটুরিয়া হাইস্কুলে বধ্যভূমি
সাটুরিয়া হাইস্কুলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প ছিল। এখানে তারা সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে এসে নির্যাতন চালাত। নির্যাতনের পর হত্যা করে স্কুলের পেছনে শুকনো খালে গর্ত করে পুঁতে রাখত।

সাটুরিয়া হাট বধ্যভূমি
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার হাটের কাছে মো. মনোয়ার হোসেনের পরিত্যক্ত বাড়ি খনন করে বহু লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশগুলোর হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা। চোখ–মুখ কাপড় দিয়ে জড়ানো। প্রতিটি লাশ গলাকাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অনেকগুলো মাথার খুলি ও হাড় পাওয়া গেছে। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী শত শত মানুষকে হত্যা করে, মেয়েদের ধর্ষণসহ টাকা-পয়সা লুটপাট করে। বানিয়াটি গ্রাম থেকে হরিদাস সাহা (৫৫), অতুল সাহা (৪৫), নিতাই চন্দ্র সাহা (৩০), রাধু ঘোষ, আওলাদ হোসেন, গাঙ্গুটিয়া গ্রাম থেকে সুধীর রায়, কালু রায়, ডা. বিজয় সাহা, মৃণাল কান্তি রায়, কমলপুর থেকে মুক্তার আলী, পারাগ্রাম থেকে কালু মিয়া, কাউননারা থেকে হালিম ফকির, আমতা থেকে যতীন্দ্র কর্মকার, নয়াপাড়া থেকে শ্যাম সাহা, ডাক্তার নরেন্দ্র ঘোষ, হাজীপুর থেকে হজরতকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। চরসাটুরিয়ার নারায়ণবাবুর স্ত্রী আভা রানী ভট্টাচার্যকে (৩৫) ধর্ষণ করে হত্যা করে। যতীন কর্মকারের ১৫ বছরের নাতিকে চোখ উপড়ে ফেলে হত্যা করে।

সিঅ্যান্ডবির ডাকবাংলো নির্যাতনকেন্দ্র
পাকিস্তান সেনাবাহিনী মানিকগঞ্জ থেকে পালিয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। মানিকগঞ্জ সিঅ্যান্ডবির ডাকবাংলো ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদর দপ্তর। এখান থেকেই হানাদার এবং তাদের দোসররা সাধারণ মানুষকে ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করত।

গণকবর
মানিকগঞ্জের থানা পুকুরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি গণকবর রয়েছে। এখানে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ’৭১-এর গণহত্যা ’৭১, আবু সাঈদ সম্পাদিত; যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ, ডা. এম এ হাসান, দৈনিক বাংলা, স্বাধীনতার দলিলপত্র, হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২, ২৬ মার্চ ২০১৫, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, প্রতিদিনের সংবাদ, ১১ ডিসেম্বর ২০১৬, দৈনিক প্রথম আলো।

*এই দুই এলাকার গণহত্যা, গণকবর কিংবা বধ্যভূমিসংক্রান্ত আরও যদি খবর থাকে, অনুগ্রহ করে মেইলে জানাবেন।

আবু সাঈদ: কবি, সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক
abusayedone@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন