বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

পাঁচ বছর আগেও ঢাকায় কোনো বাস কাউন্টারে নারী টিকিট বিক্রেতা দেখা যেত না। ‘পুরুষের পেশা’য় হাসি ও লির মতো নারীরা প্রবেশ করেছেন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর বুধবার বেলা ২টার দিকে কাউন্টারে বসে তাঁদের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁরা বলেন, প্রথম দিকে যাত্রীদের অনভ্যস্ত চোখ ধাক্কা খেত এই দৃশ্যে। এখন আর এই বাসের নিয়মিত যাত্রীরা অবাক হন না।
হাতিরঝিলের এইচআর ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিসের মোট ৮টি কাউন্টারে ২ পালায় কাজ করেন ২২ কাউন্টার মাস্টার। এর মধ্যে ১০ জন নারী। নারীদের তিনজন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার। এ ছাড়া প্রতিটি কাউন্টারে একজন পুরুষ লাইনম্যান আছেন, যিনি বাসগুলো দাঁড়ানো এবং টিকেট কেটে যাত্রীদের বাসে ওঠার বিষয়টি শৃঙ্খলায় রাখতে কাজ করেন। সকালের পালা চলে সকাল সাতটা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত। বিকেলের পালা বেলা ৩টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। নারীরা সকালের পালায় কাজ করেন।

পড়াশোনার ফাঁকে কাজ করেন হাসি

টাঙ্গাইলের একটি বেসরকারি কলেজে সমাজকল্যাণ বিষয়ে সম্মান তৃতীয় বর্ষে পড়েন হাসি। তিন বছর আগে এই চাকরি নেন। চাকরি পেয়ে মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে চলে আসেন কর্মস্থলের কাছাকাছি মহানগর এলাকার ভাড়া বাসায়। হাসি জানান, বাবা মারা গেছেন বেশ আগে। বড় ভাই বিয়ে করে আলাদা বসবাস করেন। বড় বোনও বিয়ে করে সংসারী। এখন তিনজনের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। হাসি বলেন, ‘আমার কখনো মনে হয়নি, এই কাজ মেয়েদের জন্য নয়। বাসা থেকেও কখনো বাধা আসেনি। আর্থিক সংকটে সংসার চালাতে লড়াই করতে হয়। কিন্তু কখনো চাকরিটা নিয়ে দ্বিধা কাজ করেনি।’

হাসি জানান, সকালের পালায় এই কাউন্টারে গড়ে ৬০ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়। রামপুরা থেকে পুলিশ প্লাজা পর্যন্ত ভাড়া ১০ টাকা, সাত রাস্তার মোড় পর্যন্ত ১৫ টাকা এবং পুরো হাতিরঝিল চক্করে ভাড়া ৩০ টাকা। অনেকে হাতিরঝিল ঘুরে দেখার জন্য টিকিট কাটেন।

default-image

ডেটা এন্ট্রির কাজ ছেড়ে এই চাকরিতে লি

টাঙ্গাইলের বাসিন্দা লি হিনা উচ্চমাধ্যমিক পাস। ঢাকায় আসেন ২০১০ সালে। ওই সময় তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৬ সালে কাউন্টার মাস্টারের চাকরি নেন। চার বোন মিলে থাকেন রাজধানীর নর্দ্দায়। চারজনই কর্মজীবী।

লি বলেন, বাসগুলো ঘুরে ঘুরে আসতে থাকে, সেই সঙ্গে যাত্রীরাও আসেন। ফলে সব সময় হাত ও মাথা চালু রাখতে হয়। কে কোন টিকিট চাইছেন, কত টাকা দিলেন, কত টাকা ফেরত পাবেন, তা দ্রুত হিসাব রেখে কাজ করতে হয়।
তিনি জানান, প্রথম প্রথম নিয়মিত যাত্রীরা টিকিট কাটতে কাউন্টারে এসে মেয়েদের দেখলে অবাক হতেন। এখন আর কেউ অবাক হন না।

কাউন্টারে বসার আসন, খাওয়ার পানির ব্যবস্থা এবং ফ্যান রয়েছে। তবে নিজস্ব শৌচাগার নেই। এর জন্য নির্ভর করতে হয় গণশৌচাগারের ওপর।

যাত্রীরা যা বলেন

বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী অমর চন্দ্র দাস। তিনি এখানে নিয়মিত যাত্রী। প্রথম আলোকে বলেন, কাজের দক্ষতার দিক দিয়ে এই কাউন্টারের পুরুষ ও নারীর কাজে তিনি কোনো তফাত খুঁজে পাননি। তাঁর কাছে কাউন্টার মাস্টার হিসেবে নারী নিয়োগের বিষয়টি বেশ উৎসাহব্যঞ্জক বলে মনে হয়।

কর্মজীবী নারী ফারহানা ইয়াছমিনকে অফিসে যেতে এই বাসে নিয়মিত উঠতে হয়। তিনি প্রথম আলোকে একদিনের একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, সকাল সোয়া নয়টার দিকে কাউন্টারের সামনে তিনিসহ চার–পাঁচজন টিকিটের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবার সামনে থাকা এক ছেলে ৫০০ টাকার নোট দেন। নারী কাউন্টার মাস্টার সেই টাকার ভাংতি দিতে গেলে টিকিট দিতে কয়েক সেকেন্ড দেরি হয়। সঙ্গে সঙ্গে লাইনের শেষে দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রী বলে ওঠেন, মহিলা মানুষ এখানে রাখার কী আছে? মহিলা মানুষ সব জায়গায় রাখা ঠিক নাকি? ফারহানা বলেন, ‘আমি ওই লোকটির উদ্দেশে বললাম, “মহিলা মানুষদের কোন কোন জায়গায় রাখা যায়?” ওই সময় অন্য যাত্রীরাও ওই লোকের আচরণ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলে লোকটি চুপসে যান।’ ফারহানা বলেন, এই কাউন্টারে প্রতিদিন নারীদের কাজ করতে দেখে কর্মজীবী নারী হিসেবে তাঁর গর্ব হয়।

যেভাবে নারীরা নিয়োগ পেয়েছিলেন

২০১৬ সালে হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু হয়। শুরু থেকেই এই সার্ভিসের কাউন্টারে নিয়োগ পান নারীরা। এর নেপথ্যের কথা বলতে গিয়ে এইচ আর ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, থাইল্যান্ডে তিনি বাস কাউন্টারে মেয়েদের কাজ করতে দেখেছেন। দেশে গুলশানের একটি শিশুপার্কে বিভিন্ন রাইডের কাউন্টারে মেয়েদের টিকিট বিক্রেতা হিসেবে দেখেছেন। এরপর হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু হওয়ার পর ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অনেক মেয়ে চাকরির জন্য আবেদন করলে তিনি মনস্থির করেন, মেয়েদের নিয়োগ দেবেন।

আবদুল হালিম বলেন, ‘প্রথমে আট মেয়েকে নিয়োগ দিই। সবাই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ছিলেন। এখন এই চাকরি নিয়ে নেতিবাচক ধ্যানধারণা আর নেই। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে। মেয়েদের জন্য শৌচাগারের কী ব্যবস্থা আছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাতিরঝিলের গণশৌচাগার ব্যবহার করেন মেয়েরা। গণশৌচাগার হলেও সেগুলো অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। তিনি বলেন, কাউন্টার মাস্টারদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। পড়াশোনার ফাঁকে আয় করেন। সর্বনিম্ন ৭ হাজার থেকে ১৭–১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন রয়েছে এই পদে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন