তৃতীয় পর্ব

রংপুর ও কুড়িগ্রামে ১৯৭১ সালে গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবর

বিজ্ঞাপন
>
default-image
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যাকাণ্ড চালায়। এটা বিশ্বের নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড। এখন আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি মেলেনি। বিশ্বেও অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায় এ হত্যাকাণ্ড চলে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া যায়। চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে এক হাজারের ওপর। বধ্যভূমি থেকে অসংখ্য মাথার খুলি, শরীরের হাড়গোড় ও চুল পাওয়া গেছে। ৬৪ জেলার গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরে সংক্ষিপ্তভাবে বিবরণের ধারাবাহিক থাকবে নাগরিক সংবাদে। আজ থাকছে রংপুর ও কুড়িগ্রামের গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

রংপুর

ঘাঘট নদতীরের বধ্যভূমি
রংপুর শহরে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ২৩তম ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার। ২৩ মার্চ পাকিস্তানি সেনা অফিসার অবাঙালি লে. আব্বাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রংপুর এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ফলে ২৮ মার্চ হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ তির-ধনুক-বল্লম-লাঠি-দা-কুড়াল এবং বাঁশের লাঠি হাতে রংপুর সেনানিবাস আক্রমণের উদ্দেশ্যে ঘাঘট নদের তীর ঘেঁষে জমায়েত হতে থাকে। এ সময় ক্যান্টনমেন্ট থেকে ছুটে আসতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্রের ঝাঁক ঝাঁক গুলি।পাখির মতো লুটিয়ে পড়ে মানুষ। ঘাঘট নদের পানি হাজারো শহীদের রক্তে লাল হয়ে যায়। এতে এই ঘাঘট নদের তীর একটি বৃহৎ বধ্যভূমিতে পরিণত হয়।

নাবিরহাট বধ্যভূমি
রংপুরের বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে নাবিরহাট বধ্যভূমি অন্যতম। এখানে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।

রংপুর সেনানিবাস গণকবর
রংপুর সেনানিবাসের পাশেই রয়েছে একটি গণকবর। এই গণকবরটিতে পাকিস্তানি বাহিনী বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং বাঙালি ইপিআর সদস্যসহ প্রায় ২০০ ব্যক্তির লাশ পুঁতে রেখেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর এখান থেকে প্রায় ১০ হাজার শহীদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১২ এপ্রিল হানাদাররা সৈয়দপুর থেকে বহু মাড়োয়ারিকে ধরে এনে হত্যা করে এখানে পুঁতে রাখে।

জাফরগঞ্জ পুল বধ্যভূমি
রংপুরের জাফরগঞ্জের পুল ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম বধ্যভূমি। এই পুলের ওপর দুই দিনে ১০ জনকে হত্যা করা হয়। সেতুর কাছে বসবাসকারী মেহের উদ্দিন ও তার ছেলে এহসান উদ্দিন ১৯৭২ সালে এই তথ্য জানান।

নিশবেতগঞ্জ বধ্যভূমি
রংপুরের নিশবেতগঞ্জ সেতু এলাকার সর্বত্র মানুষের মাথার খুলি ও কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখা যায়। পীরগঞ্জের তহশিলদার আহমদ আলী এখানে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করতে দেখেছেন। ১ এপ্রিল রাত ১১টায় এখানে একে একে ১২ জনকে হত্যা করা হয়।

বৈরাগীগঞ্জ বধ্যভূমি
বৈরাগীগঞ্জ বধ্যভূমিতে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।

দমদমা সেতু বধ্যভূমি
রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে দুই মাইল দক্ষিণ-পূর্বে দমদমা সেতুর নিচে রয়েছে একটি বধ্যভূমি। এই বধ্যভূমিতে ৩০ এপ্রিল কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক রামকৃষ্ণ অধিকারী, কালাচাঁদ রায়, সুনীলবরণ চক্রবর্তী, চিত্তরঞ্জন রায়সহ আরও অনেককে হত্যা করা হয়। প্রায় প্রতিদিন এখানে বাঙালিদের হত্যা করা হতো।

বলদিপুকুর বধ্যভূমি
রংপুরের বলদিপুকুর ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর আরেকটি বধ্যভূমি। এখানে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়।

মহিগঞ্জ শ্মশানঘাট বধ্যভূমি
মহিগঞ্জ শ্মশানঘাটের বধ্যভূমি থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান মন্টু ডাক্তার। ৩ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাসের দুটি মেস থেকে ১১ জনকে নিয়ে যাওয়া হয় মহিগঞ্জ শ্মশানঘাট বধ্যভূমিতে। এই দলে মন্টু ডাক্তারের সঙ্গে ছিলেন রংপুরের জনপ্রিয় ভাসানী ন্যাপ নেতা ইয়াকুব মাহফুজ আলী।

সাহেবগঞ্জ বধ্যভূমি
রংপুর জেলখানা থেকে ১১ জন বন্দী ইপিআর সদস্যকে ধরে এনে হত্যা করে। হারাগাছ রোড ও সাহেবগঞ্জের মাঝামাঝি একটি স্থানে এই শহীদদের গণকবর রয়েছে।

মডার্ন সিনেমা হল বধ্যভূমি
১ মে ১৯ জন বাঙালি সেনা অফিসার ও সৈনিককে সেনানিবাস থেকে বের করে এনে রাত ১২টার দিকে সাহেবগঞ্জের এই মডার্ন সিনেমা হলের পেছনের বধ্যভূমিতে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এই বধ্যভূমি থেকে বেঁচে যান এক রিকশাচালক। পাকিস্তানি সেনাদের এক দালাল জব্বার নভেম্বরের ৮ তারিখে একই রিকশাচালককে ন্যাপের কর্মী বলে ধরে নিয়ে যায়। তাকে মডার্ন সিনেমা হলে আটক রাখা হয়। এখানে তখন প্রায় সাড়ে ৩০০ বন্দীকে আটকে রাখা হয়েছিল। ১৩ দিন অমানুষিক নির্যাতনের পর তাঁদের সিনেমা হলের পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একে একে জিনকি, মালেক, আলী হোসেন, ফারুক হোসেনসহ সবাইকে জবাই করা হয়। এরই এক ফাঁকে সেই রিকশাচালক পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

দেবীপুর বধ্যভূমি
রংপুরের দেবীপুর ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর বধ্যভূমি। এখানে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়।

কুকুরুন বিল বধ্যভূমি
রংপুর শহরের উপকণ্ঠে কুকুরুনের বিলে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

শিবগঞ্জ এলাকা বধ্যভূমি
রংপুরের শিবগঞ্জ এলাকা ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বধ্যভূমি। এখানে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়।

টাউন হল বধ্যভূমি
রংপুর শহরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা সবচেয়ে বেশি হত্যাকা­ণ্ড ঘটায় রংপুর টাউন হলে। এটি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের নারী নির্যাতনের একটি প্রধান কেন্দ্র। এই টাউন হলে মেয়েদের ধরে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন চালানো হতো এবং শেষে মেরে ফেলা হতো। এসব লাশসহ অসংখ্য মুক্তিকামী বাঙালির লাশ টাউন হলের পেছনের কৃষি খামারের মধ্যে পুঁতে রাখা হতো।

কুড়িগ্রাম
সার্কিট হাউস বধ্যভূমি
৭ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। ওই দিন বর্তমান সার্কিট হাউসের সামনে নির্বিচারে গুলি চালালে পাঁচজন কারারক্ষী ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তারা সেদিনের মতো চলে গেলেও পুনরায় ১৪ এপ্রিল কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে স্থায়ীভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসে। তারা সার্কিট হাউসকে হত্যা ও নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। মজিবর মহুরি, লালু ম­লসহ আরও অনেককে ধরে এনে নির্যাতন করা হয়। এ ছাড়া পলাশবাড়ী থেকে ১৪-১৫ জনকে ধরে এনে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হয়।

ফুড অফিস বধ্যভূমি
৭ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, কুড়িগ্রাম ফুড অফিস বধ্যভূমি খনন করলে শহীদদের কঙ্কালের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।

জজকোর্ট পুকুর বধ্যভূমি
কুড়িগ্রাম জজকোর্টের সামনের পুকুর পাড়ের বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে।

রিভারভিউ হাইস্কুল বধ্যভূমি
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুড়িগ্রাম রিভারভিউ হাইস্কুলসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন ধরে এনে পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে।

ভূরুঙ্গামারী সিও অফিস বধ্যভূমি
পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত ও ধর্ষিত হয়েছেন শত শত নারী। ভূরুঙ্গামারী সিও অফিসের (বর্তমান উপজেলা পরিষদ কার্যালয়) দোতলা থেকে ধর্ষিত ও বন্দী ২০-৩০ জন যুবতী ও তরুণীকে উদ্ধার করা হয়।

দাগারকুটি বধ্যভূমি, উলিপুর
১৯৭১-এর নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দুই দিন আগে ভোররাতে কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিতে গুলি চালিয়ে প্রায় ৭৬৪ জনকে হত্যা করে। রমজান মাসে সাহরি খেতে বসা ও নামাজরত মুসল্লিদের ওপর তারা গুলি চালায়। এরপর তারা ঘুমন্ত গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালায়। পরে বহু লোককে ঘুম থেকে তুলে এনে দাগারকুটিতে জড়ো করে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে গুলি করে সবাইকে হত্যা করে সেখানেই পুঁতে রাখে। এখানে অন্তত ৪০০ লোককে গুলি করে হত্যা করা হয়।

মলেরহাট বধ্যভূমি, উলিপুর
পাকিস্তানি বাহিনী উলিপুরের মলেরহাটে ‘অপারেশন’ চালিয়ে ২১ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

ডাকবাংলো গণকবর, উলিপুর
উলিপুর ডাকবাংলো ছিল গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের প্রধান কেন্দ্র। রেললাইনের ধারে অবস্থিত ডাকবাংলোয় মুক্তিযুদ্ধের সময় কেউ গিয়ে ফেরত এসেছে, এমন নজির নেই। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর শাহাবুদ্দিন এবং রাজাকাররা গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে মেয়েদের ধরে এনে উপহার দিত এই ক্যাম্পে। মেয়েদের সব সময় ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হতো। নির্যাতন ও ধর্ষণ করার পর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের হত্যা করা হতো। তারপর রাজাকারদের দ্বারা ডাকবাংলোর আশপাশে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে রাখত। ডাকবাংলোর চারদিকে ৮-১০টি গণকববরের সন্ধান পাওয়া যায় স্বাধীনতার পর। দুটি গর্তে নিহত মেয়েদের হাতের আঙুল ও মাথার চুল মাটির ওপরে ভেসে থাকতে দেখা গেছে।

চর বেরুবাড়ি বধ্যভূমি, নাগেশ্বরী
অক্টোবরের শেষে রমজান মাসে রাজাকার ও ইপিক্যাফের একটি দল বেরুবাড়িতে আসে এবং লোকজনের কাছে সোনাদানা, টাকাপয়সা ইত্যাদি দাবি করে। খবর পেয়ে কোম্পানি কমান্ডার নান্নু হামলা চালিয়ে তাদের তাড়িয়ে দিয়ে নিরাপদে ফিরে আসেন। এদিকে রাজাকাররা নাগেশ্বরীতে এসে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে আবার বেরুবাড়িতে আসে। তারা গ্রামে অগ্নিসংযোগ করে ১৫০ বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং অনেক মহিলাকে নির্যাতন করে। গ্রাম থেকে সব বয়সের ২৫০ জনকে ধরে নিয়ে আসে বেরুবাড়ি বাজারে। ১৮ জনকে বেরুবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করে এবং অন্য সবাইকে কঠিন শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেয়।

নাগেশ্বরী থানা স্কুল বধ্যভূমি
নাগেশ্বরী থানা স্কুলের বধ্যভূমিতে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়।

কোদালকাঠি বধ্যভূমি, রৌমারী
রৌমারী থানা সদর থেকে সাত-আট মাইল দূরে কোদালকাঠিতে রয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ মুক্তিযোদ্ধার গণকবর। কোদালকাঠিতে সংঘটিত এক ভয়াবহ যুদ্ধে এঁরা শহীদ হন। এ ছাড়া ফুলবাড়ী ও ভূরুঙ্গামারী থানায় আরও কয়েকটি গণকবর রয়েছে।

নীলুর খামার বধ্যভূমি, নাগেশ্বরী
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভূরুঙ্গামারী সড়ক থেকে ১ কিলোমিটার পশ্চিমে নীলুর খামার গ্রামটির অবস্থান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘দিনটি ছিল একাত্তরের ১৮ নভেম্বর, ২৬ রমজান। এই গ্রাম থেকে ২ কিমি দূরে রায়গঞ্জ ব্রিজের পাশে খানসেনারা অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ওই দিন এই গ্রামের সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন নওয়াজিশের নেতৃত্বে গ্রামের একটি বাড়িতে দুপুরের আহার গ্রহণ করছিলেন। খবর পেয়ে খানসেনারা এই গ্রামের ওপর হামলা চালায়। গ্রামের অনেক ঘরবাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং একটানা গুলি করতে করতে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি চালান। কিন্তু তাদের গুলির পরিমাণ সীমিত থাকায় একপর্যায়ে তারা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরতে না পেরে খানসেনারা গ্রামের লোকজনের ওপর এলোপাতাড়িভাবে গুলি করতে থাকে এবং একপর্যায়ে তারা অনেককে ধরে এই গ্রামের পাশে ঢড়কা বিলের তীরে যে বাঁশঝাড় ছিল, সেখানে নিয়ে হত্যা করে। এতে গ্রামের প্রায় ৭৯ জন শহীদ হন। পরে খানসেনারা চলে গেলে গ্রামবাসী এই শহীদের কয়েকটি কবরে মাটিচাপা দেন। সেদিনের গুলির চিহ্ন শরীরে নিয়ে এই গ্রামের অনেকে এখনো বেঁচে আছেন।

বেলগাছার গণহত্যা
১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রেলযোগে দ্বিতীয়বারের মতো বেলগাছায় এসে অনেক মানুষকে হত্যা করে। এখানে চেয়ারম্যান ডা. ছফর উদ্দিন, আলহাজ সজর উদ্দিন, আবদুল লতিফ, পোয়াতু মামুদ, বরিজ উদ্দিন, ভোলানাথ, সাহাবুদ্দিনসহ কয়েকজনকে হত্যা করে।

চানমারী বধ্যভূমি
চানামরীতে আনসার বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ নিতেন। এখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে রাখে।

ব্যাপারী পাড়া বধ্যভূমি
কুড়িগ্রামের নতুন শহর এলাকা ব্যাপারী পাড়া। পাশে জেলখানা ও সিঅ্যান্ডবি রেস্টহাউস। সেখানে পাকিস্তানিদের একটা ক্যাম্প ছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে নিয়ে এসে এখানে হত্যা করত।

ঠাটমারী ব্রিজ বধ্যভূমি
মাহিগঞ্জ সড়কের তিস্তা-কুড়িগ্রাম রেললাইন এলাকায় ঠাটমারী ব্রিজ। ব্রিজের পাশে ছিল ওয়াপদার নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য একটি কোয়ার্টার। সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নারী ও পুরুষকে ব্যাপক নির্যাতন করে হত্যা করত।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ‘৭১-এর গণহত্যা’ ৭১ সম্পাদিত আবু সাঈদ, একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর, সুকুমার বিশ্বাস, দৈনিক সংবাদ, যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ ডা. এম এ হাসান, দৈনিক বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ কোষ, দ্বিতীয় খণ্ড ও চতুর্থ খণ্ড মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত, মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড—আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন সম্পাদিত।

আবু সাঈদ: কবি, সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক
abusayedone@gmail.com

*আগামীকাল ৫ ডিসেম্বর ২০১৯ পড়ুন: লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার  গণহত্যা, গণকবর ও বধ্যভূমি 
* রংপুর ও কুড়িগ্রামের আরও যদি গণহত্যা, গণকবর কিংবা বধ্যভূমি থাকে, অনুগ্রহ করে মেইলে জানাবেন

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন