রায়হান সুলতানা বললেন, বাবা-মা দুজনকেই সন্তানের দায়িত্ব নিতে হবে। বাবা সন্তানদের দেখবেন, তা বাড়তি পাওনা বলার কোনো যুক্তি নেই। তিনি তাঁর দায়িত্বটাই পালন করছেন। এটাই হওয়া স্বাভাবিক। সেভাবেই স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কটাকে তৈরি করে নিতে হবে।

সাজ্জাদ হোসেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সহকারী যোগাযোগ কর্মকর্তা। রায়হান সুলতানা ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রসের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। রায়হান সুলতানা বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটাচ্ছেন। সামনের মাসে অফিস শুরু করবেন।

বিশেষ করে যমজ সন্তানের মায়েদের বেশ কঠিন সময় পার করতে হয়, বললেন রায়হান সুলতানা। তিনি বলেন, ‘কফিশপে বসে ব্রেক নিলেও বাচ্চারা কী খাবে, কীভাবে চলবে, সংসারের ব্যবস্থাপনার মানসিক চাপের বেশির ভাগটাই যায় আমার ওপর দিয়ে। সারাক্ষণ চিন্তা তো থাকেই। সন্তান দুজন হওয়াতে টাকা বেশি খরচ হলেও আলাদা করে গৃহকর্মী রাখতে হচ্ছে। নিচতলার ফ্ল্যাটে শাশুড়ি থাকেন। মা আছেন। যখন দরকার তখন তাঁদের ডেকে আনি।’

চার বছর বয়সী রূপ ও কল্পের মা গণমাধ্যমকর্মী জেসমিন পাপড়িও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করার চেষ্টা করেন। বললেন, ‘মাঝে মাঝে ওদের বাবা মেয়েদের সঙ্গে থেকে আমাকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় বের করে দেন। অথবা ছুটির দিনে মেয়েদের ছবি আঁকতে বসিয়ে একটু বই পড়ি। ওরা ঘুম থেকে ওঠার আগে একটু হেঁটে আসি। এভাবে একটু একটু করে নিজের জন্য সময় বের করি।’ রূপ ও কল্পের বাবা এস এম আতিকও গণমাধ্যমকর্মী।

default-image

জেসমিন পাপড়ি বললেন, ‘দুটো একই বয়সী বাচ্চা সামলানো খুবই কঠিন কাজ। বিশেষ করে কর্মজীবী মা হলে। আমি সন্তানদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। কিন্তু নিজের কাজকেও খুব পছন্দ করি। সন্তানদের আবদারে কাজ যেমন বন্ধ রেখেছি তেমনি কাজের প্রয়োজনে সন্তানদের রেখে দূরেও গিয়েছি। এখন মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। স্কুল পছন্দ করে বলে আমার ওপর চাপটা কমেছে। আর যমজ হওয়ায় মেয়েরাই নিজেদের সঙ্গী বা বন্ধু হয়ে গেছে। একসময় অফিসের জন্য তৈরি হলে মেয়েরা কান্নাকাটি করত, এখন তারাই দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয় অফিসে যাওয়ার জন্য। নিজেদের সুবিধার জন্য উত্তরা থেকে বাসাটা পাল্টে নিয়েছি।’

গণমাধ্যমকর্মী রাবেয়া বেবীর দুই ছেলে আমান জামান আর আয়ান জামানের বয়স দুই বছর পাঁচ মাস। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় রাবেয়ার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তাই যখন শুনতে পান যমজ সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছেন তখন ভয় পেয়েছিলেন।

সংসার, চাকরি সামলে এখন বেশ ভালো আছেন রাবেয়া। বললেন, একটি বেসরকারি কোম্পানিতে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত স্বামী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, শাশুড়ি, ভাই, বোন, কাজের সাহায্যকারীসহ সবার সহায়তায় ছেলেদের বড় করতে ভোগান্তি বলতে গেলে তেমন একটা টের পেতে হচ্ছে না। তবে স্বজনেরা থাকলেও বাসায় কাজের সাহায্যকারী থাকা খুব জরুরি।

একবার ঈদে কাজের সাহায্যকারী না থাকার সময় ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে রাবেয়া বলেন, একজনকে খাওয়ানোর সময় আরেকজন পা ধরে বসে থাকত। একজনকে কোলে নিলে আরেকজনকে পায়ের ওপর নিয়ে বসে থাকতে হয়েছে। যমজ বাচ্চাদের একজন অসুস্থ হলে দেখা যায় আরেকজনও অসুস্থ হয়। তাই তাদের যাতে ঠান্ডা না লাগে, পাতলা পায়খানা না হয় তাই বেশি তটস্থ থাকতে হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ টিপু সুলতান ও উত্তরার মেডিকেল কলেজ ফর উইমেন অ্যান্ড হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক চিকিৎসক মিলিভা মোজাফরের যমজ ছেলেরা এখন নবম শ্রেণিতে পড়ছে। তবে এদের এ পর্যন্ত বড় করতে কাঠখড় একটু বেশি পোড়াতে হয়েছে।

default-image

ছেলেদের যখন দুই বছর বয়স তখন মিলিভা মোজাফরের কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে। এ ক্যানসারে পেটের বৃহদন্ত্রের অর্ধেক কেটে ফেলতে হয়। অস্ত্রোপচার, ১২ সাইকেল কেমোথেরাপিসহ প্রায় আড়াই বছর মিলিভা বিছানা থেকে নড়তে পারেননি।

কেমোথেরাপি চলার সময় ডেঙ্গু হয়, যা চিকিৎসকেরা প্রথমে ধরতেই পারেননি। পেট, ফুসফুসে পানি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে পরে নাক ও দাঁত দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়।

একই সঙ্গে মাসিক শুরু হয়। আর এই সংগ্রামের দিনগুলোতে মিলিভা পাশে পেয়েছিলেন মা আম্বিয়া হোসেনকে। বললেন, ‘আমার মায়ের জন্যই আমি বাঁচতে পেরেছিলাম। মা শুধু আমাকে দেখেননি, আমার ছেলেদেরও দেখেছেন।’

মিলিভা বললেন, তাঁর পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া শুরু হলে সবাই ভয় পেয়ে যায়। সবাই ভেবেছিল শরীরে ক্যানসার আবার ফিরে এসেছে। সেই খবর শুনে মা জায়নামাজে বসে বলেছিলেন তাঁর হায়াত যাতে মেয়েকে দিয়ে দেন সৃষ্টিকর্তা।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তিন দিন পর আবার যখন পায়খানা পরীক্ষা করা হলো তখন দেখা গেল, রিপোর্ট স্বাভাবিক এসেছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর মা মারা যান।

default-image

মিলিভা মায়ের পরই তাঁর স্বামীর অবদানের কথা তুলে ধরেন। জানালেন, হাসপাতালে মাসিকের স্যানিটারি প্যাড পাল্টানোসহ সব কাজ নিজের হাতে করেছেন। মা ও স্বামী পাশে না থাকলে তিনি তাঁর সংগ্রামে টিকে থাকতে পারতেন না। আর ছেলেরাও মায়ের কষ্ট বুঝতে পারে। মায়ের কাজে সাহায্য করে।

চিকিৎসায় মিলিভা এখন পুরোপুরি সুস্থ। আড়াই বছর বিছানায় থাকার পর তিনি আবার উচ্চতর পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। তবে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে নিতে মা মারা যান, তাই উচ্চতর ডিগ্রি পাওয়ার যে আনন্দ তা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন বলে আক্ষেপ করেন।

এই মায়েরা বললেন, যমজ সন্তানের মায়েদের মুখে হাসি দেখতে চাইলে পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারের সদস্যরা পাশে না থাকলে মায়েদের মুখের হাসির দেখা মিলবে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন