জাতীয় মুক্তির এই উপাখ্যানের ভেতরে ছিল আরও বহু বিষয়। যেমন বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়কে বিপদে ফেলা (নারী, হিন্দু ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তা), স্থানীয় প্রতিহিংসা বা ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো; ছিল বিভিন্ন বর্ণের জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা, সহিংসতা ও ধ্বংসের ঘটনা, মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং ব্যক্তিগত সাহস ও উৎসর্গের হাজারো কাহিনি। একইভাবে যে বিষয়টি সমান গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখা জরুরি, তা হলো যুদ্ধটা ছিল দুটি বড় ভূরাজনৈতিক খেলার একটা অংশ: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন ক্ষমতাধর দেশগুলোর ভেতর লড়াই।

১৯৭১ সালজুড়েই বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমগুলোয় এই দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে। এতে করে বাংলাদেশ তখন সারা বিশ্বের ঘরে ঘরে উচ্চারিত নাম হয়ে উঠেছিল। এর আগে কখনো বাংলা নামের এই বদ্বীপ আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ এভাবে পায়নি।

পাকিস্তানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

এই বদ্বীপের জন্য ২৫ মার্চ ছিল কালরাত। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক সেদিনকার শেষ প্লেনে ঢাকা ছাড়েন অত্যন্ত চুপিসারে। যাওয়ার আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের ওপর সর্বাত্মক সামরিক হামলা চালানোর নির্দেশনা রেখে যান। এটা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করে দেওয়া ও পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কঠোর শাস্তিমূলক এক অভিযান। পরদিন ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেতার সম্প্রচারে অনেকটা এ কথাই বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা, সংহতি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব। আমরা তাদের সেই দায়িত্ব পালন ও পুরোপুরিভাবে সরকারের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছি...দেশের মানুষের কাছে আমার আবেদন আপনারা পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করুন। যা কিছু ঘটেছে তার দায় পাকিস্তানবিরোধী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর বর্তায়।’

এই সশস্ত্র হামলার (যার নামকরণ করা হয়েছিল অপারেশন সার্চলাইট) নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল টিক্কা খান। অল্প দিনের ভেতরেই তিনি ‘বাংলার কসাই’ নামে পরিচিতি পেলেন। সেনাশাসকেরা বিরোধী বাঙালিদের কেন্দ্র হিসেবে যে জায়গাগুলোকে শনাক্ত করেছিলেন, সে জায়গাগুলোতেই চালানো হয় নারকীয় হামলা। ট্যাংক, আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার আর সেনাবাহিনীদের নিশানায় ছিল বাঙালি দুটি প্রতিষ্ঠান। তাদের গুঁড়িয়ে দিতে নানা দিকে ছড়িয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। এ দুটি প্রতিষ্ঠান ছিল পুলিশ এবং আধা সামরিক ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)। পাকিস্তানিদের ধারণা ছিল, সশস্ত্র এ দুটি বাহিনী তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম। তীব্র যুদ্ধের পর এগুলোও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। পরে সেনাবাহিনী ছুটল বস্তিগুলোর দিকে। তারা এসব জায়গায় আগুন লাগিয়ে দিল, তারপর পালিয়ে যেতে থাকা অধিবাসীদের গুলি করে হত্যা করল।

তাদের ৩ নম্বর গন্তব্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে অসহযোগ আন্দোলন শুরুর কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যক্রমে অনেকেই তখন বাড়িতে ছিলেন। তারপরও সৈন্যরা ক্যাম্পাস তছনছ করে ফেলল, ছাত্রাবাসে মর্টার হামলা চালিয়ে হত্যা করল বহু ছাত্র ও শিক্ষককে। এতেই শেষ নয়, তাড়াহুড়ো করে বসানো ব্যারিকেড ধ্বংস করে দিয়ে এবার তাদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দুটি প্রধান প্রতীক। এর প্রথমটি ছিল শহীদ মিনার (ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত স্তম্ভ)। তারা শহীদ মিনারকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল।

দ্বিতীয় প্রতীক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বেশির ভাগ আওয়ামী লীগ নেতার মতো শেখ মুজিবুর রহমান আত্মগোপনে যেতে রাজি হননি। কোনোভাবেই যেন শহীদের তকমা না জোটে, সেই চেষ্টা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা থেকে বিরত থাকল। এর পরিবর্তে তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেল। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ তোলা হলো।

সেনাবাহিনীর এই ভীতিজাগানিয়া নারকীয় হামলার প্রথম কয়েক ঘণ্টায়, গোটা ঢাকা শহর থেকে লোকজনকে তাঁদের বাড়ি থেকে তুলে আনা হলো। নির্বিচার হত্যা করা হলো তাঁদের। এই তুলে নিয়ে হত্যা করাকে সেনাবাহিনীর লোকেরা ঠাট্টা করে বলত, ‘বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হলো’। মৌখিকভাবে এবং পরে লিখিত আদেশে হিন্দু নাগরিকদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার শাঁখারীপট্টিতে (শাঁখারীরা শঙ্খ দিয়ে অলংকারাদি গড়েন) কারিগরদের বাস সেই প্রাচীনকাল থেকে। শাঁখারীপট্টিতেও হামলা চালানো হলো, খুন করা হলো সেখানকার হিন্দু বাসিন্দাদের। সহিংসতার চূড়ান্ত তাণ্ডব শেষে যখন ভোরের আলো ফুটল, তখন ঢাকা এক ভৌতিক নগরী।

পূর্ব পাকিস্তানের অন্য জায়গায়ও সেনাবাহিনী একইভাবে মারাত্মক হামলা চালায়, এই হামলাগুলোও ছিল প্রতিহিংসাপরায়ণতার দৃষ্টান্ত। যুদ্ধ–পরবর্তী পাকিস্তান সরকার একটি কমিশন গঠন করে। ওই কমিশনের প্রতিবেদনে ২৭-২৮ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ রয়েছে, ‌‌একজন সেনা কর্মকর্তার একটা আঙুলের চাপে ১৭ জন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও ৯১৫ জন মানুষ স্রেফ খুন হয়ে যান। কিন্তু সব জায়গায় সেনাবাহিনী একই রকমভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সফল হয়নি। চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনারা ঢাকার খবর শুনে তাদের পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের খুন করে শহরে বেরিয়ে পড়ে এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

২৬ ও ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের ছোট একটা রেডিও স্টেশন থেকে সাবেক একজন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এই স্টেশনটির আওতা ছিল কম এবং দ্রুতই আকাশ থেকে হামলা চালিয়ে স্টেশনটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে এবং স্বাধীনতার ঘোষণা বলে পরবর্তী সময়ে কী পরিচিতি পেয়েছিল, সে সম্পর্কে বিশ্ববাসী একরকম অন্ধকারে ছিল।

সেনাবাহিনী রেডিও স্টেশন এবং টেলিফোন এক্সচেঞ্জ নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছিল, ইত্তেফাকসহ অন্যান্য খবরের কাগজের অফিসেও তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাল। আর বিদেশি সাংবাদিকদের সে সময়কার একমাত্র বিলাসবহুল হোটেলে অবরুদ্ধ করে রাখা হলো। এই সংবাদদাতারা শহরকে আগুনে জ্বলতে দেখেও বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলেন না। সেই সুযোগই ছিল না।

যদিও সেনাবাহিনী এই ভয়ংকর হামলা চালিয়েছিল একেবারে হঠাৎ, তারপরও পুরো বাংলা বদ্বীপে সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলল। কোনো কোনো জায়গায় দ্রুততার সঙ্গে প্রতিরোধ ভেঙেও দেওয়া হলো, কিন্তু অন্যান্য জায়গায় যেমন খুলনা, যশোর, সিলেট এবং উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় প্রতিরোধ সপ্তাহব্যাপী জারি থাকল। মে মাসের শেষ নাগাদ পাকিস্তানি সেনারা সব কটি শহরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আত্মবিশ্বাস পেল।

সেনাবাহিনীর এই অভিযানের পর আতঙ্কিত মানুষ শরণার্থী হয়ে দেশ ছাড়লেন। বড় শহর ও ছোট মফস্বল শহরে সেনাবাহিনীর তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। এই ঝড়ঝাপটা সামাল দিতে শহরাঞ্চল ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ গ্রামের পথ ধরল। কিন্তু সেনাবাহিনী গ্রামেও হামলা চালাল। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ছিল এমন:

প্রথম কিছুদিন এলাকাটা জয় বাংলার দখলেই ছিল। তারপর যখন প্লেন থেকে বোমা ফেলা শুরু হল, তখন জানের ভয়ে সব ফেলে বউ–ছেলেমেয়ের হাত ধরে গ্রামের দিকে পালিয়েছিলাম। সে যে কি কষ্ট। কোন একটা গ্রামে থিতু হয়ে থাকতে পারিনি...পাকিস্তানি আর্মি যেভাবে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে–পুড়িয়ে দিচ্ছিল,...একরাত থাকার পরই শুনলাম মিলিটারি আসছে। যাদের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলাম তারা সুদ্ধ পালালাম। দু’দিন পরে ফিরে এসে দেখি—পুরো গ্রাম আগুনে পুড়ে ছাই। বহু লোক—যারা পালাতে পারেনি মরে পড়ে আছে। গরু, ছাগল মরে ফুলে ঢোল হয়ে আছে। দুর্গন্ধে টেকা যায় না। সে যে কি বিভৎস দৃশ্য। (একাত্তরের দিনগুলি, জাহানারা ইমাম, সন্ধানী প্রকাশনী, ১৯৯৪)

অন্যরা এত অনিরাপদ বোধ করছিল যে তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে ১৯৭১ সালের মে মাস নাগাদ ১৫ লাখ শরণার্থী দেশটিতে অবস্থান করছিল। নতুন করে প্রতিদিন ঢুকছিল আরও ৬০ হাজার মানুষ। যুদ্ধের শেষভাগে আরও অনেকে ভারতে চলে যান—সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে এক কোটি মানুষ সে সময় শরণার্থী হয়েছিলেন। তবে এ সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা

পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে, একই রকম দ্রুততায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানি শাসকদের। ১৯৭১ সালজুড়েই গণমাধ্যমগুলোর মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। তারাও সামান্য গন্ডগোল হচ্ছে, দ্রুতই এই অবস্থা কাটিয়ে ওঠা যাবে—এমন তথ্য প্রচার করছিল।

বাস্তবে পাকিস্তানি শাসকেরা তখনই এই পরিকল্পনায় বিফল হয়েছিল। তারা একটি গেরিলাযুদ্ধে আটকে পড়েছিল এবং এই যুদ্ধের দিকে চোখ ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। এই যুদ্ধ একটি সাধারণ ও অভ্যন্তরীণ গন্ডগোল—এ কথা তাদের পক্ষে বিশ্ববাসীকে বোঝানো আর সম্ভব হচ্ছিল না। লাখ লাখ শরণার্থী যখন বর্বর হামলার গল্প সঙ্গে করে ভারতীয় সীমান্তে জড়ো হচ্ছিলেন তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো গণহত্যার খবর দিতে লাগল। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের সমর্থকগোষ্ঠী জোটবদ্ধ হতে শুরু করল। পাকিস্তানি দূতাবাসের বাঙালি কর্মকর্তারা পালিয়ে গেলেন অথবা তাঁদের বের করে দেওয়া হলো। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুমুল সাড়া পড়ে গেল ‌‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’–এর মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের আগস্টে বাংলাদেশের শিশুদের সাহায্যার্থে আয়োজিত ওই কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে অংশ নেন জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, রবিশঙ্করের মতো তারকা শিল্পীরা। তত দিনে নাক–উঁচু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে উঠেছে, তাঁরা জোরালো ভাষায় নিন্দা করছেন তাঁদের।

তবে রাজনৈতিক চিত্র ছিল বেশ জটিল। আঞ্চলিক পর্যায়ে কোনো ঘোরপ্যাঁচ ছিল না, অবস্থান ছিল পরিষ্কার। পাকিস্তান ও ভারত ‌বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে আটকে ছিল এবং বরাবর একে অন্যের মনোভাব ও কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে নেতিবাচক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে আসছিল। ফলে দক্ষিণ এশীয় যেকোনো ইস্যুতে দেশ দুটি সব সময় বিরোধী অবস্থানে থাকত। একাত্তরও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। একদিকে ভারত কূটনীতি, সেনা প্রশিক্ষণ, আতিথেয়তা, শরণার্থীদের যত্ন, প্রচারণা, সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে বাংলাদেশের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনের রক্ষক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করল। অন্যদিকে পাকিস্তান এই মত প্রতিষ্ঠা করতে চাইল যে তারা আসলে একটি ইসলামি রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার চেষ্টা করছে। ভারতের এই ভূমিকা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অসহনীয় হস্তক্ষেপ বলে দোষ দিতে লাগল তারা। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের শঙ্কা আবারও (১৯৪৮ ও ১৯৬৫ সালের পর) দানা বেঁধে উঠতে লাগল। দুই পক্ষই তাদের প্রস্তুতির মহড়া দিতে লাগল। পাকিস্তানের ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল তারা জিতবে; ভারতও ভাব করছিল, যেন তারাই জিতবে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই পরিস্থিতি আবার একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক চক্করে পড়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ যুদ্ধ স্নায়ুযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই যুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশগুলো জড়িয়ে যায়। জোটটা ছিল এমন, সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থন দিচ্ছিল ভারতকে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানের পক্ষে জোট বাঁধে। পাকিস্তান আরও অনেক মুসলমান–অধ্যুষিত দেশের সমর্থন পায়। এই ভাগাভাগিতে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, কূটনৈতিক চেষ্টায় এই দ্বন্দ্বের সমাধান করা যাবে না। জাতিসংঘে আলোচনা স্থগিত হয়ে যায় এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কেউ কারও অবস্থান থেকে নড়েনি। অন্যদিকে, যুদ্ধকে ১৯৭১ সালের পুরো সময় টেনে নিয়ে যাওয়ায় ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আরও গভীর হয়ে ওঠে। একইভাবে কূটনীতিতে শীতল অবস্থা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ককে ঝালিয়ে নেয়। এই কাজে অনুঘটকের কাজ করে পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা। পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে এসব অতিগুরুত্বপূর্ণ কাজের পরিকল্পনা নষ্টে অংশ নিতে দেওয়া হলো না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের একটি বিখ্যাত বার্তা আছে এ প্রসঙ্গে, যেখানে তিনি বলছেন, ‌‘সবার জন্য প্রযোজ্য। এই মুহূর্ত ইয়াহিয়াকে ঘাঁটানোর দরকার নেই। আর এন।’

অক্টোবরের দিকে বর্ষাকাল শেষে, মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে এই বদ্বীপের ওপর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ণশক্তি নিয়ে দেশ দখলের পথে অগ্রসর না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারাও সামরিক বিজয় অর্জন করতে পারছিলেন না। তত দিনে ভারত এই বদ্বীপকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে পূর্ব বাংলা বলে ডাকতে শুরু করেছে। এর পরের ধাপে ভারত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচারণার কাজ শুরু করে এবং নভেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সৈন্যদের যৌথ একটি বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন ভারতীয় জেনারেলকে। এভাবে তারা পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে সেনা সামরিক অভিযানের ব্যাপ্তি বাড়াতে শুরু করে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা যুদ্ধ ঘোষণা থেকে বিরত ছিল তখনো। তবে যুদ্ধ ঘোষণারও সুযোগ এল। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পশ্চিম পাকিস্তান আকাশপথে অভিযান শুরু করে এবং ভারতের উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু বিমানপোতে হামলা চালায়। ভারত সঙ্গে সঙ্গে এর জবাব দেয় এবং (তৃতীয়) ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়।

ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং তাদের সঙ্গে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিস্থিতি তখন অনুকূলে। বদ্বীপটির সব প্রান্ত থেকে ঢুকতে থাকা এই বাহিনী পাকিস্তানিদের থেকে সুসজ্জিত ছিল। তাদের নৌ ও আকাশপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল। স্থানীয় মানুষ তাদের স্বাগত জানিয়েছিল মুক্তিদাতা হিসেবে। তারপরও বিনা ক্লেশে দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি তারা। পাকিস্তানিরা জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধের শেষ দিনগুলোয় বাংলাদেশের নেতৃত্বদানকারী বুদ্ধিজীবীদের ওপর হঠাৎ প্রবল আক্রমণ হলো। পাকিস্তানপন্থী আল-বদর মিলিশিয়ারা লেখক, অধ্যাপক, শিল্পী, চিকিৎসক ও অন্য পেশাজীবীদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে আসে, তারপর তাঁদের নির্বিচার জবাই করে। এর কিছুদিন পর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি প্রশাসনের পতন ঘটল, সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। ১৬ যুদ্ধ শেষ হলো। অভ্যুদয় হলো এক নতুন রাষ্ট্রের।

সূত্র: আ হিস্টরি অব বাংলাদেশ, ভিলেম ফান সেন্ডেল, ক্যামব্রিজ ইউনিভির্সিটি প্রেস, ২০১৬

ভিলেম ফান সেন্ডেল নেদারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডাম অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল হিস্টরিতে ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি পড়ান ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও সমাজবিদ্যা। বাংলাদেশ তাঁর গবেষণার অন্যতম বিষয়

অনুবাদ: শেখ সাবিহা আলম

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন