বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলা ঋতুচক্রে ছয় ঋতুর কথা বলা হলেও আবহাওয়াবিদদের হিসাব এর চেয়ে ভিন্ন। তাদের কাছে ঋতু হচ্ছে চারটি—বর্ষাপূর্ব, বর্ষা, বর্ষা–পরবর্তী সময়কাল ও শীত ঋতু। এর মধ্যে শীতকাল ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। যদিও অনেক বছর নভেম্বরের মাঝামাঝি বা শেষেই দেশের উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলে শীতের আগমনী বার্তা পাওয়া যায়। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়াসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে হালকা শীত শুরু হয়।


তবে এবার শীতকালে এখনো দেশে দিনের বেলা উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছে। এ বিষয়ে কথা হয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিকের সঙ্গে। তিনি শীতকালে ঠান্ডা কম–বেশি হওয়ার কিছু কারণ বিশ্লেষণ করেছেন।

আবুল কালাম মল্লিক তাঁর বিশ্লেষণের শুরুতেই বলেন, প্রথমত, শীতকালে হিমালয়ের পাদদেশ–ঘেঁষা অঞ্চলগুলোতে বায়ুর চাপ বেশি থাকে। বিপরীতে বাংলাদেশের ভেতরে তুলনামূলকভাবে বায়ুর চাপ কম থাকে। বাতাসের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা উচ্চচাপ বলয় থেকে নিম্নচাপের দিকে আসে। ভারতের সাত রাজ্য আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মণিপুর, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড মূলত পাহাড়ি অঞ্চল। সেখানে শীতকালে সূর্যের আলো তীর্যকভাবে আলো দেওয়ায় পাহাড়ের পাশে ছায়া পড়ে। ফলে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে তাপমাত্রা থাকে অনেক কম। উচ্চচাপ বলয়ের প্রভাবে হিমেল বাতাস ওই এলাকা ঘুরে উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তখন সাধারণত দেশের তাপমাত্রা কমে যায়। তিনি বলেন, ‘উচ্চচাপ বলয়টা এখন ভারতের বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান করছে। এটা কিছুটা দুর্বল অবস্থায় আছে। এ কারণে আমাদের দেশে ঠান্ডা বাতাস কম আসছে।’

আবহাওয়াবিদ মল্লিক বলেন, শীতের তারতম্য নির্ভর করে বাতাসের দিক ও গতিবেগের ওপরে। দেশে কোথা থেকে ও কী বেগে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে, তা তাপমাত্রা কম–বেশির অন্যতম নিয়ামক। বাতাসের গতি বেশি হলে শীতের তীব্রতা বেশি হয়, আর গতি কম হলে শীতের তীব্রতা কম হয়। শীতকালে সাধারণত উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর–পূর্ব দিক থেকে বাতাস বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এবার বাতাস উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাই বাতাস সেসব এলাকার তাপমাত্রা খুব একটা কমাতে পারেনি। সাধারণত এ সময়টায় বাতাসের স্বাভাবিক গতিবেগ ৮ থেকে ১২ কিলোমিটার বা তারও বেশি হয়।

শীতকালে সূর্য দক্ষিণ দিকে হেলে যায়। লম্বালম্বিভাবে সূর্যের আলো পড়লে পরিবেশ বেশি উত্তপ্ত হয়। তীর্যকভাবে পড়লে কম উত্তপ্ত হয়। গত রোববারের উদাহরণ দিয়ে আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘গতকাল আকাশে মেঘ কম ছিল দিনের বেলায়। দিনের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা প্রখর সূর্যের আলো ছিল। ফলে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত ছিল। তাই গরম লেগেছে বেশি। এ ছাড়া কোনো এলাকার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলে শীত বেশি থাকবে। যেমন গত সোমবার কক্সবাজারের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১, আর সর্বনিম্ন ১৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। অর্থাৎ পার্থক্য ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পার্থক্য ১০ ডিগ্রির বেশি বলেই শীতের অনুভূতি কম ছিল।

শীতের সঙ্গে কুয়াশার সম্পর্ক তুলে ধরে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, কোনো অঞ্চলে দীর্ঘক্ষণ কুয়াশা পড়লে শীত বেশি থাকে। কারণ, সূর্যের আলো কুয়াশার চাদর ভেদ করে ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করতে পারে না। রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, সিলেট—এসব অঞ্চলে জানুয়ারির এ সময়টাতে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কুয়াশা থাকে। এ সময় সূর্যের আলো কুয়াশার ওপর পড়ায় কুয়াশা উত্তপ্ত হয়, ভূপৃষ্ঠ নয়। ফলে ঠান্ডা অনুভূত হয়।

এই কুয়াশা সাধারণত কয়েক উৎস থেকে আসে। এক ধরনের কুয়াশার নাম হচ্ছে ‘রেডিয়েশন ফগ’। ভূমির কাছাকাছি বাতাসে জলীয় বাষ্প থাকেই সব সময়। রাতে তা ঠান্ডা হয়ে শিশির ঝরে পড়ে ও কুয়াশা পড়ে। সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তা শেষ হয়ে যায়। এ ছাড়া জলাধার বা নদীতে কুয়াশা থাকে। বাষ্পীভূত হয়ে সে কুয়াশা কিছু দূরবর্তী এলাকায় এসে পড়ে বলে জানান মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি বলেন, এ জন্য এখন শুধু জলাধারে কুয়াশা আছে। কিন্তু বিস্তীর্ণ এলাকায় কম। তাই গরম অনুভূত হচ্ছে।

আরেক ধরনের কুয়াশা হচ্ছে বায়ুতাড়িত কুয়াশা। শীতে পশ্চিমবঙ্গ, মিজোরাম, অরুণাচল—এ অঞ্চলগুলোতে কুয়াশা হয়। উত্তর–পূর্ব, উত্তর–পশ্চিম দিক থেকে বাতাস আসার সময় ধাক্কা দিয়ে কুয়াশা বাংলাদেশে নিয়ে আসে। গত কয়েক দিন ধরে কুয়াশা কম থাকায় শীতের অনুভূতিটা কম।

মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘কোনো কোনো সময় বাতাসের নিচের দিকে ধাবিত হয়। যেমন গুজরাটে এখন তীব্র বেগে নিচের দিকে বাতাস ধাবিত হচ্ছে। এ কারণে গুজরাট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঠান্ডার পরিমাণ বেশি। বাংলাদেশে নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে না, সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশের তাপমাত্রা তেমন একটা কমছে না।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন