যানজট, বিশৃঙ্খলা ও ধুলার শহর কুমিল্লা

বিভিন্ন উন্নয়নকাজের জন্য কুমিল্লা শহরের অধিকাংশ রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি করছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন। ফলে চলাচলে ভোগান্তিতে পড়ছেন কুমিল্লাবাসী। সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের। গত রোববার শহরের কান্দিরপাড় টাউন হলের সামনের রাস্তা থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
বিভিন্ন উন্নয়নকাজের জন্য কুমিল্লা শহরের অধিকাংশ রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি করছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন। ফলে চলাচলে ভোগান্তিতে পড়ছেন কুমিল্লাবাসী। সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের। গত রোববার শহরের কান্দিরপাড় টাউন হলের সামনের রাস্তা থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো

কুমিল্লা শহরের প্রধান সমস্যা কী? এ প্রশ্নের উত্তরে বেশির ভাগ নাগরিক বলেছেন, যানজট, ধুলা, ভাঙাচোরা সড়ক ও অবৈধ যানবাহন। শহরে এখন বৈধ যানের চেয়ে অবৈধ যানের সংখ্যাই বেশি। সড়ক থেকে ভবন নির্মাণ—সবখানেই বিশৃঙ্খলা। পরিবেশবাদীদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণই কুমিল্লার এক নম্বর সমস্যা।
চলতি মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের এক কর্মদিবস। সকাল ১০টা। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দপ্তরে গিয়ে দেখি মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কুর কক্ষ তালাবদ্ধ। বড় কর্তা না আসায় ভবন প্রায় ফাঁকা। অথচ সন্ধ্যায় গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড। মেয়রের দপ্তর লোকারণ্য। ঠিকাদার থেকে সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা ভিড় জমিয়েছেন। মেয়র পাশের ছোট্ট কক্ষে বসে ফাইলপত্র দেখছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, মেয়াদের শেষে এসে সড়ক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কেন?
খানিকটা কৈফিয়তের সুরে মেয়র বললেন, শহরের সড়ক সংস্কার ও ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু জাইকার অর্থ পেতে দেরি হয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বাজেট ৩০০ কোটি টাকার মতো। আর জাইকার প্রকল্পেই ব্যয় হচ্ছে ১৮৬ কোটি টাকা।
সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৮২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে মূল শহরের ১৮টি ওয়ার্ডে ১৪৭ কিলোমিটার এবং উপকণ্ঠের নয়টি ওয়ার্ডে ৩৩৫ কিলোমিটার। বেশির ভাগেরই অবস্থা নাজুক। গ্রীষ্ম না আসতেই কান্দিরপাড় থেকে পুলিশ লাইন পর্যন্ত ৮৩০ মিটার সড়কে কাটাকাটি চললেও কবে পিচ দেওয়া হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে গোটা এলাকাই ধুলাময়। মানুষকে নাক চেপে যেতে হয়।
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আফজল খানকে হারিয়ে মেয়র হন বিএনপির নেতা মনিরুল হক। সেই হিসাবে তাঁর মেয়াদ আছে মাত্র ১০ মাস। নাগরিকদের অভিযোগ, গত চার বছরে মেয়র রুটিন কাজের বাইরে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন করতে পারেননি। তবে মেয়র বলছেন, সীমিত সামর্থ্য সত্ত্বেও তিনি নগরবাসীর চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করেছেন। কান্দিরপাড়ে ছয়তলা ‘সিটি মার্কেট’ গড়ে তোলা, সড়ক প্রশস্ত করা, পয়োনিষ্কাশনের কাজ শুরু করাকে তিনি সাফল্য হিসেবেই দেখছেন।
নগরবিদদের মতে, সিটি মার্কেটে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় কান্দিরপাড়ে যানজট বাড়ছে।
সূত্র বলেছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. ওমর ফারুক বলেন, কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় নিউমার্কেটে নকশাবহির্ভূতভাবে মানুষের হাঁটার জায়গায় বারান্দার মধ্যে ছয়টি দোকান করে এটিএম বুথ তৈরি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সচিব মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘কীভাবে দোকান হচ্ছে, তা আমি বলতে পারব না। সিটি করপোরেশনে নকশা অনুমোদনের সঙ্গে প্রধান নির্বাহী, সচিব ও প্রকৌশলীরা জড়িত নন।’
শাসনগাছা এলাকার বাসিন্দা হুমায়ুন কবীর বলেন, কান্দিরপাড় পূবালী ব্যাংক চত্বর থেকে ধর্মপুর পর্যন্ত সড়কের মধ্যে নিম্নমানের বিটুমিন দেওয়া হয়েছে। পিচ ও বিটুমিন দেওয়ার দুই দিন পরই বৃষ্টি হয়। এতেই ওই সড়কের কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর বলেন, নির্ধারিত দামের চেয়ে অতি কম দামে কাজ দিলে ওই কাজের গুণগত মান ভালো থাকে না। সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন সড়কের নির্মাণকাজ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি নির্ধারিত তাপমাত্রায় বিটুমিন গলানো হয়। কিন্তু মেশিন দিয়ে বিটুমিন না গলানোর কারণে এটি অতি তরল হয়ে যায়। ওই তরল বিটুমিনই ওই সড়কে দেওয়া হয়। যে কারণে কাজের মান খারাপ হয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে মেশিনের মাধ্যমে বিটুমিন গলানোর নির্দেশ দেওয়া হলে ঠিকাদারেরা এক সপ্তাহ কাজ বন্ধ রাখেন।
একজন ঠিকাদার বলেন, কুমিল্লায় ওই মেশিন নেই। সাধারণত সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাজে ওই মেশিন ব্যবহার করা হয়।
অবৈধ যান: কুমিল্লা শহরে রিকশার লাইসেন্স রয়েছে ১০ হাজার ৫৩০টি। রিকশা চলে অন্তত ৩০ হাজার। ইজিবাইকের লাইসেন্স রয়েছে ৩০০টির। চলে কমপক্ষে ৩০ হাজার। আছে ব্যাটারিচালিত রিকশাও। সিটি করপোরেশনে ট্রাফিক পয়েন্ট রয়েছে ছয়টি। কিন্তু জনবল কম। ফলে কান্দিরপাড়, বাদুরতলা, রাজগঞ্জ, চকবাজার, টমছমব্রিজ এলাকায় যানজট লেগে থাকে। ফুটপাত না থাকায় বাধ্য হয়ে পথচারীদেরও সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করতে হয়।
যেসব সিটি করপোরেশনে বিরোধীদলীয় মেয়র জয়ী হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেবল বরিশাল ও কুমিল্লার মেয়রই স্বপদে বহাল আছেন। শোনা যায়, তাঁরা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা কিংবা সাংসদের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলছেন। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মেয়র মনিরুল বলেন, ‘নগরবাসীর উন্নয়নের স্বার্থেই স্থানীয় সাংসদের সহযোগিতা নিচ্ছি। তিনিও জনপ্রতিনিধি।’