
২ সেপ্টেম্বর, ভরদুপুর। নগরবাসী ব্যস্ত ঈদের আয়োজন নিয়ে। তবে টিকাটুলী আর মতিঝিল এলাকায় দুটি সিনেমা হলে গিয়ে একটু অন্য রকম চিত্র মিলল। নানা বয়সী নারী-পুরুষের সমাগম সেখানে। কেউ টিকিট কাউন্টারে ভিড় করছেন, কেউ বিশাল পোস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে নিজেকে ধারণ করছেন। কাউন্টারের বাইরে টিকিট বিক্রির চেনা সেই ডাক—‘এই ডিসি, রিয়াল’!
ঢাকাই চলচ্চিত্রশিল্পকে নির্ভর করে যাঁদের জীবন-জীবিকা, তাঁদের জন্য এই দৃশ্য নিশ্চয়ই মন ভালো করে দেওয়ার মতো। ঈদের দিন থেকে শুরু করে গতকাল মঙ্গলবারও এমন দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানীর প্রেক্ষাগৃহগুলোতে। বড় পর্দায় বিনোদন খুঁজে নিতে ভিড় করেছে মানুষ। ‘প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ’—এমন নোটিশও দেখা গেছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে। ভিড় উপচে না পড়লেও উল্লেখ করার মতোই ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও খুশি।
ঈদ উপলক্ষে বড় পর্দায় মুক্তি পেয়েছে তিনটি চলচ্চিত্র। রংবাজ, অহংকার ও সোনাবন্ধু। এর মধ্যে রাজধানীর বেশির ভাগ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে শাকিব খান ও শবনম বুবলী অভিনীত রংবাজ। প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে শাকিব-বুবলী জুটিরই আরেক সিনেমা অহংকার। তৃতীয় অবস্থানে আছে চিত্রনায়িকা পপি-পরীমনি-ডি এ তায়েবের সোনাবন্ধু।
বিভিন্ন হল ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শাকিব খান অভিনীত দুটি ছবি সাড়া জাগিয়েছে। অর্থাৎ, শাকিব খানের রংবাজ, অহংকার বাজারে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বর্তমানে রাজধানী এবং এর আশপাশে অর্ধশত সিনেমা হল চালু রয়েছে। সব কটি হলেই ঈদের ছবির প্রদর্শনী চলছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কথা হলো বেশ কয়েকজন হলমালিকের সঙ্গে। তাঁদের মতে, শাকিবের দুটি ছবি বেশ ভালো ব্যবসা করছে, কিছু কিছু হলে সন্ধ্যার প্রদর্শনী ‘হাউসফুল’ যাচ্ছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ইফতেখার নওশাদ বললেন, তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান মধুমিতা মুভিজে চলছে অহংকার ছবিটি। গেল রোজার ঈদের মতো না হলেও দর্শকের ভালো সাড়া মিলছে। মাঝে মাঝে রাতের প্রদর্শনীগুলোতেও ডিসি অংশটি পূর্ণ হয়। গত সোমবার ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি। পারিবারিক গল্পের ছবি হওয়ার কারণে মহিলা দর্শকের আগ্রহ অহংকার ছবিটির প্রতি।
ভিন্নমত প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী শোয়েব রশিদের। তাঁর নিজের পরিচালিত দুটি প্রতিষ্ঠান চন্দ্রিমা ও সেনা অডিটরিয়ামে শাকিব খানেরই দুটি ছবি চালাচ্ছেন। এর মধ্যে সেনা অডিটরিয়ামে রংবাজ ছবিটি বেশ ভালো ব্যবসা করছে। তাঁর বিবেচনায়, তুলনামূলকভাবে রংবাজ ছবিটির প্রতি দর্শকের আগ্রহ বেশি।
সনি সিনেমা হলের মালিক চলচ্চিত্র পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে ঈদের দিন থেকে অহংকার চলছে। ভালো সাড়া মিলছে।
একই রকম মন্তব্য অভিসার সিনেমা হলের ব্যবস্থাপক খায়রুল কবিরের। অভিসারে চলছে রংবাজ। খায়রুল কবির বলেন, মোটামুটি যাচ্ছে। ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রি হচ্ছে প্রতি প্রদর্শনীতে।
শ্যামলী সিনেমা হলে ঈদের দিন থেকেই চলছে রংবাজ। ঈদের দিনসহ এখনো ছবিটি বেশ ভালো যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের হাউস ম্যানেজার আহসান উল্লাহ বলেন, ‘ঈদের পরদিন মঙ্গলবার পর্যন্ত সন্ধ্যায় প্রদর্শনীগুলো হাউসফুল গেছে। দিনের অন্য সময়ে মোটামুটি ভালো পরিমাণে দর্শক আসছে।’
প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দীনের তথ্যানুযায়ী, ঈদে রংবাজ ও অহংকার দুটোই ভালো চলছে। তাঁর পরিচালিত পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আজাদ সিনেমা হলটিতে চলছে রংবাজ। আজাদসহ গত কয়েক দিন পুরান ঢাকার প্রেক্ষাগৃহগুলোতে চোখে পড়ার মতো দর্শকের উপস্থিতি ছিল।
জোনাকী সিনেমা হলের অন্যতম উদ্যোক্তা মো. তাজুল ইসলাম দুই মাস আগে বুকিং দিয়েছিলেন রংবাজ ছবিটির জন্য। কিন্তু ছবিটি আর চালানো সম্ভব হয়নি। ঈদে চালাচ্ছেন পপি, ডি এ তায়েব ও পরীমনি অভিনীত সোনাবন্ধু। ছবিটি দর্শকের মধ্যে তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি বলে জানান তিনি। হাউসফুল হয়নি কোনো প্রদর্শনীই।
নতুন ছবির পাশাপাশি রাজধানী ও আশপাশের এলাকার কিছু সিনেমা হলে পুরোনো ছবি চালাতে দেখা গেছে। এগুলো ছাড়া ঢাকার অভিজাত প্রেক্ষাগৃহগুলোতে গতকাল সন্ধ্যায় অপেক্ষাকৃত বেশি দামে কালোবাজারিতে টিকিট বিক্রি হতে দেখা গেছে। দর্শকও আগ্রহ দেখাচ্ছে সন্ধ্যার প্রদর্শনীগুলোতে।
একটা সময় ১০ থেকে ১২টি ছবি এক ঈদেই মুক্তি পেত। এখন ঢাকাই ছবির সেই দিন নেই। হাতে গুনে ছবি মুক্তি পায় ৩ থেকে ৪টি।
তবে চলচ্চিত্রের এই মন্দা বাজারে এখনো আশা জাগায় উৎসব। যেমন ঈদের দিন শনিবার থেকে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার প্রায় সব সিনেমা হলেই দর্শকের উপস্থিতি দেখা গেছে। ঢাকায় এখনো ঈদের ছুটির আমেজ আছে। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান খোলেনি, বিপণিবিতান বন্ধ। তাই আসছে সময়ে হলে লোকসমাগম আরও বাড়বে বলে আশায় আছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।