default-image

কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর লাশের প্রথম ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর শরীর থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে মিলল ধর্ষণের আলামত। ফলে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার আগেই প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের যথার্থতা অনেকখানি অসাড় হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে সুরতহাল প্রতিবেদন নিয়েও, যেখানে তনুর মাথার পেছন দিকে আঘাতের চিহ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দফার ময়নাতদন্তের ফলাফল আসে প্রথমটির বিপরীত। দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্ত করতে কবর থেকে লাশ তুলতে হয়। কিন্তু লাশ তুলতে দেরি হয়ে গেলে সঠিক প্রতিবেদন পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
এসব অসংগতির ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বা সুরতহাল প্রতিবেদন প্রদানকারী পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা বা তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। কারও সাজা পাওয়ার কোনো নজির নেই। প্রতিবেদনের অসংগতি নিয়ে জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই।
তনুর প্রথম ময়নাতদন্তকারী কর্মকর্তা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক শারমিন সুলতানাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ডিএনএ পরীক্ষা ময়নাতদন্তের অংশ নয়। তাঁর তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়নি। তনুর মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন তিনি পাননি। তাই এ নিয়ে ময়নাতদন্ত রিপোর্টে কোনো উল্লেখ নেই।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ফরেনসিক অ্যাক্ট করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘এ দেশে ময়নাতদন্ত কে, কীভাবে করবে, তা কোথাও সুনির্দিষ্ট করা নেই। খুব শিগগির আমাদের ফরেনসিক অ্যাক্ট করতে হবে।’
অসংগতির আরও দৃষ্টান্ত: ফরিদপুরে চাচাতো বোনের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান থেকে ২০১২ সালের ১৩ ডিসেম্বর নিখোঁজ হয়েছিল জাকিয়া সুলতানা চম্পা (১৩)। পরদিন বাড়ির পাশে মেহগনিবাগানের একটি গাছ থেকে তার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। চম্পার গায়ে আঘাতের একাধিক চিহ্ন এবং লাশ অস্বাভাবিক উচ্চতায় ঝুলে ছিল, উল্লেখ করা হয় সুরতহাল প্রতিবেদনে। অথচ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, জাকিয়া আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু এই প্রতিবেদনকে অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে তার ভাই হাসিবুল ইসলাম আদালতে গেলে পুনরায় ময়নাতদন্ত হয়। এবার রিপোর্টে বলা হয়, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর চম্পাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে চারজনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আদালত। হাসিবুলের অভিযোগ, আসামিপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় প্রথম ময়নাতদন্তে চিকিৎসক ভুল প্রতিবেদন দিয়েছিলেন।
এই ঘটনায় প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে রাজশাহীতে হত্যাকে আত্মহত্যা লিখে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ায় চিকিৎসক জোবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ রাজশাহীতে ওয়াহিদা সিফাত নামের এক গৃহবধূর মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেন ওই চিকিৎসক। কিন্তু রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, আঘাতের কারণে সিফাতের মৃত্যু ঘটেছে।
জোবায়দুর রহমান বর্তমানে মানিকগঞ্জ হাসপাতালে কর্মরত। ঘটনা জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুরতহাল প্রতিবেদনে আঘাতের বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু লেখা ছিল না। আমি ময়নাতদন্তে আত্মহত্যা পেয়েছিলাম। পরবর্তী ময়নাতদন্তে বলা হয়েছে, হত্যা হতে পারে।’
সিফাতের চাচা মিজানুর রহমান খন্দকার বলেন, মামলার তদন্তে শুধু চিকিৎসক নন, পুলিশের ভূমিকাও ছিল রহস্যজনক। পুলিশ ও চিকিৎসকেরা হত্যার ঘটনাকে আত্মহত্যা বানাতে চেয়েছিলেন।
শরীয়তপুরে লাশের গায়ে আঘাতের চিহ্নের কথা গোপন রেখে সুরতহাল প্রতিবেদন জমা দেওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বলছে, এমন ঘটনা অসংখ্য। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘হত্যাকে আত্মহত্যা বলে ময়নাতদন্ত দেওয়া বা ময়নাতদন্তে অনেক তথ্য ঊহ্য রাখার বিষয়ে অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে আসে।’
খুন, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনোভাবে কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে ফৌজদারি আইন অনুসারে প্রথমেই মৃতদেহের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট। এতে ময়নাতদন্তের আগে মৃতদেহ কী অবস্থায় পাওয়া গেছে, শরীরে ক্ষত, আঘাতের চিহ্ন, ভাঙা, মচকানো বা আঁচড়ের দাগ এবং কী ধরনের অস্ত্র বা যন্ত্রের সাহায্যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, সেসব উল্লেখ থাকে। একেই সুরতহাল প্রতিবেদন বলে। এরপর মৃত্যুর কারণ ও ধরন জানতে ওই মৃতদেহকে ব্যবচ্ছেদ করে আরেকটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন ফরেনসিক চিকিৎসকেরা, যা ময়নাতদন্ত নামে পরিচিত।
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, মূলত ঘটনাটি হত্যা, আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা—বিষয়টি নির্ধারিত হয় ময়নাতদন্ত দিয়ে। তদন্ত কীভাবে হবে, সেটি নির্ভর করে এই প্রতিবেদনের ওপর। এতে ভুল তথ্য এলে পুলিশের তদন্তপ্রক্রিয়া মারাত্মক বিঘ্নিত হয়। কারণ, মূল বিষয়টিই তো ঠিক থাকছে না। পুলিশ সুরতহালে সঠিক তথ্য দিচ্ছে না, এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সবার দক্ষতা সমান থাকে না, তাই কিছু ভুলভ্রান্তি হতে পারে।
২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা গ্রামে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় গ্রাম্য সালিসে হেনাকে দোররা মেরে হত্যা করা হয়। কিন্তু সুরতহাল প্রতিবেদনে নড়িয়া থানার এসআই আসলাম উদ্দিন হেনার শরীরের কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই বলে উল্লেখ করেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেও বলা হয়, আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরে আদালতের আদেশে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে বলা হয়, হেনাকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে।
এইসব দিনরাত্রি নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র ‘টুনি’র ভূমিকার অভিনয় করেছিলেন নায়ার সুলতানা। ২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর রাতে গুলশান থেকে নায়ার সুলতানার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নায়ারের মা রাজিয়া সুলতানা বলেন, সুরতহালে আঘাতের বিষয়গুলোর উল্লেখ থাকলেও ময়নাতদন্তে আঘাতের উল্লেখ নেই। নায়ারের পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে লাশের পুনরায় ময়নাতদন্ত হয়। তবে লাশ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। প্রথম ময়নাতদন্তকারী সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, ময়নাতদন্তে যা তিনি পেয়েছেন, তা-ই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ডাক্তারি ভাষায় যেকোনো হ্যাংগিংই আত্মহত্যা, যতক্ষণ না এটি হত্যা বলে প্রমাণিত হচ্ছে।
অনিয়ম না অদক্ষতা: মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, ময়নাতদন্তে দক্ষতা ও প্রযুক্তির সংকটের কারণে অনেক সময় সঠিক তথ্য উঠে আসে না। তবে প্রভাবশালী মহলের চাপ ও টাকার কাছে নতিস্বীকার করেও অনেক সময় মিথ্যা প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাবিবুজ্জামান চৌধুরী বলেন, তিনি সাড়ে আট হাজারের বেশি ময়নাতদন্ত করেছেন। কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও অধিকাংশ চিকিৎসকই সঠিকভাবে ময়নাতদন্ত করে থাকেন। তবে ময়নাতদন্তে সঠিক তথ্য উঠে না আসার পেছনে একটি প্রধান সমস্যা হচ্ছে চিকিৎসকের অদক্ষতা। এঁদের একটা বড় অংশ তরুণ এবং কোনো প্রশিক্ষণ নেই। আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে চিকিৎসকদের একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো। কিন্তু চার-পাঁচ বছর ধরে সেটিও বন্ধ।
খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, ময়নাতদন্ত করার জন্য চিকিৎসকদের আলাদা কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের ব্যক্তিগত রোগী দেখার সুযোগ কম। ফলে অনেক চিকিৎসক এই কাজে আগ্রহ দেখান না।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান ও মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, দেশে ৩১টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সব মিলিয়ে ২০০ ফরেনসিক মেডিসিন ডাক্তার রয়েছেন। এর মধ্যে অধ্যাপক মাত্র একজন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন