মুক্তিযুদ্ধ, দুই বিদেশি খলনায়ক ও জাতীয় স্বার্থ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তিন পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের বৈদেশিক নীতির বিষয়ে নানা তর্কবিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ বনাম নৈতিক অবস্থানের আলোকে সেসব বিষয় দেখার চেষ্টা করা হয়েছে তিন পর্বের এই লেখায়। আজ শেষ পর্ব।

মুক্তিযুদ্ধে মেহেরপুর রণাঙ্গন। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ছবি: সংগৃহীত

অধিকাংশ লেখক ও গবেষকের চোখে একাত্তরের দুই প্রধান বিদেশি খলনায়ক হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তাঁর নিরাপত্তা সহকারী কিসিঞ্জার। বাংলাদেশি ও ভারতীয় লেখকদের চোখে তো বটেই, মার্কিন লেখকেরাও একাত্তরের গণহত্যায় এই দুজনকে ইয়াহিয়ার দোসর ও অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গ্যারি ব্যাস, ব্লাড টেলিগ্রাম-এর খ্যাতনামা লেখক, মন্তব্য করেছেন, নিক্সন ও কিসিঞ্জার নিজেদের বিশ্বরাজনীতির দক্ষ অনুশীলনকারী হিসেবে দাবি করলেও তাঁরা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করেছেন মাত্র।

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক জেমস মা ই হংগ গণহত্যা প্রশ্নে নিক্সন-কিসিঞ্জারের আশ্চর্য উদাসীনতায় বর্ণবাদেরও প্রকাশ দেখেছেন, যে অভিযোগ গ্যারি ব্যাসও করেছেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুযোগ নিক্সন-কিসিঞ্জারের কাছে একটি নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, জেমস হংগের কাছে তার একটি স্পষ্ট ‘বর্ণবাদী’ চরিত্র রয়েছে। নিক্সনের কাছে জাতি হিসেবে পাকিস্তান শ্রেষ্ঠতর, সে যোদ্ধা এবং সৎ। অন্যদিকে ভারতীয়রা চতুর ও শঠ, তাদের কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না। হংগ স্মরণ করেছেন, পাকিস্তানিদের প্রতি তাঁর আস্থা প্রকাশ করে নিক্সন একসময় মন্তব্য করেছিলেন, ‘শুধু শুধুই ৪০০ মিলিয়ন ভারতীয়র ওপর তারা (অর্থাৎ মুসলমানরা) রাজত্ব করেনি।’

লেখক-গবেষকদের চোখে কিসিঞ্জার নিক্সনের চেয়েও নিকৃষ্ট এক ব্যক্তি। মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক নিকোলাস টমসনের কথায়, তিনি ইতিহাসের জঘন্যতম একজন মানুষ। অধ্যাপক জন মানের কথায়, কিসিঞ্জার নিজের কার্যাবলিকে ‘আদর্শ দ্বারা পরিচালিত’ বলে দাবি করেন, কিন্তু এর চেয়ে বড় ভুল আর হয় না। অধ্যাপক মারিও দেল পেরোর কথায়, কিসিঞ্জার নিজেকে যত পণ্ডিত অথবা চতুর ভাবুন না কেন, তিনিই মোটেই ‘গভীর অথবা মৌলিক’ চিন্তার মানুষ ছিলেন না।

নিক্সন ও কিসিঞ্জার উভয়েই নিজেদের উদ্দেশ্যের সাধুতা বোঝাতে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নের আঁতাতকে দোষারোপ করেছেন। নিক্সন তাঁর স্মৃতিকথা দ্য মেমোয়ারস অব রিচার্ড নিক্সন (সাইমন অ্যান্ড শুস্টার, নিউইয়র্ক ১৯৭৮) গ্রন্থে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সাতোকে বলা কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে না হবে, তার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিবেচনা কাজ করেছে। (ভারতের মতো) বড় কোনো দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন নিয়ে যদি তাদের প্রতিবেশী ক্ষুদ্র দেশের ওপর চড়াও হয়ে তা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে, তাহলে তা মেনে নেওয়া হবে কি না, সেটাই ছিল আসল প্রশ্ন। একই কথা বলেছেন কিসিঞ্জার তাঁর হোয়াইট হাউস ইয়ারস গ্রন্থে।

গণহত্যা ও নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি

নিক্সন ও কিসিঞ্জারের এই ‘নৈতিক উচ্চম্মন্যতা’ যে কেবলই বাগাড়ম্বর, তার সবচেয়ে জোরালো ব্যাখ্যা দিয়েছেন মার্কিন কূটনীতিক ক্রিস্টোফার ভ্যান হলেন। তাঁর মতে, নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি যদি একাত্তরের ঘটনাবলিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে না দেখে সংকটের আঞ্চলিক (অর্থাৎ দক্ষিণ এশীয়) পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতেন, তাহলেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ সবচেয়ে জোরালোভাবে রক্ষিত হতো। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল পাকিস্তানি সামরিক হামলার নিন্দা করা এবং মার্কিন সামরিক নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যদি ইয়াহিয়াকে বাংলাদেশে মানবিক বিপর্যয় প্রশ্নে মার্কিন কংগ্রেস ও জনগণের উদ্বেগ ব্যাখ্যা করে বোঝানো হতো, তাহলে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ স্থাপনের দূত হিসেবে যে কাজ তিনি করছিলেন, তাতে বিঘ্ন ঘটত না। কারণ, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই নিজেদের স্বার্থে এই উদ্যোগকে অক্ষুণ্ন রাখতে আগ্রহী ছিল। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের ওপরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল সীমিত, কিন্তু গোড়া থেকেই যদি সে (গণহত্যার বিরুদ্ধে) একটি নীতিগত অবস্থান নিত, তাহলে এই দুই দেশের নেতৃত্বের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেত।

আইন ভঙ্গ করে পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র পাঠানোর যে চক্রান্ত নিক্সন-কিসিঞ্জার করেন, তা থেকেই স্পষ্ট, দেশটির সামরিক নেতৃত্বকে আগলে রাখার দায়িত্ব তাঁরা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলেন। ২৫ মার্চের আগে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র পাঠায়, যা বাঙালিদের লড়াই দমনে ব্যবহৃত হয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ২৫ মার্চের পর, মার্কিন গবেষক স্টেফান শালোমের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্রবাহী ১০টি জাহাজ পাকিস্তানের উদ্দেশে যাত্রা করে। এসব জাহাজে যে অস্ত্র পাঠানো হয়, তার মূল্য পাঁচ মিলিয়ন ডলার। অধ্যাপক শালোমের তথ্য অনুসারে, ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের পর একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই পাকিস্তানে যুদ্ধাস্ত্র পাঠানো অব্যাহত রাখে (দেখুন, জেট ম্যাগাজিন, সেপ্টেম্বর ১৯৯১)।

লেখক-গবেষকদের চোখে কিসিঞ্জার নিক্সনের চেয়েও নিকৃষ্ট এক ব্যক্তি। মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক নিকোলাস টমসনের কথায়, তিনি ইতিহাসের জঘন্যতম একজন মানুষ। অধ্যাপক জন মানের কথায়, কিসিঞ্জার নিজের কার্যাবলিকে ‘আদর্শ দ্বারা পরিচালিত’ বলে দাবি করেন, কিন্তু এর চেয়ে বড় ভুল আর হয় না। অধ্যাপক মারিও দেল পেরোর কথায়, কিসিঞ্জার নিজেকে যত পণ্ডিত অথবা চতুর ভাবুন না কেন, তিনিই মোটেই ‘গভীর অথবা মৌলিক’ চিন্তার মানুষ ছিলেন না।

রিচার্ড নিক্সন, হেনরি কিসিঞ্জার

কিসিঞ্জার নিজে নানাভাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যায় তাঁর ভূমিকার সাফাই গেয়েছেন। এর সর্বশেষ উদাহরণ আটলান্টিক পত্রিকায় ২০১৬ সালে জেফ্রি গোল্ডবার্গের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মূল্য হিসেবে বাংলাদেশের হত্যাযজ্ঞ মেনে নেওয়া যায় কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, মানবাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা—উভয় নীতি দ্বারাই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত। সব সময় এই দুইয়ের মধ্যে একটা বেছে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, কিন্তু কখনো কখনো জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হয়, ১৯৭১ সালে যেমন হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কিসিঞ্জার বলেন, বাঙালিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দমনে ইয়াহিয়া চূড়ান্ত সহিংসতা প্রদর্শন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করেন। তিনি এও বলেন, ‘কিন্তু (সে সময়) এই সহিংসতার নিন্দা করার অর্থ দাঁড়াত চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনার সমাপ্তি।’ নিক্সন প্রশাসন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুনভাবে নির্মাণ তার জাতীয় স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। কিসিঞ্জারের ভাষ্যে, একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্র যা করে, তা সবই ছিল সে স্বার্থ সমুন্নত রাখার চেষ্টা। এই সাক্ষাৎকারে কিসিঞ্জার এমন দাবি করেছেন, তাঁদের অনুসৃত নীতির সাফল্যের কারণেই ১৯৭২ সালের মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় (প্রকৃতপক্ষে মার্চে নয়, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়)। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিক্সন বেইজিং সফর করেন এবং মে মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আণবিক অস্ত্র চুক্তি (সল্ট) সম্পাদন সম্ভব হয়।

কিসিঞ্জারের এই দাবি কতটা সারশূন্য, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভ্যান হলেন, এখানে তার পুনরাবৃত্তি অপ্রয়োজনীয়। বস্তুত, যে সাফল্যের তালিকা কিসিঞ্জার দিয়েছেন—বাংলাদেশের স্বাধীনতা, পশ্চিম পাকিস্তানের বিলুপ্তি ঠেকানো, চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ঢেলে সাজানো—বাংলাদেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নিলে কোনোভাবেই তার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নেতিবাচক হতো না। এমনই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন সুইস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জাসি এম হানহিমাকি। তাঁর বক্তব্য, কিসিঞ্জার-নিক্সন অনুসৃত নীতির ফলে বাংলাদেশ সংকট এবং সেখানে গণহত্যা কেবল দীর্ঘায়িতই হয়েছে। একাত্তরে যে অসংখ্য মানুষের জীবনহানি হয়, এর সবকিছুর জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই ট্র্যাজেডি ঠেকাতে সে আরও অনেক বেশি কিছু করতে পারত, বিশেষত কিসিঞ্জার নিজেই যেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল। (দেখুন: ফ্লড হেনরি কিসিঞ্জার অ্যান্ড আমেরিকান ফরেন পলিসি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৪)।

জাতীয় স্বার্থই একমাত্র কথা নয়

একাত্তরে বাংলাদেশ প্রশ্নে চীনের অনুসৃত নীতি জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত—এ কথা যদি মেনেও নিই, এটি যে কোনোক্রমেই নৈতিক নয়, তাতে কোনো ভুল নেই। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তার বিবাদকে সামনে রেখে শুধু সে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে তা-ই নয়, গণহত্যার মতো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকেও উপেক্ষা করে। তৃতীয় বিশ্বের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধুর দাবিদার কোনো রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল না, তা বলাই বাহুল্য।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের একপেশে নীতির বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুসৃত নীতি, ডাচ্‌ বিশেষজ্ঞ ভিলেন ভ্যান কোমেনাডের বিবেচনায় শুধু কৌশলগত জাতীয় স্বার্থ দ্বারা নয়, কিছু নীতিগত বিবেচনা দ্বারাও পরিচালিত হয়েছিল। ভারত ও রাশিয়ার বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের, রুশ বিপ্লবের পর যেসব দেশের মানুষ তাকে স্বাগত জানায়, ভারত তাদের অন্যতম। জওহরলাল নেহরু থেকে ইন্দিরা, অধিকাংশ ভারতীয় নেতা সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। ১৯৫৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নেহরু প্রথমবারের মতো সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করে খুশি হয়েছিলেন। তার অব্যবহিত পরই দুই সোভিয়েত নেতা খ্রুশ্চেভ ও বুলগানিন ভারত ঘুরে যান। অন্য কথায়, প্রথমাবধিই এই দুই দেশের নেতাদের মধ্যে রাজনীতির বাইরে একটি ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে ওঠে। এই মনোভাব ব্যক্ত করে সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউল লিখেছেন, এই দুই দেশ একে অপরের প্রকৃত বন্ধু।

ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে জাতীয় স্বার্থ নিয়ে কোনো সংঘাত নেই, বরং রয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়া। সোভিয়েতদের নিজেদের বিস্তর জমি রয়েছে, চীনের মতো অন্যের জমির প্রতি তার লোভ নেই। সে ভারতের সঙ্গে যা চায় তা হলো শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্ব (দেখুন: টি এন কাউল, রেমিনিসেন্সেস, দিল্লি ১৯৮২)।

বাংলাদেশের প্রতি সোভিয়েত দৃষ্টিভঙ্গি মুখ্যত ভারতের প্রতি এই বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবেরই প্রতিফলন। স্বাধীনতা লাভের পর এই দেশও ভারতের মতো ‘অধনতান্ত্রিক’ অর্থনীতি অনুসরণ করবে এবং মিত্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে থাকবে—এ চিন্তা মস্কোকে প্রভাবিত করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। ভারতের মতো সেও সোভিয়েত বলয়ভুক্ত হবে—এমন একটি অঙ্ক যদি মস্কো করে থাকে, তাতেও বিস্ময়ের কিছু নেই।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বের জাতিগুলোর মুক্তি আন্দোলনের অন্তর্গত—মস্কোর কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধরত বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মৈত্রী একটি নবতর পর্যায়ে উন্নীত হয়। এ দেশ স্বাধীনতা অর্জন করুক, মস্কো যে তা মনেপ্রাণে চেয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাতিসংঘে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশ প্রশ্নে বিতর্কের সময়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই চেষ্টায় ছিল যেকোনো মূল্যে যুদ্ধবিরতি অর্জন ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণ। এই চাল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন সুদূর পরাহত না হোক, তা যে বিলম্বিত হতো, সে কথায় সন্দেহ নেই। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে ভেটো ক্ষমতার অধিকারী সোভিয়েত ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক সমালোচনা উপেক্ষা করে যুদ্ধবিরতির সব প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের আশ্বাস

ভারত ও বাংলাদেশের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে জোরালো পদক্ষেপ ছিল মার্কিন হুমকির জবাবে বঙ্গোপসাগরে একটি পাল্টা আণবিক নৌবহর প্রেরণ। সে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে জেনেও মস্কো এ সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতকে সে আশ্বাস দিয়েছিল, মার্কিন ও চীনা হামলার মুখে সে তাকে একলা ফেলে রাখবে না। এ আশ্বাস বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। পেছনে তাকিয়ে এখন এ কথা অবশ্যই বলা যায়, একাত্তরে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের কাছে দেওয়া সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিরুদ্ধে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি কূটনৈতিক চক্রান্ত নয়, মস্কোর চোখে এটি একটি জাতির মুক্তির লড়াই, তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন পাকিস্তানি কূটনীতিক জামশেদ মার্কার। সে সময় তিনি মস্কোতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মিটিং-মিছিল শুরু হয়ে যায়। একপর্যায়ে সোভিয়েত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে জানানো হয়, বিভিন্ন কারখানার প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক কার্যকলাপের প্রতিবাদসংবলিত স্মারকপত্র তাঁর হাতে তুলে দিতে চায়। সকাল-বিকেল দফায় দফায় সেসব প্রতিনিধিদল এসে প্রতিবাদপত্র জমা দিয়ে যেত। (দেখুন: জামশেদ মার্কার, কোয়ায়েট ডিপ্লোমেসি, ২০১০)।

জামশেদ মার্কারের দাবি, এসবই কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে করা হচ্ছিল। যে বিষয় পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত ঠাহর করে ওঠেননি, তা হলো যেসব শ্রমিক স্মারকপত্র দিতে আসতেন, তাঁরা প্রায় সবাই হয় কমিউনিস্ট পার্টি, নয়তো যুব কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। এটি যে স্বাধীনতা ও মুক্তির পক্ষে সোভিয়েত কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক সংহতির বহিঃপ্রকাশ, সহজ এই সত্য পাকিস্তানি কূটনীতিকের পক্ষে বোঝা অসম্ভব ছিল।

আরও পড়ুন