বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল নিবন্ধ উপস্থাপক ছিলেন সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁর নিবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন: যেসব অঙ্গীকার পূরণ হয়েছে, যা পূরণ করতে হবে’। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে ৭ মার্চের ভাষণের উপসংহারে বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘ভিশন’ (রূপকল্প) তুলে ধরেন এই বলে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। স্বাধীনতা ও মুক্তির মধ্যে পার্থক্য কী, তা বঙ্গবন্ধুর কাছে সম্ভবত পরিষ্কার ছিল। স্বাধীনতার সংগ্রাম মানে ছিল স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আর মুক্তির সংগ্রাম ছিল শতবর্ষ ধরে মানুষের ওপর চলা অন্যায় ও অন্যায্যতা থেকে মুক্তি।

‘আমাদের মুক্তির সংগ্রামে’ যে মুক্তির কথা বলা হয়েছিল, তা অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু সংবিধানে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র—এই চার মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, মুক্তি অর্জনের জন্য লড়াই সমাপ্ত হয়নি। এ ক্ষেত্রে তিনি মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের একটি কবিতার দুটি লাইন উল্লেখ করেন, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির বিশেষ পছন্দ ছিল। লাইন দুটি হলো, ‘আই হ্যাভ প্রমিসেস টু কিপ অ্যান্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ (আমাকে অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে এবং মৃত্যুর আগে বহুদূর যেতে হবে)।’

রেহমান সোবহানের নিবন্ধে তিনটি ভাগ ছিল। প্রথম ভাগে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন তুলে ধরেন। দ্বিতীয় ভাগে স্বপ্ন কতটা পূরণ হয়েছে, তা উল্লেখ করেন। শেষ ভাগে কী কী অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে, তা সামনে আনেন।

তরুণ বয়সে আমি একটি লেখা এক ঘণ্টায় লিখে ফেলতে পারতাম। এখন এক সপ্তাহ লাগে। আমাকে বারবার ভাবতে হয় কী লিখছি।
রেহমান সোবহান

রেহমান সোবহান বলেন, স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। সেটা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, পাশাপাশি সামাজিক নানা সূচকে। বাংলাদেশে বিশাল উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি হয়েছে। গ্রামের সাধারণ কৃষকেরা কৃষির উৎপাদন বিপুলভাবে বাড়িয়েছেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা বিরাট ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বিদেশে গেছেন। গান, কবিতা, শিল্পকলা, নাটক—এসব ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এগিয়েছে, যা ধর্মনিরপেক্ষতাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।

রেহমান সোবহানের চোখে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায়। দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ অভিজাত শ্রেণির কাছে সীমিত হয়ে পড়ছে। বড় উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি হলেও শিল্প সম্পর্ক হয়ে পড়েছে শোষণের হাতিয়ার। মানুষ রাজনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ছে।

‘ন্যায্যতাভিত্তিক’ সমাজ নিয়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনসহ অনেকের নানা রকম ব্যাখ্যা আছে উল্লেখ করে রেহমান সোবহান এ বিষয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘অন্যায্যতা’র উৎস দুটি। প্রথমত, অন্যায্য সরকারের ব্যর্থতার মাধ্যমে তৈরি হওয়া অন্যায্যতা। দ্বিতীয়ত, সমাজে তৈরি হওয়া কাঠামোগত অন্যায্যতা। অন্যায্য সরকার ঘোষিত নীতি, আইন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সমানভাবে প্রয়োগ করতে পারে না। কাঠামোগত অন্যায্যতা তৈরি হয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায়।

রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদেশে সরকারের উচিত বিদ্যমান আইন ও নীতি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। আইনের শাসন নিশ্চিত করা। কাঠামোগত অন্যায্যতা দূর করা বেশি চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য দরকার নতুন নীতি ও আইন এবং আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংহতি।

এ পর্যায়ে রেহমান সোবহান কিছু বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন, যা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি—গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সুশাসন, শিক্ষার বৈষম্য দূর করা ও পরিবেশ সুরক্ষা। তিনি বলেন, সরকার যদি চায় আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করবে, সে লক্ষ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করে, তাহলেও প্রশ্নহীন নির্বাচন সম্ভব না-ও হতে পারে। কারণ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিনের পর দিন পক্ষপাতী বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে।

শেষ দিকে রেহমান সোবহান রাজনৈতিক অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শাসকের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, কাঠামোগত পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নের জন্য আরও সংকল্পবদ্ধ শাসক দরকার। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর দেখানো ‘মুক্তির স্বপ্ন’ পূরণের মতো সক্ষমতা শাসকের না-ও থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে জনগণকে বলে দেওয়া যায় যে গত শতাব্দীর তৃতীয় ভাগে যে লক্ষ্যের কথা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তা এখন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রশ্নোত্তর পর্বে বাক্‌স্বাধীনতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রেহমান সোবহান বলেন, ‘তরুণ বয়সে আমি একটি লেখা এক ঘণ্টায় লিখে ফেলতে পারতাম। এখন এক সপ্তাহ লাগে। আমাকে বারবার ভাবতে হয় কী লিখছি।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে অধিবেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক রওনক জাহান সম্মেলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের উন্নতির আংশিক গল্প বলতে চাই না। আমরা যদি শুধু উন্নয়নের কথা বলি, তাহলে আমাদের দৃষ্টি সংকীর্ণ হয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু উন্নয়ন ছিল না।’ তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের এগিয়ে যাওয়া নিয়ে গর্ব করা ও উদ্‌যাপন করা দরকার। কিন্তু কী কী ঘাটতি আছে ও কী কী ভুল হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা হতে হবে, যাতে শিক্ষা নেওয়া যায়।

সিপিডি এই সম্মেলন আয়োজন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির সহায়তায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কর্নেল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক অধ্যাপক ইফতিখার হাদি ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বক্তব্য দেন।

চার দিনের এই সম্মেলনে দেশ-বিদেশের ৪৭ জন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষক অংশ নেবেন। ২০টি উপস্থাপনা ও গবেষণাপত্র তুলে ধরা হবে। অধিবেশন থাকবে মোট আটটি। মঙ্গলবার (৭ ডিসেম্বর) ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর’ ও ‘ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজের পথে’ শিরোনামের দুটি অধিবেশন রয়েছে। শুরু হবে সন্ধ্যা ছয়টায়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন