যেকোনো দুর্যোগ মাদক চোরাকারবারিদের জন্য ‘হানিমুন’
করোনাকালেও দেশে মাদকের ব্যবসা বেড়েছে। গত কয়েক মাসে নতুন ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে দুই বছর আগে সরকার বিশেষ অভিযান শুরু করেছিল। সে অভিযানের ফল কী, তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। মাদকের সমস্যা আরও জটিল ও প্রকট হয়ে ওঠার বিষয়টি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও বলা হয়েছে। মাদক নির্মূলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কোনো কৌশল ও পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এসব বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন গবেষক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম. ইমদাদুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমাম হোসেন সাঈদ।
মাদক পাচারের প্রকৃত সংখ্যা উপলব্ধির জন্য প্রতিটি সূচককে ১০ গুণ বৃদ্ধি করে দেখতে হবে। অর্থাৎ ধরে নিতে হবে, যত মাদক উদ্ধার হয়, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি উদ্ধার হয় না।
সরকারের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় মাদক চোরাচালানের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য জোরালোভাবে অভিযুক্ত স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকের অনুপস্থিতি গোটা বিষয়টি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে রাখে।
সরকারের ভিশন ২০২১ ও ভিশন ২০৪১-এর মতো বড় ধরনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রায় কেন মাদক নির্মূলের বিষয়টি সংযোজিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: মাদকের বিরুদ্ধে সরকার অত্যন্ত কঠোর—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রায় নিয়মিতই এমন বক্তব্য দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে মাদকের ব্যবসা বাড়ছে।
ইমদাদুল হক: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা ঘোষণা এবং মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনেক অসংগতি রয়েছে। ঘোষণার সঙ্গে সঠিক পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। এর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গোয়েন্দা তৎপরতায় আরও কুশলী ও দক্ষ ভূমিকা নিতে হবে। স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতা মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্যের মাত্রাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে। মাদকবিরোধী অভিযানে প্রয়োজন সর্বাত্মক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: করোনাকালেও দেশে মাদকের সরবরাহ কমেনি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে যে পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে ২০২০ সালে। এমন পরিস্থিতি কী বার্তা দিচ্ছে?
ইমদাদুল হক: যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মাদক চোরাকারবারিদের কাছে ‘হানিমুন’ বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত থেকে মাদকদ্রব্য সরবরাহের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে ভাগ বসানো এর একটি বড় প্রবণতা হয়ে থাকতে পারে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে ৫ কোটি ৩০ লাখ ইয়াবা জব্দ হয়। ২০১৯ সালে সে সংখ্যা আড়াই কোটি হ্রাস পায়, যদিও ২০২০ সালে তা আবার ৬০ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ওই সময়ে (২০১৯ সালে) ইয়াবা জব্দের পরিমাণ কমলেও অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণে খাদ, আইস, এলএসডি ও মাশরুম মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটার তথ্য পাওয়া যায়। একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, মাদক পাচারের প্রকৃত সংখ্যা উপলব্ধির জন্য প্রতিটি সূচককে ১০ গুণ বৃদ্ধি করে দেখতে হবে। অর্থাৎ ধরে নিতে হবে, যত মাদক উদ্ধার হয়, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি উদ্ধার হয় না।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: মাদক নির্মূলে ২০১৮ সালের মে মাস থেকে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চলে। এর পরের আড়াই বছরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২৭২ জন। এই অভিযান শেষ হয়েছে, নাকি এখনো চলছে, সেটি কখনো স্পষ্ট করা হয়নি। অভিযানের অর্জন কতটা, একজন গবেষক হিসেবে কী মূল্যায়ন আপনার?
ইমদাদুল হক: ২০১৮ সালের মে মাস থেকে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হার্ড লাইন তথা বন্দুকযুদ্ধ বা সাঁড়াশি অভিযানের আওতায় অর্জন ও বিসর্জন দুটোই রয়েছে। এর বিপরীতে মানবাধিকারসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অবস্থান সরকার গৃহীত নীতিমালাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। আর গত বছরের ৩১ জুলাই টেকনাফ থানার বিতর্কিত ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু মাদকবিরোধী সরকারি ও প্রশাসনিক তৎপরতাকে অর্থহীন করে তোলে। মাদক পাচারের লাগাম টেনে ধরার জন্য সরকারি প্রয়াসকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা প্রয়োজন। তা না হলে মাদক চোরাকারবারি ও মাফিয়া চক্রের অপতৎপরতা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলবে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ করাতে সরকার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সরকারের তালিকাভুক্ত শতাধিক ইয়াবা কারবারি টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু টেকনাফ দিয়ে ইয়াবা পাচার বন্ধ হয়নি। আত্মসমর্পণকৌশল কাজ না করার কারণ কী?
ইমদাদুল হক: আপাতদৃষ্টে মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণে সরকারি উদ্যোগটি প্রশংসার দাবি রাখে। টেকনাফ সীমান্তবর্তী মাদক পাচারকারী ‘রিং লিডারদের’ আত্মসমর্পণ-পরবর্তী জীবনধারা নিয়ে কোনো সরকারি তথ্য এখন পর্যন্ত নজরে আসেনি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আওতায় গঠিত গবেষণামূলক সেল অথবা কনসালট্যান্ট নিয়োগের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমিকভাবে জরিপ করা গেলে আত্মসমর্পণ পদক্ষেপের ফলাফলকে নিরূপণ করা সম্ভব হবে। অবশ্য আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় মাদক চোরাচালানের পৃষ্ঠপোষকতার জোরালো অভিযোগ থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকের অনুপস্থিতি গোটা বিষয়টি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে রাখে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: মাদকাসক্তি রোধে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ ডোপ টেস্ট চালু করেছে। সরকারি-বেসরকারি সব চাকরিতে নিয়োগের শর্ত হিসেবে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে আইন করা উচিত বলে মনে করেন কি?
ইমদাদুল হক: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত মানমর্যাদা ও দক্ষতা বজায় রাখার প্রয়োজনে এটি একটি সময়োপযোগী ও নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। জনস্বার্থে বিষয়টি মাঠপর্যায়ে কর্মরত সব সদস্যের জন্য বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পাচারকারীদের জড়িত থাকার তথ্য নতুন নয়। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসে মাদকের সবচেয়ে বড় চালান (৩০৪ কেজি হেরোইন ও ৫ কেজি কোকেন) ধরা পড়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। সেখানে গ্রেপ্তার হন তিন বাংলাদেশি, যাঁদের একজন নারী।
ইমদাদুল হক: ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ পৃথিবীর তিনটি বৃহত্তম ড্রাগ উৎপাদনকারী অঞ্চলের মাঝখানে ‘স্যান্ডউইচ’-এর অবস্থা ধারণ করেছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলে অবস্থিত মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড, গোল্ডেন ওয়েজ অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় দেশ ভারত। গোল্ডেন ক্রিসেন্ট অঞ্চলে অবস্থিত পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গেও রয়েছে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগব্যবস্থা। ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে আশির দশকের শুরুতে আফিম তথা হেরোইনের উৎপাদনমাত্রা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসব অঞ্চলে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এতে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: ইয়াবা পাচার বন্ধে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েও কাজ না হওয়ার পেছনের কারণ কী? একইভাবে ভারত থেকে ফেনসিডিল পাচার একসময় কমে এলেও এখন আবার বাড়ছে।
ইমদাদুল হক: মাদক পাচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতিতে কামড় বসানো এবং যুবসমাজকে ধ্বংস করা হতে পারে সেখানকার সামরিক জান্তার কৌশলগত অবস্থান। ভারত থেকে আসা ফেনসিডিল, ব্রাউন সুগার ও অন্যান্য নেশাকর সামগ্রী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের জাতীয়-আন্তর্জাতিক সমীকরণ। মুম্বাইভিত্তিক জার্মান বহুজাতিক রোন-পোলেঙ্ক কোম্পানি বৈধভাবে ফেনসিডিল উৎপাদন করে থাকে, যা বাংলাদেশে একটি অবৈধ ড্রাগ। আশির দশকের শুরু থেকে নানা কারসাজির মাধ্যমে একটি নেশাকর সামগ্রী হিসেবে চোরাচালানিদের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে ফেনসিডিলের অনুপ্রবেশ ঘটে। সরকারিভাবে যখন এই সমস্যা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা হয়েছে, বেশিরভাগ সময় তারা না জানার ভান করেছে। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে এটি বাংলাদেশের যুবসমাজের কাছে অন্যতম মায়াবিভ্রমকারী ড্রাগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে গত প্রায় এক দশকে ইয়াবা সংস্কৃতির বিস্তার ঘটলে ভারতীয় ফেনসিডিলের চাহিদা দ্বিতীয় পর্যায়ে নেমে আসে। মিয়ানমার অথবা ভারত, কোনো প্রতিবেশী দেশই আন্তরিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের মাদকসৃষ্ট দুঃখ ও বিপদকে সত্যিকার অর্থে আমলে নেয়নি।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: স্থানীয় পর্যায়ে কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের সহায়তা পান মাদক ব্যবসায়ীরা—এই অভিযোগ অনেক পুরোনো। ইয়াবা চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকারের একটি সংস্থার করা তালিকাতে ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার নাম ছিল (তখন সাংসদ ছিলেন)। আবার মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধরা পড়ার ঘটনাও কম নয়। এসব ঘটনা মাদক নির্মূলে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে কি প্রশ্নবিদ্ধ করছে?
ইমদাদুল হক: রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মাদকের ভয়াবহতা বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত কি না, সেটি এক বিরাট প্রশ্ন। মাদক সমস্যার জন্ম হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশ সরকারের রাষ্ট্রীয় মদদ, ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনায়। ২০১৯ সালে কলোনিয়াল ড্রাগ ট্রেড ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম পলাশী টু পার্টিশন বইয়ে সবিস্তার বিষয়টি উপস্থাপন করেছি আমি। বাংলাদেশের আইনসভায় ব্যবসায়ী সদস্যদের ভিড়ে এমন অনেকেই ঘাপটি মেরে আছেন, যাঁদের থলের বিড়াল সংবাদমাধ্যমে কখনো কখনো বেরিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে কারও কোনো রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে হয় না। এঁদের সহযোগী হিসেবে প্রশাসনেও জন্ম নিয়েছেন অনেক বিপথগামী সদস্য, যাঁরা মাদকদ্রব্য উদ্ধারের নামে সাধারণ মানুষের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে বাড়তি আয়ের সুযোগ খোঁজেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে জনরোষের শিকার হন। একটি সভ্য সমাজের জন্য এই পরিস্থিতি দুঃখজনক, যা রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শর্ষের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভূতকে তাড়াতে না পারলে মাদকবিরোধী অভিযানে কোনো মহৎ উদ্যোগই আলোর মুখ দেখতে পারবে না।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: মাদকাসক্তির চিকিৎসার জন্য দেশে সরকারিভাবে মাত্র চারটি নিরাময়কেন্দ্র রয়েছে। এর বাইরে সরকার অনুমোদিত নিরাময়কেন্দ্র রয়েছে ৩৬৫টি। সরকারি-বেসরকারি এসব নিরাময়কেন্দ্রের মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে।
ইমদাদুল হক: পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, এতে প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দক্ষভাবে পরিচালিত বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্র আরও বৃদ্ধি করা দরকার। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রগুলোকে পরিচালনা প্রয়োজন। নিরাময়কেন্দ্রগুলো থেকে চিকিৎসাপ্রাপ্ত মাদকসেবীদের সামাজিক পুনর্বাসনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুনর্বাসনকেন্দ্রের ত্রিপক্ষীয় নেটওয়ার্ক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিষয়টিকে পরিচালনা করা যেতে পারে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নতুন নতুন মাদক ধরা পড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, গত এক যুগে দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ বেড়ে মোট সংখ্যাটি ৭০ লাখের মতো। এটি ইঙ্গিত করে, দেশে ধারাবাহিকভাবে মাদকের চাহিদাও বাড়ছ। কেন ও কীভাবে এমন পরিস্থিতির তৈরি হলো?
ইমদাদুল হক: নতুন বাজার সৃষ্টির প্রয়াসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজরা লোকালয়ে গাঁজা, আফিম ও মদের দোকান খুলে স্থানীয় যুবকদের সেগুলো পরিবেশনের ব্যবস্থা করেছিল। মিয়ানমার ইংরেজদের দখলে যাওয়ার আগে সে দেশে মাদকদ্রব্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। পরাধীন মিয়ানমারে সেসব নিষেধাজ্ঞা উঠে গিয়ে নতুন মাদকসংস্কৃতি তৈরি হয় ইংরেজ এজেন্টদের সাহচর্যে। একই প্রক্রিয়া চলে শ্রীলঙ্কা ও ভারতবর্ষে সুদীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনামলে। স্বাধীনতা-উত্তর এ দেশগুলো মাদক বাণিজ্যের অর্থনৈতিক লিপ্সাকে পুরোপুরিভাবে এখনো পরিহার করতে পারেনি। মিয়ানমার, ভারত বা পাকিস্তানে মাফিয়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে মাদক উৎপাদন ও অব্যাহত রাখার নানা কৌশল। মাদক সমস্যার প্রকৃত সমাধান খুঁজতে হলে তিনটি বিষয়ে লক্ষ রাখা জরুরি। প্রথমত, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে সৃষ্ট সরবরাহ লাইন নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস এবং তৃতীয়ত, মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও সামাজিক পুনর্বাসন। কোনো একটি বিষয়কে বাদ দিয়ে এ সমস্যার প্রকৃত সমাধান খোঁজা যাবে না।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: ২০১৮ সালে সরকারের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনেক শিক্ষার্থী মাদক সেবনের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে মাদক নির্মূলে সরকারের বড় কোনো কর্মসূচিও নেই।
ইমদাদুল হক: মাদকসেবী শিক্ষার্থীদের যে কেউ নেশা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ২০১৮ সালে প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষেত্রবিশেষে মাদক নিরোধ কমিটি গঠন করা হলেও সেসব কার্যক্রমে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ ছিল বলে আমার জানা নেই। সর্বস্তরের শিক্ষাঙ্গনে ডোপ টেস্টের বাধ্যবাধকতা রাখা যায়। কোভিড-সৃষ্ট নয়া বাস্তবতায় বিকল্প পন্থা হিসেবে নতুন নতুন চেইন ম্যানেজমেন্ট তৈরি হয়ে থাকবে। এতে সচ্ছল পরিবারের আসক্ত ব্যক্তিরা ঘরে বসে অথবা নিজ লোকালয়েই তা পেয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: মাদকের মতো ভয়াবহ সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের সুচিন্তিত কোনো কর্মকৌশল আদৌ রয়েছে বলে মনে করেন কি? শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ওপর নির্ভর করে কি এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব? এ ক্ষেত্রে কী করা উচিত সরকারের?
ইমদাদুল হক: দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধিকাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাৎক্ষণিক বা অ্যাডহক–ভিত্তিতে। দীর্ঘমেয়াদি সুচিন্তিত ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও সেগুলোর পর্যায়ক্রমিক ফলাফল বিশ্লেষণে অনেক ঘাটতি রয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে এমডিজি (সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য) পাড়ি দিয়ে এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) নিয়ে পথ চলছে। এগুলোর পাশাপাশি চলছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের ভিশন ২০২১ ও ভিশন ২০৪১, যা জাতির জন্য আশার সঞ্চার করে। অবশ্য এসব বড় ধরনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রায় কেন মাদক নির্মূলের বিষয়টি সংযোজিত হয়নি, তা স্পষ্ট নয়। সে প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজতে হবে নীতিনির্ধারকদের। মাদক নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে সরকারের কোনো লক্ষ্যই অর্জন হবে না।