যাত্রার শুরু থেকেই যানজট

>
মহাসড়কের পিচ উঠে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল অনেক আগেই। জোড়াতালির মেরামত দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টাও হাঁ হয়ে বেরিয়ে এসেছে। বেহাল এই সড়কে যানবাহন চলছে হেলেদুলে।  গতকাল রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ি এলাকায়।  ছবি: মঈনুল ইসলাম
মহাসড়কের পিচ উঠে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল অনেক আগেই। জোড়াতালির মেরামত দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টাও হাঁ হয়ে বেরিয়ে এসেছে। বেহাল এই সড়কে যানবাহন চলছে হেলেদুলে। গতকাল রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ি এলাকায়। ছবি: মঈনুল ইসলাম
• ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের দূরত্ব ৩০৭ কিলোমিটার।
• এই মহাসড়কের ১৩৫ কিলোমিটার পথই বেহাল।
• এর মধ্যে অন্তত ২৮ কিলোমিটার খানাখন্দে ভরা।

রাজধানী থেকে উত্তরাঞ্চলে যাওয়ার গাড়িতে ওঠার আগেই যাত্রীদের কপালে ভাঁজ পড়ে। থেমে থেমে যানজটের মধ্যে যাত্রা শুরু হওয়ার পর আশুলিয়া, চন্দ্রায় তীব্র যানজটে পড়তে হয়। এরপর চার লেনের কাজের কারণে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের দুর্ভোগ। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা ও রংপুরে বেহাল সড়কে গাড়ি চলে হেলেদুলে।

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের দূরত্ব ৩০৭ কিলোমিটার। প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের সরেজমিন প্রতিবেদন বলছে, এই মহাসড়কের ১৩৫ কিলোমিটার পথই বেহাল। এর মধ্যে অন্তত ২৮ কিলোমিটার খানাখন্দে ভরা, চলাচল দুরূহ হয়ে পড়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর মেরামত করলেও তা টিকছে না। গত বর্ষা পুরোটাই গেছে জল-কাদায়। আর এখন শুকনো মৌসুমে ধুলার রাজ্য। সামনে বর্ষা, তাই শঙ্কায় দিন কাটছে এই পথে চলাচলকারী মানুষের।

সওজের হিসাবে, গত ৮ বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-সেতু নির্মাণ ও মেরামতে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে সিলেট, রংপুর, খুলনা ও বরিশালে যাওয়ার দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত দূরত্ব ১ হাজার ৬০ কিলোমিটার। কিন্তু এসব মহাসড়ক ঘুরে প্রথম আলোর ১৬ প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য বলছে, এই ৪ মহাসড়কের ৩৫০ কিলোমিটারই বেহাল।

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত অংশের পুরোটা ব্যবহার করে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলা এবং টাঙ্গাইল জেলার মানুষ। গাজীপুরেরও অনেককে এই পথ ধরে চলতে হয়। সেতু বিভাগের হিসাব অনুসারে, বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে প্রতিদিন ১৪ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করে।

হানিফ পরিবহনের রংপুরের ব্যবস্থাপক আবদুল হোসেন বলেন, রাস্তায় বড় বড় গর্তের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। সেই সঙ্গে ঢাকা যেতে সময় অনেক বেশি লাগছে। এ ছাড়া প্রতিদিনই গাড়ির ছোট ছোট যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে।

চার লেনের কাজ ও সরু সেতুতে যানজট

জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। কাজ শুরু হয়েছে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা।

গত বুধবার দুপুরে মির্জাপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার সড়ক ঘুরে দেখা যায়, শুধু মির্জাপুরের গোড়াই বাজার এলাকায় সড়ক প্রশস্ত হয়নি। এ ছাড়া প্রায় সব স্থানে সড়ক চার লেন হয়ে গেছে। কোথাও বাম পাশের লেনে কাজ হচ্ছে, কোথাও ডান পাশে। এর ফলে লেন পরিবর্তন করতে গিয়ে যানবাহন জটে পড়ছে। মহাসড়কের কদিমধল্লা, আছিমতলা, পাকুল্লা, জামুর্কি, নাটিয়াপাড়া, মাদারজানি, ভাতকুড়া, রসুলপুর, এলেঙ্গাসহ বিভিন্ন সেতুর সামনে যানজট দেখা যায়।

টাঙ্গাইলের ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) রফিকুল ইসলাম বলেন, সরু সেতুর মুখে এসে যানজট হচ্ছে। আর এই জট ছাড়াতে এখন তিন গুণ বেশি সময় লাগছে।

যানজটের পাশাপাশি এই মহাসড়কের টাঙ্গাইল থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়কে প্রচণ্ড ধুলা। এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে বগুড়া থেকে ঢাকাগামী ট্রাকের চালক আবদুল্লাহ মিয়া বলেন, ‘গাড়ি জোরে গেলে অবস্থা এমন হয় যে ধুলার কারণে চোখে কিছু দেখা যায় না।’

চন্দ্রা-এলেঙ্গা চার লেন প্রকল্পের পরিচালক জিকরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ভালো। ৫৫ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী জুন থেকেই চার লেনের সুবিধা জনগণ পেতে শুরু করবে।’

সিরাজগঞ্জে ২০ কিলোমিটার বেহাল

মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের নলকা সেতুর পূর্ব অংশ থেকে শুরু করে হাটিকুমরুল গোলচত্বর পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার অংশের অবস্থা বেশ খারাপ। মমতাজ ফিলিং স্টেশনের সামনে, পাচিলা, ধোপাকান্দি, ফুলঝোর এলাকায় মহাসড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে। দুই পাশ ধসে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। গোলচত্বর থেকে সাহেবগঞ্জ, গুরকা, চাঁদপুর, ভূঁইয়াগাতি, চান্দাইকোনা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটারে খানাখন্দে ভরা।

সিরাজগঞ্জের সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহাদ উল্লাহ বলেন, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে রংপুর পর্যন্ত চার লেন হবে। এ জন্য শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে।

বগুড়ায় সংস্কারে ১০ বছরে ব্যয় শতকোটি টাকা

মহাসড়কের শেরপুরের চান্দাইকোনা থেকে চারমাথা হয়ে শিবগঞ্জের রহবল পর্যন্ত বগুড়ার ৬৫ কিলোমিটার অংশ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে গত ১০ বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় শতকোটি টাকা। তবু এখনো তা বেহাল।

সওজের বগুড়া কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আগে বগুড়া অংশ ছয় ভাগে ভাগ করে সংস্কার করা হচ্ছে। এর জন্য সাড়ে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, মাটিডালি মোড় এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার বেহাল। কোথাও কোথাও ভেঙে লাল ইট বেরিয়েছে। গাড়ি চলছে হেলেদুলে। মাটিডালি মোড়ে ট্রাকচালক শাহীন মিয়া বলেন, মাটিডালি থেকে রহবল পর্যন্ত বেশি বেহাল। এ ছাড়া বগুড়ার বাইপাস সড়কের তিনমাথা এলাকায় সড়ক ভাঙাচোরা। বগুড়ার বাইপাস সড়কের পুরান বগুড়া থেকে পালসা ও ছোট বেলাইল থেকে ফুলতলা এলাকায় সড়কের এক পাশ দিয়ে উঁচু ঢিবি দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।

বগুড়া সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যে কোনো অংশে কার্পেটিং উঠে গেলে তা মেরামত করে দিতে বাধ্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটারে ১ কোটি টাকা হিসাবে ৬৫ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে প্রতি ৩ বছর পর ব্যয় হওয়ার কথা ৬৫ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী ১০ বছরে সংস্কারব্যয় ২০০ কোটি টাকার ওপর। কিন্তু বাস্তবে ব্যয় হয়েছে অনেক কম। তা ছাড়া ১৯৯০ সালে নির্মিত এ মহাসড়কের জীবনকাল ২০১০ সালেই শেষ হয়েছে।

গাইবান্ধায় কার্পেটিং উঠে খানাখন্দ

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের গাইবান্ধা জেলার অংশ ৩২ কিলোমিটার। গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল বাসার বলেন, গত ৭ মাসে মহাসড়কটির এ অংশে ৩২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৬ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। এর জন্য বেহাল সড়ককেই দায়ী করছেন স্থানীয় লোকজন।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের কোথাও কোথাও গর্তের জায়গায় ইট বিছানো। ইট বিছানো স্থান আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও মহাসড়ক দেবে গেছে। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা শহরের চারমাথা এলাকায় মহাসড়ক-সংলগ্ন দুটি সড়কে নর্দমার কাজ চলছে। এ কারণে মহাসড়কের দুই পাশে পানি জমেছে। এখানে সব সময় যানজট লেগে থাকছে।

বগুড়ার পঞ্চাশোর্ধ্ব আবদুল জব্বার চাকরি করেন গাইবান্ধা শিক্ষা কার্যালয়ে। প্রতিদিন ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ধরে বাসে যাতায়াত করেন। বাসে ওঠার সময় নিজের সুরক্ষার জন্য কোমরে বেল্ট বাঁধেন তিনি। বলেন, ‘মহাসড়কের যে অবস্থা, যানবাহন চলে লাফিয়ে। বেল্ট না বেঁধে উপায় কী।’

রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকার ট্রাকচালক জালাল উদ্দিন বলেন, মহাসড়কের ভাঙাচোরা অংশে পড়ে ট্রাকের এক্সেল, টিউব ও পাতি ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটছে। টায়ারে বেশি চাপ পড়ে ফেটে যাচ্ছে। ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর কারণে জ্বালানি খরচ বেড়ে গেছে।

জানতে চাইলে গাইবান্ধা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়কে সংস্কারকাজ চলছে। ইতিমধ্যে পলাশবাড়ী উপজেলা শহরের আড়াই কিলোমিটার সংস্কার হয়েছে।

রংপুরে গাড়ি চলে হেলেদুলে

রংপুর অংশে মহাসড়ক ৪২ কিলোমিটার। এর মধ্যে পীরগঞ্জ উপজেলার মাদারপুর থেকে লালদীঘি পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার খুবই বেহাল। শায়েস্তাপুর, পাকাপুল, খেজমতপুর, পীরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড ও বন্দর, কলাবাগান, লালদীঘিতে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এসব স্থানে এসে যানবাহনের গতি একেবারে কমে যায়। রাস্তার এপাশ-ওপাশ করে গাড়ি হেলেদুলে চলে।

রংপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, সড়ক মেরামতে ৫২ কোটি টাকার দুটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বর্ষার আগেই রাস্তার কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পীরগঞ্জের লালদীঘি থেকে রংপুরের মডার্ন মোড় পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটারের ১১ কিলোমিটারজুড়ে সড়ক উঁচু-নিচু। কোথাও রাস্তা দেবে গেছে।

ঢাকা-রংপুরের বেহাল মহাসড়কের বিষয়ে বগুড়া শিল্প ও বণিক সমিতির পরিচালক ও শাহ সুলতান শিল্প গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল গফুর বলেন, ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর বগুড়া থেকে বাসে করে ৪ ঘণ্টায় ঢাকায় পৌছানো যেত। এখন সময় লাগে ১০-১২ ঘণ্টা। আর পণ্যবাহী ট্রাকের লাগে আরও বেশি, ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা। বেহাল সড়কের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। উত্তরবঙ্গের কৃষি ও শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে আগে সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। বারবার সংস্কারের নামে রাষ্ট্রের টাকা অপচয় না করে মহাসড়ক দ্রুত চার লেনে উন্নীত করতে হবে।

(প্রতিবেদন তৈরি করেছেন আরিফুল হক, রংপুর, এনামুল হক, সিরাজগঞ্জ, শাহাবুল শাহীন, গাইবান্ধা, কামনাশীষ শেখর, টাঙ্গাইল ও আনোয়ার পারভেজ, বগুড়া)