বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

বেলারুশের মেয়ে নাতালিয়া প্রথম দিকে বাংলাদেশের এসব অনুষ্ঠান নিয়ে ভয়ে ছিলেন। স্টেজে বসে থাকবেন আর সামনের অনেক মানুষ তাঁকে দেখবেন, তা মেনে নিতে পারছিলেন না। তবে বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, গায়েহলুদ ও বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জড়তা কেটে যায় এ বিদেশি বধূর। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কালো চশমা পরে বউ নিজেও নাচেন। তারপর বাংলায় জানতে চান—পার্টি কেমন হলো? হলুদ শাড়ি ও ফুলের গয়না পরে নিজেকে দেখে নিজেই বলেন, ‘অনেক ভালো লাগতেছে।’ এই দম্পতির মেয়ে অনুষ্ঠানগুলোতে হাসিখুশি থাকলেও কেন এ আনুষ্ঠানিকতা তা বুঝতে পারেনি। নাতালিয়ার পরিবারের অন্য সদস্যরা বাংলাদেশে আসতে পারেননি।

২০ ডিসেম্বর এই দম্পতি বাংলাদেশে এসেছেন। এরপর ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর মিরপুরে বাড়ির ছাদে গায়েহলুদের অনুষ্ঠান এবং ২৩ ডিসেম্বর একটি কনভেনশন হলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন তাঁরা। শরীরে ক্লান্তি থাকলেও তাঁদের ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। আগামী ৭ জানুয়ারি তাঁরা আবার পাড়ি দেবেন জার্মানিতে। এর আগে স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলায় গ্রামের বাড়ি, কক্সবাজার, শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন জায়গায় যেতে হবে। আত্মীয়স্বজনের আবদারও মেটাতে হবে। নাতালিয়া শাশুড়ির কাছ থেকে বিভিন্ন রান্না শিখে তবেই ফিরবেন জার্মানিতে।

default-image

আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুঠোফোনে কথা হয় হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। নাতালিয়া বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তাই কথা বলতে পারেননি। তবে তিনি তাঁর কথাগুলো হাবিবুর রহমানকে জানিয়ে রেখেছিলেন।

হাবিবুর রহমান জার্মানিতে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটিং ফার্মে ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্ট ম্যানেজার আর নাতালিয়া ওই দেশে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কর্মরত। তবে তাঁরা বর্তমানে নেট দুনিয়ায় জনপ্রিয় ব্লগার হিসেবে পরিচিত।

হাবিবুর রহমান জানান, ২০১৭ সালে ধর্মীয়ভাবে বিয়ের পর ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জার্মানির নিয়মনীতি মেনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর বেলারুশে গিয়েছিলেন এ দম্পতি। তখন সেখানে অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলেন ২৩ জন। হাবিবুর রহমান হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাংলাদেশে আমাদের যেখানে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে, সেখানকার চারতলায় যাঁদের বিয়ে হয়েছে, সেই অনুষ্ঠানের অতিথিরাও আমাদের দেখতে এসেছেন ও ছবি তুলেছেন।’

ভিডিওতে দেখা যায়, নাতালিয়া বাংলাদেশের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে চেপে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথেই বলেছেন, বাংলাদেশের চালকেরা খুব বেশি হর্ন বাজান। পথের পাশে ফুটপাতে ঘুমন্ত শিশুদের দেখে ঠিক করেছেন ভবিষ্যতে এই পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবেন। শ্বশুরবাড়িতে ঢুকেই শাশুড়ি ও অন্যদের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন। একইভাবে বিয়ের আগে শ্বশুরের মৃত্যুসংবাদ শুনে কেঁদেছেন। বাংলাদেশে এসে সালোয়ার–কামিজ পরেছেন নাতালিয়া। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা তাঁকে মুগ্ধ করেছে।

default-image

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বিদেশি বউ নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা প্রচলিত আছে। আমার মা আমাদের সম্পর্কের কথা শুনেও ভয় পেয়েছিলেন, কান্নাকাটি করেছেন। আর এখন শাশুড়ি পিঠা বানাচ্ছেন, বিদেশি বউ তা মজা করে খাচ্ছে। বউ-শাশুড়ি যাঁর যাঁর মতো করে ঠিকই গল্প করছে, ভাষা এখানে খুব একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আর মেয়ে বাংলাতেই বেশ কথাবার্তা চালিয়ে নিচ্ছে।’

হাবিবুর রহমান জানান, বিয়ের কথা শুনে তাঁর বাবা মো. আবদুর রব গায়েহলুদের শাড়ি, গয়নাসহ বিভিন্ন জিনিস পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জার্মানিতে। তবে বিয়ের আগেই তিনি মারা যান। তাঁর পাঠানো হলুদের শাড়িটিই এবার পরেছেন নাতালিয়া।

স্বামীর ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া, ভাষা শেখা, অন্য একটি দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলা— এসব ক্ষেত্রে নাতালিয়া এগিয়ে আছেন। হাবিবুর রহমান তা কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করলেন। জানালেন, বুঝতে পারলেও স্ত্রীর রুশ ভাষাটা এখনো তেমন একটা আয়ত্ত করতে পারেননি, তাই শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে সেভাবে মিশতে পারেন না। নাতালিয়ার রুশ ভাষা, মেয়ের ডে–কেয়ারের জার্মান ভাষা আর বাংলা ভাষা—এই তিন ভাষাতেই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ চলে।

বিদেশি বউয়ের প্রশংসা করে হাবিবুর বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই মাথার চুল পড়া শুরু হয়েছিল। একসময় টাক সমস্যা প্রকট হয়। এই টাক নিয়ে চিন্তা করতাম। টাক ঢেকে রাখার চেষ্টা করতাম। নাতালিয়ার সঙ্গে বিয়ের পর নিজেই সে আমার মাথায় বাকি যেটুকু চুল ছিল, তা ফেলে দেয়। বলে এটা কোনো সমস্যা না। আত্মবিশ্বাসটাই বড় কথা। তারপর থেকে ন্যাড়া মাথা নিয়ে চলছি, টাক নিয়ে আর কোনো চিন্তা করতে হয়নি আমাকে।’

default-image

মেয়ের নাম নাদিয়া রহমান রাখা প্রসঙ্গে হাবিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও রাশিয়ায় পরিচিত এমন একটা নাম মেয়ের জন্য তিনি খুঁজছিলেন। দেখলেন, নাদিয়া নামটা বাংলাদেশে তো আছেই, রাশিয়াতেও এ নাম বেশ পরিচিত। নাতালিয়ার নানি অনেক আগে মারা গেছেন। তাঁর নাম ছিল নাদিয়া। সব মিলে মেয়ের এই নাম রাখেন তাঁরা।
জার্মানিতে ২০১৩ সালে ‘স্টুডেন্ট জব’ করতে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল নাতালিয়া ও হাবিবুরের। সেই পরিচয় প্রেমের দিকে বাঁক নিতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তারপর বিয়ে ও সংসার। হাবিবুর ২০১২ সালে জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। আর নাতালিয়া উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান ২০১০ সালে।

নাতালিয়ার বাংলাদেশ সফরের আগে থেকেই শুরু হয়েছিল প্রস্তুতি। এর মধে৵ রয়েছে করোনা পরীক্ষা, বিভিন্ন টিকা নেওয়া, হাত দিয়ে খিচুড়ি খাওয়া এবং শাড়ি পরাসহ নানা কিছু। এই দম্পতি বিভিন্ন ব্লগে ভিডিওতে বাংলায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের নানা গল্প বলেন। নাতালিয়া বাংলা ছায়াছবির বিভিন্ন জনপ্রিয় গানের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে অভিনয় করেন। এমনকি সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ‘কাচা বাদাম’ বা ‘নয়া দামান’ গানের সঙ্গেও নেচে নেচে অভিনয় করেছেন। মেয়ে নাদিয়াও বাংলায় কথা বলে ভিডিওতে।
হাবিবুর রহমান বলেন, বাংলা গানগুলো প্রথমে তিনি নাতালিয়াকে শোনান। গানের কিছু অংশের প্রতিটি শব্দ তাঁকে বুঝিয়ে বলেন। তারপর নাতালিয়া নিজেই অভিনয় করেন।

default-image

বাংলা ভিডিওগুলোর মাধ্যমে স্ত্রী ও মেয়েকে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় জানানোর চেষ্টা করেন বলে জানান হাবিবুর। তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাভাষীরা সেসব ভিডিও দেখে মন্তব্য করেন। এভাবে সবার সঙ্গে একটা যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। বেলারুশে গিয়েও তাঁরা ব্লগে লিখেছেন। তাতে অনেকেই বলেছেন, অন্য একটি দেশ সম্পর্কেও তাঁরা জানতে পারলেন।

ব্লগে বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেন বলে জানান হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা মেয়েকে তার নিজে হাতে খাওয়া শিখিয়েছি। কার্টুন দেখিয়ে খাওয়াই না, খুব বেশি সময় টেলিভিশন দেখতে দিই না—এ বিষয়গুলো নিয়েও আমরা ব্লগ করেছি। এ থেকে কেউ যদি কিছু শিখতে চান, শিখতে পারেন। আমরা কাউকে বলি না শিখুন।’

default-image

বাংলাদেশে আসার আগে থেকেই বিভিন্ন ভিডিওর মন্তব্যে অনুসারীরাই পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশে এসে কোথা থেকে বিয়ের শাড়ি কিনবেন, নাতালিয়াকে বউ সাজলে কেমন লাগবে মন্তব্যে তা–ও জানিয়েছেন তাঁরা। ‘নাতাশা অ্যান্ড হাবিব’ নামের ফেসবুক পেজের বর্তমান অনুসরণকারী ২৬ লাখ। আরেকটি পেজ মিলে অনুসরণকারী ৪০ লাখের বেশি। তাঁদের ইউটিউব চ্যানেলের অনুসরণকারী সাড়ে চার লাখ।

নাতাশা–হাবিব দম্পতি ব্লগার হবেন, আগে থেকে তাঁরা এ ব্যাপারে তেমন চিন্তা করেননি। করোনায় এ চিন্তাটা তাঁদের মাথায় আসে। হাবিবুর বলেন, ‘আগে আমরা প্রচুর ঘুরতাম। তবে ইউটিউব চ্যানেল দেখার কোনো অভ্যাসই ছিল না। ব্লগার হওয়ার চিন্তা করার পর বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল দেখা শুরু করি। মানুষের ভালোবাসা পেতে শুরু করি অল্প সময়ের মধ্যে। মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি বলেই ব্লগের সংখ্যা বেশি হচ্ছে। আর আমাদের দুজনের নিজ নিজ পেশা তো আছেই।’

পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসার বিষয়ে এ দম্পতি এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে সব দিক মিলে গেলে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবেন। কেননা, জার্মানি তাঁর বা নাতালিয়ার নিজের দেশ নয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন