default-image

‘আইজ থেইকা মেলা বছর আগের কথা, আছিল বানাইসা (বর্ষাকাল) মাস, বানাসের পানিতে এই আখাইলা (আখালিয়া নদী) নদীর দুইডা পার থই থই করত। আমার বিয়ার দিন এ নদীতে নৌকা ভাসায়া গেরামে আনছে পোলার বাপে, নিজের বাপের বাড়িতে নাইওর যাইতাম নৌকায় কইরা। এই নদী–খাল–বিলে মাছ ধইরাই চলত আমগো সংসার। এই নদীর মাছের কত যে স্বাদ আছিল, হায় রে হেই দিন কই গেল, অহন হেই অথাও (গভীর) নদী হইয়া গেছে মরা খাল। হেই পানিভরা আখাইলা হুকনা বালুচর, চৈইত (চৈত্র) মাসে নদীর বুকটা অহন খাঁ খাঁ করে পানির লাইগা।’

একবুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কথাগুলো গড় গড় করে বলে গেলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কুশমাইল গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব রমিছা বেগম।

default-image

চৈত্র মাসের শুকনা নদীর মতোই এখন অনেক স্মৃতিই শুকিয়ে গেছে রমিছার জীবন থেকে। যে নদীর পারে বসতভিটা, যে নদীর জলে ধুয়ে গেছে তাঁর জীবনের সব রং, যে নদীর জলেই তাঁর সন্তানেরা সাঁতার কাটত, মাছ ধরত কিংবা যে নদীর জলেই হয়তো রমিছার হবে অন্তিমকালের বরইপাতারœস্নান, সেই নদী এখন তাঁর মতোই মৃত্যুর প্রহর গুনছে। যেই আখালিয়া নদীর জলে নৌকায় তাঁকে বিয়ে করে আনা হয়েছিল, সেই আখালিয়াই এখন কালের আবর্তে তাঁর চোখের সামনে এভাবেই বিলীনের শেষ প্রান্তে, ধুঁকে ধুঁকে মরছে। শুধু আখালিয়াই নয়, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার অন্যতম প্রধান চার নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে এখন প্রায় বিলীনের পথে, নদীর পাশাপাশি শুকনো মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের জন্য যে খালগুলো ছিল, তা–ও গনিমতের মাল মনে করে অবৈধ দখলের মাধ্যমে স্থাপনা নির্মাণ এবং আবাদে ফসল চাষাবাদের দৌরাত্ম্যে নদী এখন সবুজ ধানখেতে পরিণত হয়েছে। নদীগুলো মরে যাওয়ার পাশাপাশি হারাতে বসেছে খাল–বিলের শেষ অস্তিত্বটুকুও।

নদীর জায়গাগুলো অবৈধ দখলমুক্ত করতে, নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে উপজেলার সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের দায়িত্ব থাকলেও আদৌ কেউ নদী রক্ষায় কোনো কাজ করছেন বলে চোখে পড়ে না।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার আখালিয়া, বানার, কলমদারি, বাজুয়াসহ চারটি নদীই সবচেয়ে বড়। একসময় রাস্তাঘাটের ব্যাপক সমস্যা ছিল, মানুষ নদীপথেই মালামাল আনা–নেওয়া করত। এসব নদীর বুক চিরে চলাচল করেছে স্টিমার, লঞ্চ ও নৌকা। নদী ভরাট এবং কোনোকালেই ড্রেজিং কিংবা খনন না করায় চারটি নদী নাব্যতা–সংকটে মৃতপ্রায়। এ সুযোগে নদী দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মহোৎসব চলছে। নদীর পাড় ও নদীর ওপর কনক্রিটের পিলার করে কেউ কেউ বহুতল ভবনও নির্মাণ করেছেন। অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে সরু হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

default-image

পৌর সদরের ভালুকজান ব্রিজ থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে তাকালে দেখা যায় আখালিয়া নদীর ওপর একটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ভবনটি থেকে উপজেলা ভূমি অফিসের দূরত্ব সর্বোচ্চ দেড় শ গজ। ভূমি অফিস থেকে কাজ বন্ধ রাখার জন্য নিষেধ করলেও রাতের আঁধারে কাজ চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আখালিয়া নদীর ওপর ভালুকজান ব্রিজের ওপারে উপজেলা ভূমি অফিস থেকে ২০০ গজ দূরে নদীর ওপারে গড়ে উঠেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেক স্থানে দখল করে আবাদি জমি তৈরি করায় নদী খুঁজে পাওয়া যায় না। একসময়ের খরস্রোতা আখালিয়া নদী এখন ভূমিদস্যুদের কবলে।

বানার নদী এখন সবুজ ধানখেত
সরেজমিনে উপজেলার বালুরঘাট বাজারের রাতাই খালে গিয়ে দেখা যায়, খালের জায়গা অবৈধ দখল নিয়ে মাছের বাণিজ্যিক ঘের নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী তালতলা বাজারের বানার নদীতে গিয়ে রীতিমতো আঁতকে উঠতে হয়। কেননা সেখানে নদীর অস্তিত্ব বিলীন, বানার নদী পুরোটাই এখন সবুজ ধানখেত। এমনো জায়গা দেখা যায়, যেখানে মাটি ভরাট করে চাষ হচ্ছে মৌসুমি সবজি। পার্শ্ববর্তী বাবুগঞ্জ বাজারের ইউনিয়ন পরিষদ–সংলগ্ন বানার নদী ভরাট করে উভয় পাশে গড়ে তোলা হয়েছে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫টি বসতবাড়ি ও দোকানঘর। অনেকে দখল করে এসব স্থাপনা ভাড়া দিয়েছেন।

default-image

ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণরামপুর মৌজার নকশা অনুযায়ী, বাবুগঞ্জ বাজারে মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া বানার নদীর প্রস্থ ৮২ ফুট। নদীটি ভরাট করে অবৈধভাবে বসতবাড়ি ও দোকানঘর নির্মাণ করায় এখন মূল নদীর ১৫ ফুট প্রস্থও নেই। খরস্রোতা বানার নদীটি ভরাট করে দখলের কারণে নাব্যতা হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। পৌর সদরের ভালুকজান ব্রিজ থেকে আখালিয়া নদীর অনেক স্থানে দখল করে আবাদি জমি তৈরি করায় নদী খুঁজে পাওয়া যায় না। খরস্রোতা আখালিয়া নদী এখন ভূমিদস্যুদের কবলে। নদী দখল করায় অনেক স্থানে নদীর রেখা খুঁজে পাওয়া যায় না।

পাটিরা বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একই নদীর দুই পাড় অনেকটা দখল হয়ে গেছে। বেশির ভাগ জায়গাতে নদী সরু হয়ে গেছে। নদীর পাড় দখল করে তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বাকতা ও নাওগাঁও ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে কেশরগঞ্জ বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কলমদারি নদীর দুই পাড় দখল করে অবৈধ স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়েছে।

default-image

কেশরগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী জামিল আজিজ বলেন, ‘নদী রক্ষার জন্য চেষ্টা করেছি, এখনো করে যাচ্ছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আমি মনে করি, মানুষ হত্যার মতোই জঘন্য অপরাধ নদী দখল করা, নদীকে মেরে ফেলা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদী দখল করে অবৈধভাবে দোকানঘর করে কেউ কেউ ভাড়া দিয়েছেন। নদী ভরাট ও দখলের কারণে বর্ষা মৌসুমে এলাকার শত শত একর জমির ফসল পানিতে নষ্ট হয়। দখলদারদের হাত থেকে নদীগুলো উদ্ধার ও ড্রেজিং করা বিশেষ প্রয়োজন।

বাবুগঞ্জ বাজার ব্রিজের দক্ষিণ পাশে নদীর ওপর পিলার তুলে বিল্ডিং নির্মাণ করে দখল করে নেওয়া হয়েছে। নদী ভরাট করে এবং বাঁশ ও সিমেন্টের খুঁটি ব্যবহার করে অনেকে দোকানঘর তুলেছেন। একই কায়দায় নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করাও হয়েছে। দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করার কারণে নদী ছোট হয়ে আসছে। বর্ষা মৌসুমে পানিনিষ্কাশন না হওয়ায় নিচু এলাকার ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

default-image

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুন্নাহার শেফা বলেন, ‘বানার, আখালিয়া নদীসহ অন্যান্য নদীতীরের ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। আমরা বেশ কিছু স্থাপনা নির্মাণে বাধা দিয়েছি। তা ছাড়া এই ফুলবাড়িয়া উপজেলার সব নদী ও খালগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ সারভেয়ার নদীরক্ষা কমিশনে পাঠিয়েছি। নদীরক্ষা কমিশন থেকে সিদ্ধান্ত পাওয়ামাত্রই নদী ও খালের জায়গাগুলো পুনরুদ্ধারের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

কামরুন্নাহার শেফা আরও বলেন, ‘নদী বা খালের জমি দখল আসলে এক দিনে হয়নি, তাই এটা শুধু ভূমি অফিসের একার কাজ নয়। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে এই অবৈধ স্থাপনা এবং দখলের বিরুদ্ধে একযোগে মাঠে নামব খুব তাড়াতাড়ি।’

*ইমতিয়াজ আহমেদ, ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহ

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0