যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কে গুণগত পরিবর্তন চায় বাংলাদেশ
* যুক্তরাজ্যে বসছে ঢাকা-লন্ডন কৌশলগত সংলাপ
* ব্রেক্সিটের পর প্রথম বৈঠক বৃহস্পতিবার
* সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথনকশা নিয়ে আলোচনা হবে
* আফগানিস্তান ও মিয়ানমার নিয়ে জানাবোঝার চেষ্টা হবে
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বের হয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) পর দেশটির সঙ্গে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক আলোচনায় বসছে বাংলাদেশ। দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবদের নেতৃত্বে কাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় কৌশলগত সংলাপে উভয় দেশের সম্পর্কের পথনকশা ঠিক করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখল এবং মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য একে অন্যের অবস্থান জানাবোঝার চেষ্টাও করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গত সোমবার প্রথম আলোকে জানান, ব্রেক্সিটের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকটি হচ্ছে। সামগ্রিক পর্যালোচনার পর ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রবিষয়ক সমন্বিত নীতিমালা গত মার্চে চূড়ান্ত করা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে কৌশলগত সংলাপের বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে। তা ছাড়া কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তিতে এসে বাংলাদেশ সম্পর্কের গুণগত মানে পরিবর্তন আনার ওপর জোর দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, নিয়মিতভাবে কৌশলগত সংলাপের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক আলোচনার ফোরাম গঠনের বিষয়টি বাংলাদেশ এবারের আলোচনায় তুলবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া দুই দেশের কৌশলগত সংলাপ ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিয়মিতভাবেই হয়েছে। চতুর্থ সংলাপটি গত বছর হওয়ার কথা থাকলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে তা হতে পারেনি। সেই আলোচনা এবার লন্ডনে কাল বসছে। এ বৈঠকে করোনা–কূটনীতি, টিকাসহ মহামারির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে। বিশেষ করে সংক্রমণের হার বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশকে লাল তালিকা থেকে বাদ দিতে অনুরোধ জানানো হবে। এ ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের সংক্রমণ পরিস্থিতির ধারাবাহিক উন্নতিসহ সামগ্রিক তথ্য যুক্তরাজ্যের কাছে তুলে ধরা হবে।
আসন্ন কৌশলগত সংলাপের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা যুক্তরাজ্যসহ আমাদের বড় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কে গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। আমরা উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে সম্পর্ককে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত পর্যায়ে নিতে আগ্রহী। এমনকি মিয়ানমার, আফগানিস্তান পরিস্থিতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, সাইবার নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে সহযোগিতা জোরদারের কথা ভাবছি। ব্রেক্সিট ও যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক নীতিমালা পর্যালোচনার পর এ বৈঠক হচ্ছে বলে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।’
সমসাময়িক আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে কি না, তা জানতে চাইলে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো বৈঠকটি হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাজ্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাতের পর যুক্তরাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাটা বাংলাদের জন্য জরুরি। আরেকটি বিষয় বুঝতে হবে, আফগান পরিস্থিতি নিয়ে তারা কী ভাবছে। হয়তো তারা এ ব্যাপারে বাংলাদের অবস্থানও জানতে চাইবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন। আর লন্ডনের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির পার্মান্যান্ট আন্ডার সেক্রেটারি ও হেড অব ডিপ্লোমেটিক সার্ভিস ফিলিপ বার্টন।
দুই দেশের কূটনীতিক সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর পাশাপাশি সহযোগিতার ভবিষ্যৎ ক্ষেত্র হিসেবে তথ্য, যোগাযোগপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও গবেষণার মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন দুই দেশের সহযোগিতার একটি বড় ক্ষেত্র। স্বাভাবিকভাবে এ বছরের নভেম্বরে গ্লাসগোতে অনুষ্ঠেয় জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের আগে এ বিষয়ে দুই দেশ কীভাবে একে অন্যকে সহায়তা করবে এবং দুই দেশের অংশীদারত্বের উপাদানগুলো কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
ইইউ অগ্রাধিকারমূলক বাজার–সুবিধার আওতায় যুক্তরাজ্যের কাছ থেকেও একই সুবিধা পেত বাংলাদেশ। এখন ব্রেক্সিটের পর বাংলাদেশ এ সুবিধা কতটা পাবে, তা একটি প্রশ্ন। আবার মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। ফলে, ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক কোথায় যাবে, তা নিয়ে লন্ডনের বৈঠকে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ছে। যদিও বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যবসার পরিবেশের উন্নয়ন নিয়ে এখনো যুক্তরাজ্যের কিছু প্রশ্ন রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতার কথা যুক্তরাজ্য বলতে চায়, সেগুলো নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
ব্রিট-বাংলা বন্ধন
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তিতে ‘ব্রিট-বাংলা বন্ধন’ স্লোগান নিয়ে পদক্ষেপ নিতে চায় যুক্তরাজ্য। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিষয়টিকে মাথায় রেখে কীভাবে দুই দেশ একসঙ্গে সম্পর্কের ৫০ বছর উদ্যাপন করতে পারে, তা নিয়ে কৌশলগত সংলাপে আলোচনা হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারিভাবে আয়োজনের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে এ উদ্যাপনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করে বাংলাদেশ। প্রাথমিকভাবে এ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সফরের পরিকল্পনা ছিল। এখন সেটি অন্যভাবে করার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
নতুন কাঠামো চায় বাংলাদেশ
দুই দেশের সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তিতে এসে এর গুণগত পরিবর্তনে আগ্রহী। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কৌশলগত সংলাপের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক আলাদা ফোরাম গঠন করতে চায়। বিষয়ভিত্তিক এসব ফোরামে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে সহযোগিতা আরও জোরদার করা হবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসরণে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অভিবাসন সংলাপের আয়োজন করা যেতে পারে। কাল লন্ডনে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবদের বৈঠকে বাংলাদেশ এ প্রস্তাব দেবে।
পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ইতিমধ্যে দুই দেশ কৌশলগত সংলাপ নিয়মিত আয়োজন করছে। এখন সহযোগিতার অন্য ক্ষেত্রগুলোয় জোর দিয়ে বিশেষায়িত আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।